আফগান শরণার্থীদের ভরসা প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান

আফগানিস্তানের উদ্বাস্তুরা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর ইমরান খানের ওপর ভরসা করছে!

আফগান শরণার্থী

শাহজাদ আলম বেশ কয়েকজন মহিলাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিয়েছেন।      
কিন্তু প্রতিবারই একই কারণে একই কারণে তারা তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। 
শাহজাদ আলম বলেন, তাদের ধারনা তিনি পাকিস্তানি জুতা দোকানের 
মালিক নন,বরং তিনি একজন আফগান শরণার্থী।

  

শাহজাদ আলমের বিয়ে করার এই রোমান্টিক স্বপ্ন সত্যি হবে , যদি প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান তাঁর প্রতিশ্রুতি   
রক্ষা করেন ।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান পাকিস্তানে জন্মগ্রহণকারী আফগান শরণার্থীদের নাগরিকত্ব প্রদানের বিতর্কিত
অঙ্গীকার করে জাতীয় বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন। অঙ্গীকার রক্ষা করা হলে সম্ভাব্য দশ লক্ষেরও বেশি নতুন নাগরিক
তৈরি হবে পাকিস্তানে।
পাকিস্তান বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী-আশ্রয় দেওয়া দেশগুলির মধ্যে একটি,
আনুমানিক ২.৪ মিলিয়ন নিবন্ধিত এবং অননুমোদিত ব্যক্তি রয়েছে যারা 
আফগানিস্তান থেকে পালিয়ে এসেছে । কেউ কেউ ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত
আক্রমণের পর পাকিস্তানে আশ্রয় নেয়।
কিন্তু অনেক পাকিস্তানি তাদের সন্দেহের চোখে দেখে এবং তারা  জঙ্গিবাদসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজের সাথে
যুক্ত বলে দাবী করে । ফলে তারা চায় এসবশরণার্থীদের যেন তাদের দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।
পাকিস্তানের সংবিধান মতে ১৯৫১ সালের পর সেদেশে জন্মগ্রহণকারী সকলেরনাগরিকত্বের অধিকার আছে। কিন্তু
উদ্বাস্তুদের বিরুদ্ধে অনুভূতি এত শক্তিশালী যে নীতিমালা বাস্তবায়নের জন্য কোন নেতা পদক্ষেপ গ্রহণের সাহস
করেননি। ইমরান খান প্রথম কোন পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী যিনি এ প্রতিশ্রুতি দেবার সাহস করেছেন।

ইমরান খান
 
শরণার্থীরা অত্যন্ত আনন্দিত হয় ইমরান খানের প্রতিশ্রুতির পর। অনেকটুইটার ব্যবহারকারীরা মজা করেছিলেন
যে ,খান এখন আফগানিস্তানেনির্বাচনে জয়ী হতে পারবেন। শাহজাদ আলম এএফপিকে বলেন "আল্লাহ ইমারান খানকে
আশীর্বাদ করুন" । 
কিন্তু এ ঘোষণার ফলে জাতীয় অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
কলামিস্টরা দাবি করেন যে তিনি "প্যান্ডোরাসের বাক্স" খুলেছেন। 
পাকিস্তানের প্রধান বিরোধী দলগুলোর নেতারাও দ্রুত এ ঘোষণার নিন্দা জানিয়েছেন।

দেশের সংবাদপত্র ও সোশ্যাল মিডিয়াতে বিতর্ক চলছে।
দোকানের মালিক আলমের জীবন তাই এখনো অনিশ্চিত।

