মানুষের অপমান আগের চাইতে ভালো লাগে : হাসান রোবায়েত

১.

নিজেকে দেখার পর আরও কি মলিন ছিল শ্বাস!
চেনা ঠাঁই তুমি এই পথ ধরে গিয়েছ কখন
তারপর, অর্ধক্ষমাস্ফীত সেই মোনামুনি বন
ধুলাভেজা দিঘিদের সাথে একা বসে আছে হাঁস—
মাঝে মাঝে নিরবতা ভালো কোনো দীর্ঘ সম্পর্কের
সমাপ্তির ছায়া থেকে যতটা অস্ফুট ছিল ধান—
মানুষ দুঃখের শেষে নিজের পাশেই ঘুমিয়েছে ম্লান
যে পাতা আঁকড়ে ধরে ফাঁকা কী সে প্রজ্ঞা বাতাসের!

এসব ভূমিকা শুধু আদৌ মর্মর বলে নেই
কিছু—এমন কি দপ করে জ্বলে ওঠা হারিকেন
গতানুগতিক ভাবে নিভে যায়—পুরনো সে ট্রেন
জঙ্গলে একাকী পড়ে আছে ধু ধু মিথের পাশেই
বিগত মুখের চেয়ে কোথাও শরীর নেই আর
ওপারে হাঁসের দিন বৃষ্টিতে ভিজছে পারাপার—

২.

হাঁসের চলের পাশে এইসব লীন নীরবতা—
যেটুকু পথের মায়া কোনোদিন রূপছায়া হয়ে
বাতাস মহুয়াময়, যদি অলক্ষ্যের পরিচয়ে
তোমাকে ফেরায় হেম! তবে কি বসন্ত চিরব্যথা,
আত্মার কূটালাপ—! খাঁ খাঁ অন্ধকারে এই বন
শব্দহীন—অশ্রুভার ফিরে আসে অহেতু সে ঠোঁটে
যে মাটি বধির ছিল, সেখানে একাগ্র ঘেমে ওঠে
গান অস্তমান শীষে—কোথাও দুঃখের সমাপন

মেহেদি ফুলের থেকে বহুদূর ঝরছে নিঝুম—
কিছুটা নোঙর তবু ফেলে যাই সহদুপুরের
ছায়ায়—কোথাও মরা পাতা ভুলে গেছে নূপুরের
ছাঁচ—শ্রেষ্ঠাংশের ভূমিকায় শুনি জননীর ঘুম,
সহস্র ঊর্ধ্বের দিকে হাঁসেদের উড়ে চলে যাওয়া
ক্রমশ পাখির কাছে এই গান চিরদূর হাওয়া—

৩.

যে ফেউ ডাকতে ছিল আমি তার দেখি নি শরীর
অথচ তোমাকে মনে পড়ে অবসরহীনতায়
দুনিয়ার যত ব্যাধি ক্লান্ত জাতকের সমবায়
পেয়েছে যে যার মতো—খালি সেই ফেউয়ের অথির
ডাক আমি শুনি ভোরে—ভাঁড়ামো, বিবেক মিলেমিশে
এখানে সোনার বাংলা সার্কাসের মিন সফলতা
আমরা ক্ষুয়েছি দোঁহে একা একা বলবার কথা
আমাদের মৃত্যু হবে এইসব টিপিক্যাল বিষে—

শুনেছি তামাটে কাল মহাবলয়ের সে সময়
রূপের প্রতিটি কথা ঘুমগায় ইথারের দেহে
ভোলার তুমিই ছিলে সলিচুডে, অখিল সন্দেহে
এখানে জাগাতে পারে বিবমিষা হাঁসের প্রণয়
যে ফেউ ডাকতে ছিল আমি তার দেখি নাই মন
আমরা বেঁচেছি দোঁহে অপরের ক্লিশে এ জীবন

৪.

