১৪৯ বছরের পুরাতন বিদ্যাপীঠ চট্টগ্রাম কলেজ

চট্রগ্রাম কলেজের প্রশাসনিক ভবন। ছবিঃ সংগৃহীত

চকবাজার থেকে গনি বেকারির দিকে ডঃ মোহাম্মদ এনামুল হক সড়ক দিয়ে সামনে গেলে হাতের বামে চট্টগ্রাম কলেজ অবস্থিত। চট্টগ্রাম কলেজের সামনে সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ এবং চট্টগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়। সুদর্শন গেইট দিয়ে চট্টগ্রাম কলেজের ভিতরে প্রবেশ করলে সবুজে আচ্ছাদিত মনোরম ক্যাম্পাস যে কারো মনকে শান্ত করে দিবে। ৬ একর বিশিষ্ট এই ক্যাম্পাসে ১৫টি প্রাতিষ্ঠানিক ভবনে শিক্ষার্থীদের আনাগোনা কর্মচঞ্চল করে রাখে সারা দিন। সন্ধ্যার সময় শিক্ষার্থীদের কর্মচঞ্চলতা কমলেও নানা প্রজাতির পাখির ডাক প্রকৃতি প্রেমি মানুষের নগরের ব্যস্ততার মাঝে প্রশান্তির পরশ দিবে।

১৪৯ বছরের পুরাতন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ১৮৬৯ সালে উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ হিসেবে যাত্রা শুরু করে। তবে প্রতিষ্ঠাকালীন সময় ১৯৩৬ সালে এটি ছিল চট্টগ্রাম জেলা স্কুল।একটি পর্তুগিজ আমলের স্থাপনায় সূচনা হয় চট্টগ্রাম কলেজের। কলেজে উন্নীত হওয়ার পর জেসি বোসকে দায়িত্ব দেওয়া হয় প্রথম অধ্যক্ষ হিসেবে। ১৯০৯ সালে কলা বিভাগের পাশাপাশি চালু হয় বিজ্ঞান বিভাগ। ১৯১০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণীর ডিগ্রী কলেজের মর্যাদা লাভ করে চট্টগ্রাম কলেজ। সেই থেকে এই কলেজে গনিত, রসায়ন বিজ্ঞান ও পদার্থ বিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতক (সম্মান) পর্যায়ের বিষয় সমূহ  পাঠদান আরম্ভ হয়। ১৯১৯ সালে ইংরেজি এবং সম্পূরক শ্রেণীতে দর্শন এবং অর্থনীতি স্নাতক শ্রেণীর বিষয় সমূহে যোগ করা হয়। ১৯২৪ সালে শামসুল ওলামা কামালুদ্দিন আহমদকে অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম কলেজের প্রথম মুসলামান অধ্যক্ষ। তার আমলে চট্টগ্রাম কলেজ দ্রুত উন্নতি লাভ করে।  শামসুল ওলামা কামালুদ্দিন আহমদ  প্রথম সহশিক্ষা কার্যক্রম চালু করে। যা চট্টগ্রাম অঞ্চলের নারী শিক্ষার জন্যে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল। তার সময় শেরে বাংলা এ, কে, ফজলুল হক মুসলিম হোস্টেল এর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। যা পরে শেরে বাংলা এ, কে, ফজলুল হক হোস্টেল  নাম করণ করা হয়। ওলামার সময়েই কলেজ ম্যাগাজিন প্রকাশ করার রেওয়াজ চালু হয়। ১৯৫৫ সাল থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত সকল স্নাতক কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয় যা পরে ৬০ সাল থেকে পুনরায় চালু হয়।১৯৬২ সাল থেকে প্রাণীবিদ্যা, উদ্ভিদবিদ্যা এবং পরিসংখ্যান এ স্নাতক (সম্মান) শ্রেণী চালু করা হয়।

১৯৫৫ থেকে ১৯৬৫ এর মাঝে ব্যাপক হারে অবকাঠামোগত পরিবর্তন ও পরিবর্ধন সাধন করা হয়। তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার অধীনে এর বিজ্ঞান গবেষনাগার এর উন্নয়ন সাধন, নতুন প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ, নতুন ছাত্রাবাস নির্মাণ এবং পদার্থ, রসায়ন ও জীববিজ্ঞান অনুষদের জন্য আলাদা ভবন নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে এটি চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে উচ্চ মাধ্যমিক সনদের পাশাপাশি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বাংলা, ইংরেজি, অর্থনীতি, পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন বিজ্ঞান, উদ্ভিদবিদ্যা, প্রাণীবিদ্যা, গনিত, পরিসংখ্যান, ভূগোল, ইতিহাস, রাজনীতি বিজ্ঞান, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, দর্শন, সমাজবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পাঠদান ও সনদ প্রদান করে থাকে। এখানে মানবিক এবং বিজ্ঞান বিভাগের প্রায় ২০ টি বিভাগে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর করার সুযোগ আছে।

চট্রগ্রাম কলেজের ঐতিহ্যবাহী রেট বিল্ডিং। ছবিঃ সংগৃহীত

শিক্ষার্থীদের জন্যে  আলাদা মিলনায়তন,জিমনেশিয়াম,ক্যান্টিন (ছাত্র ও ছাত্রীদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা সম্বলিত),ডাকঘর, ব্যাংক আছে। রোভার স্কাউট, বিএনসিসি সেনা, নৌয়, বাঁধন, ডিবেটিং সোসাইটিসহ অনেক সংগঠন এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মেধা ও মনন বিকাশের সুযোগ রয়েছে চট্টগ্রাম কলেজে। ১৫টি প্রাতিষ্ঠানিক এবং ১২টি আবাসিক ভবন নিয়ে চট্টগ্রাম কলেজের অবস্থান। তিনটি ছাত্র হোস্টেল এবং একটি ছাত্রী হোস্টেলে প্রায় ১ হাজার ছাত্র-ছাত্রী থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া অমুসলিম ছাত্রদের জন্যে আলাদা আবাসিক ব্যবস্থাসহ অধ্যক্ষ এবং শিক্ষকদের জন্যে  আবাসিক ব্যবস্থা রয়েছে। অধ্যক্ষ এবং শিক্ষকদের আবাসিক ব্যবস্থা চালু থাকলেও হোস্টেল গুলো বন্ধ হয়ে গেছে।

ছবিঃ সংগৃহীত

চট্টগ্রাম কলেজের রয়েছে সমৃদ্ধ পাঠাগার। অডিটেরিয়ামের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত এই পাঠাগারে প্রবেশ করলে স্বাগত জানাবে প্রায় অর্ধ লাখেরও বেশি বই। অনেক পুরাতন এবং দুর্লভ বই আছে এই পাঠাগারে।

পদার্থ  ভবনের সামনে দিয়ে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এবং সোহরাওয়াদী হোস্টেলের পাশ দিয়ে একটু সামনে গেলে চোখে পড়বে ঐতিহ্যবাহী প্যারেড ময়দান। ক্রীড়া পাগল তরুণরা সারা দিনেই মাঠে বিভিন্ন অংশে খেলা করে।

ডঃমুহাম্মদ ইউনুস , আহমদ ছফা, সলিমুল্লাহ খান, আবু বক্কর রফিক, আ জ ম নাসির উদ্দিনসহ অনেক গুনী এই কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন।