জিললুর রহমানের পাঁচটি কবিতা: ‘মেঘেদের ঘরে কেন এত জল’

সংশয়

মেঘেদের ঘরে কেন এত জল
অশ্রুপ্রবণ ইন্দ্রধ্বনিতে চরাচরময়
পিলে চমকায় কেন

সূর্য যখন অস্তের দিকে
প্রখর আলোক ম্রিয়মান ফিকে
আকাশ তখন রক্তচক্ষু কোন্ রোষানলে ক্ষিপ্ত

মানুষ যখন চাঁদে মঙ্গলে
বিশ্ব মাতায় নানা গোলেমালে
জঙ্গলে পথে কেউ বাস করে দিনভর খায় অর্থনীতির ঘাস

কে যে বেশী বুঝে বুঝছে না সে কে
বড় বেশি বেশি সংশয়ে ভরা
সংসারে পরিজনে

স্বপ্ন

স্বপ্ন তো ছিল রেল রাস্তার ধার দিয়ে যাবে
ঝোপঝাড় ঢাকা গলি
পেরুলেই এক ছোটখাটো ঘর ভেঁপু বাজলেই
দৌড়ে দৌড়ে ছুটবে রেলের দিকে

রেল দেখে আর কী এমন হবে
লোহালক্কর ঝপাঝপ ছোটে
মানুষ দেখব নানা রকমের
নানা কিসিমের নানান রঙের নানা বয়সের লোক
নামছে কেউতো উঠছে কেউবা ঝুলে ঝুলে হয় লাল
কিছু গোঁফঅলা কিছু দাঁড়িয়াল
কিছু চকচকে কপোলের লোক
কেউ শিশুতোষ কেউতো রমনী পরম লাস্যময়ী

বড় সখ ছিল একদিন ঠিক
এভাবেই বহুদূর-দূর দেশ
মিরেরসরাই কিংবা চিনকি আস্তানা ফেলে
যেতে চাই আরো যোজনের দূরে
আখাউড়া কিবা ভৈরব ধরে ঘোড়াশালও যেতে পারি
কুঝিক কুঝিক সর্পিল ট্রেনে
কত লোক ওঠে নামে
কেউ বাবুসা’ব কেউ কুলি-মুটে কেউ চানাচুর বেচে
বাদাম ভাজাতে কিন্তু আমার আগ্রহ খুব বেশি

সখ জেগেছিল ট্রেন থেকে যেন
হাটুরে কবিতা কবিগান বই
উড়ে আসে ঘরে ঘরে
অথবা অন্ধ ভিখারির গান
আমার কণ্ঠে বাজে
কখনো মলম বাতের ব্যথাকে মৈনাকে নিয়ে যায়
হকারের হাঁক সাত খুন মাপ
কখনোবা ফের ফাঁসির আদেশ শুনি

কত কত সখ
সব উড়ে যায় ঘোরের গহন কালে
বাড়ি উড়ে যায় শহরের বুকে
ঝোপগুলো ঝরে কোথা
লোকাল ট্রেনের রমরমা স্মৃতি
ম্লান হয়ে পড়ে শীতে —

স্বপ্নে এখন নেই বাড়ি নেই
ট্রেইন লাইন নেই
ঝোপঝাড় গলি ভুতের গলিতে
হাতিরপুলেতে ঘোরে
আন্তনগর চলে ধেই ধেই
মাঠ প্রান্তর নদী নর্দমা গলি ঘুপচিরা
নিমেষেই সব দূরদূর করে
সরিয়ে সটকে পড়ে
মহকুমাগুলো জেলার ঝোলাতে ঝুলে
সাঁই সাঁই করে সুবর্ণ আর তূর্ণানিশীথা ছোটে

ঝুলে পড়ে সখ স্বপ্নের রং
ছোট ছোট যত রেলের ঠিকানা
ছোট মানুষেরা আম মানুষেরা গ্রাম মানুষেরা
স্বপ্নের দেশে ঝুলে ঝুলে মরে যায়
আমার স্বপ্ন ঝোপ জঙ্গল রেলগাড়ি ছেড়ে
মিল্কি পথের খোঁজে আগুয়ান

যতোটা বায়ু বহে

আকাশে মেঘে মেঘে বিজুলি চমকায়
আলোর মিছিলেরা পালাতে পথ চায়
পাহাড়ে আলো নাচে পাহাড়ে আন্ধার
মানুষও আলোকিত কেউতো কদাকার

জোনাকে আলো জ্বলে জোনাক ঝিঁঝিঁ ডাকে
অনেকে অবসাদে কেউতো পথে হাঁটে
এখানে আশকারা এখানে মশকরা
কুপিত আচরণে কেউবা দিশেহারা

যখন মনসার ভীষণ ফণা ওঠে
চাঁদ স’দাগরের ব্যবসা ওঠে লাটে
যখন বন্যায় ভেসেছে চরাচর
আপাম-জনতার ভেসেছে গরু-ঘর

সময় যত কাটে কাটছে আয়ুরেখা
ভাগ্যে কী লিখন সময়ে যাবে দেখা
তবু তো বুক-বাঁধা তবুও ভালবাসা
যতোটা বায়ু বহে ততোই বাড়ে আশা

পেন্সিল

পেন্সিলে বুঝি ধার কম
নিমেষে মিলায় হাওয়াতে
রবারের সাথে পাল্লায়
আনো শাপনার আনো ব্লেড

পেন্সিল দিয়ে কালোফুল
শাদা খাতা জুড়ে এঁকে যাও
আঁকো ছাত্ররা ছবিয়াল
তিল থেকে তাল মিলবেই

কেউ অংকের সুতো খোঁজে
কেউ সমাজের বিজ্ঞান
ইতিহাস পড়ে রক্তেরা
ছড়িয়ে পড়ার পথ আঁকে

কারো লাল চোখ নিষ্প্রাণ
বর্ণ শব্দ কেউ শেখে
বর্ণ প্রথাকে ধান্দায়
বিবর্ণ করে উসকায়

কেউ দিনভর মানুষের
মুণ্ডুকে ধরে চাবকায়
পেন্সিলে ধার কমলেই
কারো বড় বড় পা গজায়

ধার করা যত বিদ্যায়
ধার দিয়ে কোনো লাভ নেই
যেখানে জ্বলছে দাবানল
তার ধারে গিয়ে কাজ নেই

চলো পেন্সিলে ধার দিই
নিয়ে আসো চোখা শাপনার
পেন্সিলে যদি রং দাও
সূর্যের লাল পূর্বেই

আক্কেল গুড়ুম 

কেউ পাকা ধানে দেয় কোনো মই
কেউ ধান ভানতে গায় শিবের সঙ্গীত
সেই গান কোন্ গান শুনে যান কোন্ জন
কোন্ গীত সেকি শিব-ঠাকুরের বিয়ে হবে
তিনকন্যাদান নাকি
শিবের গাজন গেয়ে
মাগন ঠাকুর সেজে যাবে
আর যদি কেউ গায় গান
ভানতে ভানতে ধান
কী ঘটনা হবে
কিবা লাভ কেবা তার রহস্য জানাবে
আর পাকা ধানে মই যদি লই কোনভাবে
কী যে হবে কে বলিবে
এমন মানুষ কই কোথা পাই
কিছুই জানি না তবু
জেনে রাখি জেনে রাখা চাই
যদি পাই অনর্থের অর্থ কোনোখানে
কিংবা আষাঢ়ে গল্প কেউ ফেঁদে গেল
আমাদের অকম্মার ধাড়ি ভেবে ভেবে
সে বিষয়ে আকাশ কুসুম ভেবে চিন্তে তবে
প্রতিদিন নিত্যবোধ আক্কেল গুড়ুম

কবি পরিচিতি

জিললুর রহমান, কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, উত্তর আধুনিক নন্দনতত্ত্ব চিন্তক। আশির দশকের শেষার্ধ থেকে লেখালেখি। জন্মঃ ১৬ নভেম্বর ১৯৬৬। পেশায় চিকিৎসাবিজ্ঞানী। সম্পাদক, যদিও উত্তরমেঘ। সম্পাদনা পরিষদ সদস্য: লিরিক।

প্রকাশিত গ্রন্থঃ

কাব্যঃ
অন্যমন্ত্র (লিরিক, ১৯৯৫)
শাদা অন্ধকার (লিরিক, ২০১০)
ডায়োজিনিসের হারিকেন (কাব্য গ্রন্থ, ছোট কবিতা, ২০১৮)

ডায়োজিনিসের হারিকেন (ভিন্নচোখ, ২০১৮)

আত্মজার প্রতি (বাঙ্ময়, ২০১৭)

শতখণ্ড (বাঙ্ময়, ২০১৭)

প্রবন্ধঃ
অমৃত কথা (লিরিক, ২০১০)
উত্তর আধুনিকতাঃ এ সবুজ করুণ ডাঙায়
(লিরিক, ২০০১)

অনুবাদঃ
আধুনিকোত্তরবাদের নন্দনতত্ত্বঃ কয়েকটি অনুবাদ (লিরিক, ২০১০)
নাজিম হিকমতের রুবাইয়াৎ (অনুবাদ, বাতিঘর, ২০১৮)
এমিলি ডিকিনসনের কবিতা (অনুবাদ, চৈতন্য, ২০১৮)