Platero and I কাব্যগ্রন্থ থেকে অনুবাদ | হুজাইফা মাহমুদ

আঁতুড়কথা: অনুবাদ আমি মাঝে মাঝে করি। সেটা পাঠকরে পড়ানোর বা বাজারে ছাড়ার জন্য না, এমনিতেই করি। অন্যভাষার টেক্সটের সাথে আমার বুঝাপড়া পরখ করার জন্য করি, এবং এটা করতে আমার প্রায়ই ভাললাগে। যে টেক্সট আমার প্রচণ্ড ভাল লেগে যায়, সেটা অনুবাদ করার ইচ্ছা হয়। যেমন হুয়ান রামেন হিমনেথের platero and I নামক বিখ্যাত বইয়ের এইসব গদ্য কবিতা। অসম্ভব ভালো লাগছে। পিডিএফ পড়ার ফাঁকে-ফাঁকে দুয়েকটা কবিতা অনুবাদও করতে মন চাইলো। যেহেতু পাঠকের জন্য করি নাই, সর্বতোভাবেই নিজের জন্য করেছি, তাই পাঠকের মন্দ লাগা দিয়ে আমার কিছুই যায় আসে না। ভাললাগলে অবশ্য আমারও হালকা হালকা ভাল লাগবে।

এপ্রিল কাব্য

শিশুর দল প্লাতেরোকে নিয়ে গেছে ঝাউবনের পাশে ছোট্ট নদীর কাছে, এখন তারা তাকে ফিরিয়ে আনছে, হালকা চালে হাঁটিয়ে, নির্দোষ ক্রীড়া কৌতুক আর নিরূপায় হাসির মাঝে, তার পিঠ বোঝাই হলুদ ফুলে। উপত্যকায় বৃষ্টি ঝরেছিল তাদের উপর, সেই চলিষ্ণু মেঘখণ্ড, যা সবুজ তৃণভূমি ঢেকে দিয়েছিল তার সোনা-রূপা বর্ণের আবরণ দিয়ে, যার ভেতরে ক্রন্দসী বীণার মতো এক রঙধনু ঝকমক করছিল। আর আমার ছোট্ট গাধার জলসিক্ত জামা থেকে বৃষ্টিস্নাত বেলফুল তখনও টুপটাপ জল ঝরাচ্ছিল।

বাহ্, কী সুন্দর ঝকঝকে তাজা, উচ্ছল, ভাবালুতাপূর্ণ এক কবিতা! এমনকি প্লাতেরোর গর্দভ-নিনাদও কি শ্রুতিমধুর শুনাচ্ছে এই সুমধূর বৃষ্টিস্নাত বোঝার নিচে! সময়ে সময়ে প্লাতেরো তার মাথা ঘুরিয়ে নেয়, এবং যতদূর তার বৃহৎ মুখটি পৌঁছায় ততদূর ফুলের গায়ে কামড় বসায়। তুষার-শুভ্র এবং হলুদ বেলফ্লাওয়ার মুহুর্তের জন্য ঝুলে থাকে তার সবুজাভ সাদা দাঁতের সারিতে তারপর অদৃশ্য হয়ে যায় তার ঝোলাসদৃশ গোলাকার উদরে।আহা প্লাতেরো, যদি কেউ তোমার মতো কেবল ফুল খেয়েই কাটিয়ে দিতে পারতো এই জীবন, এবং তার কোন ভুগান্তিই যদি না থাকতো!
এপ্রিল…এই আগত সন্ধ্যায় এক হেঁয়ালির মতো…
প্লাতেরোর উজ্জ্বল জীবন্ত চোখগুলি প্রতিফলিত করছে এই বৃষ্টি ও সূর্য মাখা সময়টাকে, এবং সান হুয়ানের মাঠের ওপারে তার অস্তমিত হওয়াকেও,
তখন এক টুকরো মেঘ আরক্তিম হলো সমান্য আলোয়, তারপর মিশে গেলো সন্ধ্যার বৃষ্টির সাথে…

