দণ্ডিত রাইফেল থেকে পাঁচটি কবিতা : শিশির মোরশেদ

আর্টিস্ট

আমি মাতাল হলেই চুমু আঁকি বিষণ্ণ ঠোঁটের
বুকের অস্থিরতায় আঁকি গৃহহীন ক্লান্ত মুসাফির

বিকেলের চেম্বারে বসে আঁকি,- এক মুমূর্ষু রোগীর যাপন
আমি মাতাল হলেই খুন আঁকি,
অনন্তকাল ধরে আঁকি; আঁকতে আঁকতে ভুলে যাই
লাশের উপর দাঁড়িয়ে থাকা সবুজ বিজ্ঞাপন।

ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে মিথ্যে বলি, শেষ ইচ্ছে নেই আমার
চাইলে পারতাম, অন্তত বিরহটুকু এঁকে- কী চমৎকার
মরণ হতো
কিন্তু আমি আঁকি না এমন কোনো দৃশ্য
যেখানে-
প্রেমিকা পায় না প্রেমিক, প্রেমিক পায় না প্রেমিকা

গোলাপ হাতে দাঁড়ানো,- ম্রিয়মাণ,-কোনো যুবকের বুক
আমি চাইলে এঁকে দিতে পারতাম
সমগ্র সংসারে তোমার চিবুক
অথচ তা করিনি- আঁকিনি

আমি মাতাল হলেই আঁকি প্রেম- পথ থেকে পথে

মাতালকে ভালোবাসা জায়েজ নয়, না জেনে,- জানো
একটা আর্টিস্ট কেবল চেয়েছে তোমার হতে।


দণ্ডিত রাইফেল: শিশির মোরশেদ, প্রকাশনা: ঘাসফুল, মূল্য: ১২০ টাকা

জিরো পয়েন্ট

যখন অলসতা আসে; ঈশ্বরকে মনে পড়ে
মৃত্যু নিয়ে ভাবি এবং বালিশ রাখি মাথার উপর
উপুড় হয়ে শুঁই- কাউকে মনে করিনা
লোডশেডিং হয়- গরমে ঘেমে যাই

টেবিলে গুছানো সাহিত্য বইয়ের শিরোনাম পড়ি
দু’চারটে কুকুর ঘেউঘেউ করে- ছোট বোন দৌঁড়ে পালায়
বিদ্যুৎ এলেই- মা তাড়াহুড়ো করে হিন্দি সিরায়ালের পর্দা উঠায়
বাবা গিয়ে রিমোট কেড়ে নেয়; খবর দ্যাখে

আর আমি খবর শুনি- তিনবছরের মেয়ে ধর্ষিত হয় পিতার হাতে
সংবাদটা শেষ না হতেই; চ্যানেল পরিবর্তন করেন বাবা
হয়তো লজ্জায় আর নয়তো ঘৃণায়

ধীরে ধীরে দাঁড়াই- জানলা খোললেই চোখে পড়ে পরকীয়া
একটু হেঁটে বোনের রুমে যাই; তার ফোনে ম্যাসেজ আসে
যেহেতু চোখের সামনে ফোন,না পড়ে পারিনা
ম্যাসেজটা পড়লাম, লেখা এরকম ছিল
সেদিন তুমি আমাকে স্তনে হাত দিতে দাওনি
চুমুতে কি আসে যায়

লজ্জায় ঘৃণায় আর কিছু বলতে পারি নি

বাইরে এসে দেখি তিনটে কুকুরী হাফাচ্ছে
মনেপড়লো আজকে ছুটিরদিন- ভাদ্র মাসের ১তারিখ

পবিত্র হয়ে মসজিদের দিকে পা বাড়াতেই- ফোন বেজে উঠে
কল রিসিভ করতেই দেখি মেয়ের কণ্ঠ- বলছে
কি রে শালা? গতোরাতের টাকা কে দিবে?
রং নাম্বার বলে কেটে দিই
হাউমাউ করে কেঁদে ওঠা কারো গলার স্বর শুনে
বাইরে আসি- শুনি,প্রতিবেশী প্রবাসীর মৃত্যু সংবাদ

অতঃপর আবার অলসতা আসে; ঈশ্বরকে মনে পড়ে
উপুড় হয়ে শুঁই; বালিশ মাথার উপরে রেখে
মৃত্যু নিয়ে ভাবি।


পিতার জায়নামাজ
( উৎসর্গ : পিতার সাইকেলকে)

