কৃষি দিয়ে লাখপতি সুনামগঞ্জের আনোয়ারা । সফল নারীর গল্প

ভারতের সীমান্তবর্তী পাহাড় ঘেরা হাওর এলাকা সুনামগঞ্জ। সুনামগঞ্জের একটি উপজেলা বিশ্বম্ভরপুর। হাওরে পানি নেই তাই ফসলে ভরে গেছে। পাহাড়, ধানের মাঠ, সবজি বাগান হলুদ আর সবুজের মেলবন্ধন তৈরি করেছে। সীমানেত্মর কান ঘেঁষে নদীর পাশে কৃষাণী আনোয়ারা বেগমের বাসা। চারদিকে ফসলের মাঠ। মধ্যখানে আনোয়ারার ঘর। রাসত্মা থেকে জমিনের আইল ধরে আনোয়ারা বেগমের বাসায় যাওয়ার আগে চোখে পড়বে লাউয়ের মাচাং। লাউয়ের মাচাংয়ের পাশ ঘেঁষে উঠানে প্রবেশ করলে চোখে পড়বে আরও নানা ধরনের সবজি। আনোয়ারা নিজ হাতে চাষ করেছে এই সব সবজি। বাড়ির এক পাশে তৈরি করেছেন জৈবসার। আনোয়ারা বেগমের সব সবজি রাসায়নিক বিষ মুক্ত। কোন ধরনের কীটনাশক ছাড়া এই সব সবজি উৎপাদন করেন তিনি। এই সব সবজি বিক্রি করতে বাজারে যেতে হয় না তাকে। নিজে প্রতিষ্ঠা করেছেন নারী বান্ধব এক বাজার। আনোয়ারাসহ পাড়ার সব নারীরা নিজেদের উৎপাদিত পণ্য ঐ বাজারে নিয়ে আসেন। মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়ায় নারীরা নিজেদের কষ্টের ফসল বিক্রি করতে পারে ন্যায্য দামে। তিন চাকার একটি ভ্যান গাড়ি হচ্ছে আনোয়ারার নারী বান্ধব বাজার। কৃষি ক্ষেত্রে এই সব অবদানের জন্যে সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভর উপজেলা থেকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০১৬ তে আনোয়ারা বেগমকে কৃষি ক্ষেত্রে সেরা নারী সম্মাননা প্রদান করেন।

আজকের অবস্থায় আসতে হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রম করতে হয়েছে আনোয়ারাকে। ১৩ বছর বয়সে বিয়ে হয়েছে ৩০ বছর বয়সী এক পুরুষের সাথে। দু’বেলা খাওয়ার জুটাতে প্রতিবেশির কাছ থেকে মিষ্টি বানানো শিখে আনোয়ারা বেগম। সারারাত মিষ্টি বানাতো দিনে স্বামী এ পাড়া ও পাড়া করে বিক্রি করত। আনোয়ারা বেগম বলেন- অনেক কষ্ট করে সংসার দাঁড় করিয়েছি। মিষ্টি বানানোর টাকা ছিল না। অন্য জনের কাছ থেকে ধার করে মিষ্টি বানিয়েছি সে মিষ্টি সারা দিন ফেরি করত আমার স্বামী। মিষ্টি বিক্রির টাকা জমিয়ে ৪০ শতক জায়গা লিজ নিলাম। ঐ জমিতে সবজি চাষ করেছি। রাতে মিষ্টি বানাতাম দিনে সবজি খেতে কাজ করতাম।

নিজের লাগানো সবজি বাগানের সামনে আনোয়ারা

শাক সবজির পাশাপাশি হাঁস, মুরগী এবং গরু পালন করেন আনোয়ারা বেগম। ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায়। এক ছেলে কে সৌদিয়া পাঠান। ছেলের পাঠানো টাকা এবং নিজের জমানো টাকা দিয়ে কিনলেন একটি নৌকা। ছেলে দেশে ফিরে আসলে আর যেতে দেননি মা আনোয়ারা। দুই সন্তান এখন নৌকা চালায়। দৈনিক ৫-৬ হাজার টাকা আয় হয় আনোয়ারার। সংসারের অস্বচ্ছলতা দূর হয়ে সুদিন ফিরে। স্বামী সন্তান, নাতি-নাতনি নিয়ে ১২ জনের পরিবার নিয়ে সুখে কাটছে আনোয়ারার সংসার।

আনোয়ারা সংসারের কাজের পাশাপাশি মানুষের জন্যে কাজ করেন। ২০১৩ সালে উপজেলা থেকে ধাত্রী প্রশিক্ষণ নেন তিনি। ১০৪ জন সন্তান জন্ম হয়েছে আনোয়ারার হাতে। এছাড়া নারী নির্যাতন, বাল্য বিয়ে, বহু বিয়ে হলে ছুটে যান আনোয়ারা নারী পদাতিক নিয়ে। কখনো সফল হন কখনো উপজেলা কর্মকর্তার হস্তক্ষেপে এই সব সামাজিক সমস্যার সমাধান করেন। এই সব কাজ আনোয়ারা নিজে থেকে করেন। গ্রামের মানুষ তাই আনোয়ারার ইচ্ছা না থাকা স্বত্বেও ইউনিয়ন পরিষদে সংরক্ষিত আসনে দাঁড় করিয়ে দেন। মাত্র ৪৫ হাজার টাকা খরচ করে আনোয়ারা বেগম সুনামগঞ্জের বাদাঘাট ইউনিয়নের মেম্বার নির্বাচিত হয়েছেন। ৪৫ হাজার টাকার অধিকাংশ টাকায় জনগণের গন চাঁদার টাকা। আনোয়ারা বেগম বলেন- মানুষ ভালবেসে আমাকে মেম্বার করেছে। আগেও মানুষের জন্যে কাজ করতাম এখন আরও বেশি করে করছি। মৃত্যু পর্যন্ত কাজ করে যেতে চাই।

আনোয়ারা বেগমের জনহিতৈষী এই সব কাজের জন্যে বিভিন্ন জায়গা থেকে পেয়েছেন সম্মাননা। ২০১৪ সালে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা একশনএইড থেকে আনোয়ারা বেগমেকে দেওয়া হয় নাসরীন স্মৃতি পদক। মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর থেকে ২০১৬ সালে রোকেয়া দিবসে আনোয়ারা বেগমকে জয়িতা পুরস্কার প্রদান করেন।

নিজের অর্জিত পদকের সামনে আনোয়ারা বেগম