বন্ধুত্ব

আমাদের পারস্পরিক বুঝাপড়া বেশ ভালো
যদি সে চরে বেড়াতে চায়, আমি তাকে ছেড়ে দেই।
আমাকে সে সবসময় বহন করে, যেখানেই যেতে চাই সানন্দে নিয়ে যায়। প্লাতেরো জানে, যখন আমরা সপুষ্পক পাইনের গাছগুলোর কাছে পৌঁছাই, তখন আমার গাছের গুঁড়ির নিকট যেতে ভালো লাগে, সেগুলোকে স্পর্শ করতে এবং তার সঘন সৌরালোকের সামিয়ানার ভেতর দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে। সে জানে, যে সরু পথ তৃণাবৃত বনভূমির ভেতর দিয়ে আমাদেরকে নিয়ে যায় এক প্রাচীন ঝরনার দিকে, তা আমাকে এতটাই উৎফুল্ল করে, পাইনের গাছে ঢাকা পাহাড় থেকে দাঁড়িয়ে নদীটাকে দেখা যেন আমার জন্য কোন উৎসবের মতো ব্যাপার, যার অনুচ্চ ঢালু আমাকে মনে করিয়ে দেয় পুরানো কোন দৃশ্যের কথা। যখন তার পিঠে বসে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ি, নিশ্চিন্তে, জেগে উঠে দেখি আমাকে সে নিয়ে গেছে তার প্রিয় কোন দৃশ্যের কাছে।
প্লাতেরোর সাথে আমার আচরণ, যেন সে এক অবোধ শিশু! পথ যদি পাথুরে হয়, অথবা রুক্ষ কঠিন, আমি তার পিঠ থেকে নেমে গিয়ে সহজ করে দেই তার পথ চলা।
তার মুখে চুম্বন করি, নানান ভেলকি দেখিয়ে
ভীত করে ফেলি তাকে! যেহেতু সে জানে আমি তাকে ভালোবাসি, ফলত আমার প্রতি কোন বিরাগ পোষণ করে না এতে।
কিছু বিষয়ে আমার সাথে তার সাদৃশ্য অনেক, যেমন বাকি বিষয়ের বৈসাদৃশ্যও প্রচুর
আমি বিশ্বাস করি আমার স্বপ্নগুলোও সে দেখে!

প্রত্যাবর্তন

প্লাতেরো আর আমি পাহাড়ের চূড়া থেকে নেমে আসছি, উভয়েই বোঝা ভারাক্রান্ত, তার পিঠে মার্জোরাম, আমার পিঠে হলুদ লিলিফুল। এপ্রিলের কোন এক সন্ধ্যায় পশ্চিমের সবকিছু তখন স্বচ্ছ সোনাবর্ণের ছিল আর এখন ম্লান রূপালি রঙ ধারণ করে আছে কোমল আর ভাস্বর, লিলিফুলের মতো
তারপর, এই সুবিশাল আকাশ এক উজ্জ্বল নীলকান্তমণি, বিলীন হয়ে যাচ্ছে চুনি পান্নার ভীড়ে,
আমরা ফিরে আসছি যখন, এক অসহায় দুঃখবোধ আর বিষণ্ণতা আচ্ছন্ন করে ফেললো আমাকে।
পাহাড়ের চূড়া থেকে দৃষ্টিগোচর হয় গ্রামের মিনারটি,
সবুজ টালির মুকুটে দেদীপ্যমান দেখা যায় আর, অবয়ব লাভ করেছে কোন স্মৃতিস্তম্ভের। তখন, আরও দূরে দেখা যায় সিভিলের ঘন্টা টাওয়ার, গিরালডা, যখন আমার শহরগুলো ঘুরে বেড়ানোর আকাঙ্ক্ষা তীব্রতর হয়ে ওঠে এই বসন্ত মৌসুমে;
তখন এই একটি দৃশ্যে বিষাদগ্রস্ত হৃদয়ের সান্তনা মেলে।
ফিরে যাচ্ছি। কোথায়? কোথা থেকে? কিসের জন্য?
ফিরে যাচ্ছি। কোথায়? কোথা থেকে? কেন? তবুও যেসব লিলিফুল আমি বহন করে চলেছি আগত রাত্রির উষ্ণ তাজা হাওয়ায় সেগুলো ছিল আরও খুব সুরভিত তাদের সৌরভ ছিল আরও প্রবলতর, আরও অস্পৃশ্য, উঠে আসছে কোন অদৃশ্য পাপড়ির নিচ থেকে, যেন তারা সব মিলে হয়ে উঠছে এক পুষ্পাবৃত সুরভী, মাতাল করে তুলছে আমাদের দেহ আর মন এই একাকী নির্জন অন্ধকারে
আমি বললাম,
“হে আমার হৃদয়, ছায়ার ভেতরে একটি লিলিফুল!”
সহসাই মনে পড়লো প্লাতেরোর কথা–
এখানেই সে আছে, আমি তার উপরে, সে আমার নীচে
আমি তাকে ভুলে রইলাম এতোটা সময়,
যেন সে আমার এই শরীরেরই একটি অঙ্গ হয়ে আছে!

 

হুজাইফা মাহমুদ : কবি ও অনুবাদক। প্রকাশিতব্য কাব্যগ্রন্থ ‘অন্তঃস্থ ছায়ার দিকে’ (ঢাকা প্রকাশ) (২০১৯)