যখন সন্ধ্যা নেমে আসতো মধ্যবিত্ত সংসারে
মা দৌড়াতো চেরাগ নিয়ে,বোন দৌড়াতো ছোটভাইকে নিয়ে
আগুন জ্বালানোর মত সামান্য শলাকাটুকুও থাকতোনা আমাদের                      
       মাঝেমধ্যে

আঁধার একটু ঘনিয়ে এলে শুনতে পেতাম
বাবার
       সাইকেলের বেলের ধ্বনি

আর তখন
ভাই বোন সবাই একসাথে দৌঁড়ে গিয়ে
সাইকেলের পেছনটা দ্যাখতাম
               কাঁঠাল এনেছে কি না
               আম এনেছে কি না
               আনারস এনেছে কি না
               আখ এনেছে কি না ইত্যাদি

বাবা কোনোদিন খালি হাতে ফিরে নি
       আমাদের হাসিমুখ দ্যাখে
                বাবা ভুলে যেতো তার
সারাদিনের ক্লান্তি, অভিযোগ এবং কষ্ট।

এশারের সময় হলে বাবা নামায শেষ করে জায়নামাজে বসতো
     আমরা পড়ার টেবিল থেকে উঁকি মারতাম
এই বুঝি এখনই খাওয়ার জন্য ডাকবে বাবা
                এবং ডাকতো
বাবার সাথে সবাই মিলে হাসিমুখে খেতে খেতে
    কতোই না গল্প করতাম
চুলোতে লাকড়ি জ্বালাতে জ্বালাতে মা দ্যাখতো
         মা আমাদের সাথে খেতো না
মাঝেমধ্যে খেতো, মায়েরা শেষে খায়
      
অতঃপর ধীরে ধীরে   
          সে রাতের জায়নামাজ,সে রাতের হাসিমুখ
অনেক বড় গয়ে গ্যাছে
          বাবা চাকরি থেকে রিটায়ার্ড নিলো
বোনেরা চলে গেলো যে যার শ্বশুর বাড়ি
ভায়েরা একেকজন
                       একেক কর্মস্থলে

বাবার সাইকেল এখনো আছে
                   জায়নামাজও আছে
তবে সন্ধ্যা হলে এখন আর বাবার পথ চেয়ে থাকিনা
এশার নামাযের পর বাবা কিছু খেতে ডাকবে
             সে আশায়ও থাকি না

   বাবা এখন বিছানায় শুঁয়ে শুঁয়ে মৃত্যু প্রহর গোনে
                             আর
               আমরা আছি যে যার মতো।


লাকাঁটা ঘরে

প্রথমে তারা আমার ২০টি আঙুলের ১টি আঙুলও নেই দ্যাখে
অবাক হয়নি !
তারপর
কিছুক্ষণ দৃষ্টি স্থগিত রেখে
চোখ দু’টো উপড়ে নিলো
মনোযোগ সহকারে আবার তারা কাটতে লাগলো
একেক করে
হাত
পা
কান
জিহ্বা
মস্তিষ্ক আলাদা একটা বাটিতে রেখে
অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলো টুকরো টুকরো করে সব স্তুপাকারে রাখলো
দ্যাখছে আমি চিৎকার করছিনা
তবুও অবাক হয়নি তারা!

বুক কেটে যখন বাঁপাশে ছুরি রাখে
আমি অদ্ভুতভাবে চিৎকার দিলাম
আর বললাম- দয়া করে সেদিকে ছুরি বসাবেননা
সেখানে আমার ঈশ্বর থাকেন
তারা আমার কথা শুনলোনা, কেটে ফেললো

তাৎক্ষণাৎ পাশ থেকে আরেকটা কাটালাশের অলৌকিক শব্দ আসে
একটা লাশকে আর কতো টুকরো করলে মনুষ্য জীবন সার্থক হয়, মানুষ ?

শব্দগুলো আমার কোন ধর্মরক্ষাকারীর মনে হয়নি।


ঘাতক

ফিরে এলে নির্ঘাত মৃত্যু হবে আমার

শ্মশানেও পাওয়া যাবেনা লাশ
একবার মানুষ
বিশ্বাসে প্রেমিক হলে
তবুও কোনো অজুহাতে
দ্যাখবেনা খুলে
                   অন্তর্বাস
প্রতিশ্রুতি দাও কাকে তার
প্রেমিকা হওয়ার পরও
                     যে বেশ্যা হয়ে যায়          
তাকে দিলামনা অভিশাপ পুনর্বার।