আকাশে পচছে জুই ফুল, দেখেছিল তথাগত—
কোথাও বৃষ্টির নিচে শূন্য মাঠ, সেইসব ঘ্রাণ
মেয়েটা খোলে নি তার কল্পতরু, ঊষার বাগান
এমন মেঘের দিনে ঘাই মারে পূরবীর ক্ষত—
কে ছিল প্রেমের পাশে, চলে গেছে নিয়ে বীতরাগ
ফুলের নির্মান থেকে বুঝে ছিল বাগানের লাভ
উড়ছে ব্রিজের শেষে ফাঁকা কারো চিঠির জবাব
এই মাঠে, ভুল প্রেমে, যশোধরা ছুঁয়েছে পরাগ—

বাতাসে পাশার চাল, শীত শেষে ফুটে আছে কড়ি
অপরাহ্ণে পাতা ঝরে নাসারা মাসের এই দিনে
এখানে অলাত খাঁ খাঁ, মরে গেছে বায়ু তুমি বিনে
প্রথম ঋতুর নিচে কেঁপে ওঠে ভয়ার্ত কিশোরী
আমাদের ভালোবাসা নিখিলের ভুল অনন্তর
শিশুর দু হাত রেখে মানুষেরা ছেড়ে যায় ঘর—

৫.

তোমার মিনারে মেঘ, আমাদের একলা শাওন
ভিজতেছে লেবুগাছে—বেজে যাচ্ছে পুরনো রেডিয়ো
না দেখা মাঠের পর এইবার ঠিকানাটা দিয়ো
অনেক বৃষ্টির শেষে নিভে গেছে যে রেল স্টেশন—
বিস্কুটের ঠান্ডা ঘ্রাণ গায়ে নিয়ে যুবতীর বুকে
সুগোল রঙের হাঁস উড়ে গেছে মাঘের আলোয়
সন্ধ্যা নামবার আগে বল ধুয়ে শিশুরা ঘুমোয়
যেখানে মেয়েরা ভালো বেসেছিল তারার অশ্রুকে—

যদি একবার বলি এইসব ভালোবাসারাশি
কিছুই থাকে না—মুগ্ধবোধ ব্যাকরণ যেইভাবে
অনেক কালের থেকে উড়ে আসা হাওয়ার জবাবে
ম্লান থেকে ম্লাানতর হয়ে ছিঁড়ে যায়, ভাঙে বাঁশি
নতুন ব্যথার মূলে যেভাবে পরেছো নাকফুল—
মৃত্যুর অদূরে একা অনন্তর ফুটছে জারুল

৬.

‘সমস্ত ফুলের মধ্যে কূট গন্ধ থাকে—’ এইসব
বুঝে নিতে আমাদের চলে গেল পাথরের কাল
বৃষ্টির তুমুল দিনে রক্তে রক্তে শিলাগুল্মজাল
অনেক জন্মালো মেঘে: অর্থহীন বিষণ্ন প্রসব—
ভালোবাসা হলো, প্রেম—ধৃতরাষ্ট্র ফিরে পেল চোখ
মহাভারতের কূলে পচে হাওয়া, প্রায়াম নিশ্চুপ
এমন, শাওন রাতে কূপের গভীরে ইউসুফ
শিশুর কাঁথার ওমে যায় দিন, ঘুরছে গোলক—

স্তব্ধ মাঠে, শূন্যতায় ভিজে যাও দূরাগত তুমি
নোলক লুকিয়ে রাখে যুবতী যেমন করে একা
লেবুর আঘ্রাণ কেটে দেখেছিল যেভাবে জুলেখা
ডানায় কাঁপছে রোদে সেইভাবে দূর জন্মভূমি—!
যদি তুমি নেমে আসো, নদীর উরোত ধরে ঠাঁয়
ঘুমন্ত এস্রাজ বাজে অনাথ কাঠের কুয়াশায়—

৭.

