আ’লীগের সেতু, বিএনপির রাস্তা: মুখ দেখাদেখি না হওয়ার ১০ বছর

সেতু আছে, রাস্তাও আছে। অথচ কেউ নেই। কেউ কারও সঙ্গে নেই। রাস্তা গেছে খালের মুখ বন্ধ করে। আর সেত খালের ওপর। দুই পাড়ে নেই সংযোগ সড়ক। কারোরই কাজে আসছে না সেতুটি। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের মসুরী গ্রামে এই সেতুটি দেশের উন্নয়নের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

১৮ বছর আগে বিএনপি সরকারের ক্ষমতাকালে বানানো হয় মাটির উঁচু সড়ক। তখন সেতু বানানোর বরাদ্দ না থাকায় খালের মুখ বন্ধ করে তৈরি হয় রাস্তা। এর পরে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসলে বরাদ্দ হয় সেতুর বাজেট।

বিএনপির আমলে তৈরি সড়কে আওয়ামী লীগ সরকারের সেতু। ছবি: দীপু মালাকার

এসময় আওয়ামী লীগের এক নেতা অভিযোগ জানায় রাস্তাটা তার ব্যক্তিগত জমির ওপর বানানো। সেকারণে সেতুটা রাস্তার ওপর না করে করা হয় খালের ওপর। সেতুটি ৪ পিলারের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। দৈর্ঘ্য প্রায় ২৫ হাত, আর প্রস্থ প্রায় ৮ হাত। কিন্তু সংযোগ সড়কের বরাদ্দ নেই বলে সেতুটা দাঁড়িয়ে থাকে শূন্যে।

বিএনপির রাস্তার সঙ্গে আওয়ামী লীগের সেতুর এই বনিবনা না হওয়ার ইতিহাস প্রায় ১০ বছরের। মাঝখান থেকে খরচ হয়ে গেছে লাখো টাকা। কারো উপকারেই তারা আসেনি। স্থানীয় মানুষের কথায়, সেতু ও রাস্তা উভয়ই ‘ভিলেজ পলিটিকসের’ শিকার।

স্থানীয় এক শিক্ষক হাসতে হাসতে বলেন, ‘নিশ্চয়, আপনারা দেখতে এসেছেন এই সেতুটা। অনেকেই আসে। দেখে আর শুধু হাসে।’ নাম প্রকাশে তাঁর ভয়। আক্ষেপের সুরে তিনি বললেন, ‘ভিলেজ পলিটিকস আছে না ভাই? এটা সেই পলিটিকসের ফল। যারা রাস্তা বানাইছে আর যারা কালভার্ট বানাইছে, হ্যারা চাচাতো-জ্যাঠাতো ভাই। অ্যাগো (এদের) বিএনপি শক্তি আর হ্যাগো (তাদের) আওয়ামী লীগ শক্তি। বিএনপি বরাদ্দ করাইছে এই রাস্তা একভাবে, আর আওয়ামী লীগাররা সেতু করছে আরেকভাবে। কইছে, এইডা আমাগো ব্যক্তিগত জায়গা, তোরা সরকারি হালটের (হাঁটার কাঁচা রাস্তা) ওপর দিয়া রাস্তা নে আগে।’

সড়কের দক্ষিণ পাড়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য আবদুল জলিল মিয়ার বাড়ি। সেতুটি কোনো কাজে আসছে না, লোকে হাসাহাসি করছে, এমন কথা জানানোর পর জলিল মিয়ার সাফ জবাব, ‘বাধার কারণে আমরা রাস্তার ওপর সেতু করতে পারি নাই। এখন বরাদ্দ পাইলে সেতুর লগে রাস্তা জোড়া দিমু। অথবা হ্যারা যদি জায়গা দিত, তাইলে হেইখানেই সেতু হইত। হাসার কোনো কারণ নেই।’

আবদুল জলিল। ছবি: আসাদুজ্জামান

স্থানীয় মালেক মাস্টারের (৯৬) বলেন, ‘সরকারি জায়গায় রাস্তা বানানোর কথা। কিন্তু বিএনপির লোকেরা আমার জমির ওপর দিয়ে রাস্তা বানাইছে।’ অভিযোগ মালেক মাস্টারের কণ্ঠে, ‘আমি তো আওয়ামী লীগার। তাই আমার একটু ক্ষতি তো করণ লাগব হ্যাগো। তাই শত্রুতা কইরা আমার জমি কাইট্টা রাস্তা করেছে। অথচ সরকারি জমি পইড়া রইছে।’

রূপগঞ্জ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বলেন, ‘আগে সেতু হয়েছে, পরে রাস্তা।’ পুনরায় মেম্বার জলিল মিয়া ও মালেক মাস্টারের দেওয়া তথ্য জানানো হলে তিনি বক্তব্য বদলান, ‘অনেক আগের ঘটনা তো। অপ্রয়োজনীয় সেতু সব ভেঙে ফেলা হবে।’ রূপগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের সচিব হাবিব উল্লাহ মুঠোফোনে জানান, মসুরী এলাকায় আগে রাস্তা পরে সেতু হয়। সরকারি টাকায় এই সেতু বানানো হয়।’

সেতুর দুই পাড়ে নেই সংযোগ-সড়ক। ছবি: দীপু মালাকার

সেতুর ঠিকাদার আমিনুল হক জানান, ‘দেড় থেকে দুই লাখ টাকা খরচ হয়েছে সেতুটি বানাতে।’ এভাবে সেতুটি কেন বানালেন? তাঁর জবাব, ‘রাস্তার পাশেই সেতুটি করতে গিয়েছিলাম। এলাকার লোকজনও বলেছিল, রাস্তা পরে ঘুরায় দেবে। ওইভাবে করেছিলাম। কোন্দলের কারণে এলাকার লোকজন রাস্তা আর ঘুরায়নি।’

রূপগঞ্জ উপজেলার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবুল ফাতে মোহাম্মদ সফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আগে কেউ বিষয়টি তাঁকে জানায়নি। জানার পর সেতুটি দেখতে লোক পাঠিয়েছেন। সোমবার দুপুরে জানালেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে প্রতিবেদন আকারে সমস্যাটি সমাধানের জন্য জানাবেন।’

রাস্তাটা সোজা এসে খালের কাছে বাঁক নিয়ে ঘুরে আবার অন্য পাড়ে সরল রেখাতেই এগিয়েছে। অর্থাৎ রাস্তা ও সেতু সরল রেখাতেই নির্মিত। সড়ক নির্মাণের সময় সেতু ছিল না বলে ধনুকের মতো কিছুটা বাঁক নিয়েছে রাস্তাটা। সেতুটা নির্মিত হয়েছে রাস্তা বরাবর। এখন সংযোগ সড়ক বানালেই রাস্তা আর সেতু মানানসইভাবে মিলে যায়। কিন্তু মাঝখানে রাজনৈতিক বিভেদের গর্ত।