চারদিক শূন্য মাঠ, একা হাঁস, ভিজছে সংশয়—
ঘাসের গভীরে হাওয়া কি কেঁদেছে কোনোদিন—যদি
মোনামুনি গাছটার খোঁজে সুবিলের মাঠ অব্দি
চলে যাই, মুখ থেকে কারা এসে এ মূকাভিনয়
ফেলে ছুড়ে দেবে গান! শাদা শাদা হাঁস এসে শুধু
গড়িয়ে দিয়েছে ঘুম—অস্থির নক্ষত্রমান পাখি
সারাবেলা ঠোঁট ঘঁষে আলেয়ায় যেন সে একাকী
মহান শূন্যতা ঘিরে একরাতে উড়ে যায় ধু ধু—

পাতার গভীর জানে কিভাবে সাকিন ভুলে তারা
অন্ধকারে ফেলে গেছে ধুলাপথ এঁটো কুয়াশায়
আয়না কেনার পরে মানুষ প্রথমে দেখতে চায়
নিজের উদ্বেগ আর বিস্মরণ, একদিন যারা
গোল হয়ে নেমেছিল যেন কোনো হাওয়ার হৃদয়—
চারদিক শূন্য মাঠ, একা হাঁস, ভিজছে সংশয়—

৮.

সহজ বিষের থেকে কিছুকাল শ্বেতপাথরের
কথা বলে আধো-তারাদের সাথে সাথে শব্দময়
এ নিক্ষেপ—সমুদ্র কি হিংসার চাইতেও সুগোল!

ধুলার জীবাশ্ম ঘিরে বহুদিন ফেলে আসি ছায়া—
অমৃতের অশ্রু ও সভায় কেন কাঁপে পশমের
অনধিক স্মৃতি! —একদিন মরে যাওয়া ভালো মৃত

বন্ধুদের পাশে: —এই রূপ-স্তব্ধতায় জেগে ওঠে
দুপুরের পত্রশোর—অস্থিম্লান হে, অজস্র ছাঁচ
তবু লাল হোক টমেটোর মন—অহেতুক ফুল

কী দারুণ ইডিয়োসি নিয়ে ভাবে মহৎ বাগান—
একটি প্রাচীন শুধু খাঁ খাঁ: পথশেষ-সহোদর

৯.

মানুষের অপমান আগের চাইতে ভালো লাগে—
তারপর, বাতাসের দিকে চলে গেলে মনে হয়
কোথাও একটা হাঁস বৃষ্টিতে ভিজছে এ সময়
সজনার ফুল ভিজে যাচ্ছে সন্ধ্যা নামবার আগে
নিমের ভূ-পথ ধরে কোনোদিন বাড়ি ফেরে সে-ও
অশোক, চাঁদের বনে হারিয়েছে তার ছোট বোন
পুঁইয়ের লতার নিচে একাকিনী ভিজছে শাওন
সমুদ্র বেদনা নিয়ে ভেসে গেছে অনন্ত সন্দেহ—

এখানে সুপ্তির কাল—যত প্রেম, শাদা শাদা হাঁস,
সময়ের অক্ষ ধরে উড়ে গেছে দূর বহু রোদে
সেখানে মানুষ নেই, নিহিলিজমের ফাঁকা বোধে
চলে যাওয়া নেই অন্য কোনো স্থানে—যেন সে জুডাস
রাত্রির মন্দিরে একা সুইসাইডের পাশে জাগে—
মানুষের অপমান আগের চাইতে ভালো লাগে—

১০.

তোমাকে ভাবতে গিয়ে দেখি এইখানে অবসর
বলে কিছু নেই শুধু প্রতিদিন সূর্যের সময়
এসে ক্ষীণ বারান্দায় গড়ে তোলে অমৃত-বলয়
চিতা শেষ হয়ে আসে তবু নাভি অনন্ত দোসর
আগুন একাকী উড়ে যায় যেন আনগ্ন টোটেম
এখানে বেলের শব্দে সুনসান ভিজছে দুপুর
আমরা মাড়াতে পারি ছায়া, নিঃসঙ্গতা কিছু দূর
কোথাও ফেরে না কেউ, ফিরে আসে প্রাচীন অপ্রেম—

বহুকাল বৃষ্টিহীন এ মৃত্তিকা অকর্ষিত খাঁ খাঁ
আত্মাও জড়িয়ে আছে কুকুরের বিষণ্ন লালায়
সাপিনী সবুজ তার চেরা জিভ এ উপত্যকায়
বাড়িয়ে দিয়েছে যেন থরথর কাঁপছে বিশাখা
তোমাকে ভাবার এই অবসরহীন পরিখায়
কারা যেন ঘষে দেয় মহাকাল শিরিষে-রেঁদায়