আলম একজন পাকিস্তানী অভিনেতাকে জানান,তিনি উত্তরপশ্চিম শহর পেশোয়ারে সারাজীবন বসবাস
করেছেন । এখানেই ১৯৭৯ সালে তার বাবা-মা আফগানিস্তান থেকে পালিয়ে যাওয়ার আসার পর তাঁর জন্ম
হয়েছিল।
আলম বলেন, অতীতে বিয়ের প্রস্তাব উত্থাপন করার জন্য মহিলারা তাকে বলেছিলেন।তখন মহিলারা তাকে বলেছিল,
আফগান হিসাবে তারা তাদের পরিচয় দেবে।  
জাতিসংঘ বলেছে যে পাকিস্তানে ১.৪ মিলিয়ন আফগান নাগরিক শরণার্থী হিসাবে নিবন্ধিত, এবং আনুমানিক ৭৪ 
শতাংশ মানুষ সেখানে জন্মগ্রহণ করেন। এদের মধ্যে অনেকেই ক্যাম্পে বাস করে,অন্যরা পাকিস্তানের শহরগুলিতে
বিয়ে করছে ও সন্তান জন্ম দিচ্ছে । এছাড়া তারা কর্মসংস্থানের জন্য নিজেরাই দোকান দিচ্ছে।পেশোয়ার বাজারে 
হাজার হাজার আফগানকে স্থানীয় ও চীনা পণ্যসহ তাজা ফল এবং সবজিসহ শত শত দোকান চালাতে দেখা যায়।
যা তাদের অর্থনৈতিক অবদানগুলির দৃশ্যমান লক্ষণ।
৪৩ বছর বয়সী শরণার্থী আশিকুল্লাহ জন বলেন, "আমি অনুভব করি যে আমি আমার নিজের গ্রামে, নিজের
দেশে আছি।"
আফগানিস্তানে সংঘাত আরও খারাপ হওয়ার কারণে পাকিস্তান থেকে তাদের চলে যাবার সম্ভাবনা আরো ক্ষীণ হচ্ছে।
অনেক বিশ্লেষক ভবিষ্যতে শান্তি আলোচনার পরামর্শ দিচ্ছেন।
 
২০১৬ সালে পাকিস্তান থেকে আফগানিস্তানে জোরপূর্বক শরণার্থীদের পাঠিয়ে দেওয়ায় যে মানবিক 
সংকটের আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছিল , ইমরান খান সেদিকে আগ্রসর না হয়ে বিপরীত সিদ্ধান্ত নেবেন বলেই মনে হচ্ছে।
সেপ্টেম্বরে ইমরান খান বলেন, "আপনি যখন আমেরিকায় জন্মগ্রহণ করেন, তখন আপনি আমেরিকান পাসপোর্ট 
পাবেন ..তাহলে কেন এখানে নয় ?এটা তাদের সাথে অত্যন্ত নিষ্ঠুর আচরণ!"

প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক এমন ঘোষণা আসার পর থেকে হৈচৈ শুরু হয়ে যায় । কেননা , পাকিস্তানে বহুদিন ধরে
জঙ্গীবাদ ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছে দেশটির সেনাবাহিনী । যেখানে বেশিকভাগ ক্ষেত্রেই এসব 
অপরাধমূলক কাজের সাথে আফগানদের জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া যায় । অনেক ক্ষেত্রে শরণার্থী 
শিবিরেও তাদের আশ্রয় দেবার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ইমরান খান নাগরিকত্ব দেবার ঘোষণা দিলেও অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরী হওয়ায় তা এখনো সংসদে উত্থাপন 
করেননি।

বিশ্লেষক রহিমুল্লাহ ইউসুফজাইও সতর্ক করেছিলেন যে গত জুলাইয়ে ক্ষমতায় আসার পর থেকে
প্রধানমন্ত্রী যে ইউ-টার্নগুলির জন্য খ্যাতি অর্জন করেছেন তা পূর্বের নীতিমালাকে ধাক্কা দিলেও 
বাস্তবায়ন করতে সময় লাগবে। তিনি বলেন, "তাদের নাগরিকত্ব দিতে ,সংসদে বা দেশে এই বিষয়ে
একমত হওয়া সহজ হবে না"।


এদিকে জাতিসংঘের উদ্বাস্তু সংস্থা ইউএনএইচসিআর এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে।
পাকিস্তানের প্রতিনিধি রুভেন্দ্রিনী মেনিকদিয়েলা এএফপিকে বলেন,"আফগান শরণার্থীদের বেশিরভাগ তরুণ এখানে
জন্মগ্রহণ করেছে এবং তারা কেবল পাকিস্তানকেই জানে"

আফগানিস্তানের সীমান্তের নিকটবর্তী পেশোয়ারের বাজারে এএফপি-এর সাথে স্থানীয় পাকিস্তানিরা কথা বলে 
এবং জানায় যে শরণার্থীদের জন্য কেন্দ্র তৈরি করাকে তারা দৃঢ়ভাবে বিরোধিতা করে। ৪২ বছর বয়সী রেহমান গুল
এএফপিকে বলেন, 'সরকারের উচিত যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শরণার্থীদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া। 

নতুন উৎপাদিত পণ্যের বিক্রেতা আজিম খান, যিনি এই পদক্ষেপ সমর্থনকারী কয়েক পাকিস্তানিদের মধ্যে একজন।
ফলে প্রায়ই তার গ্রাহকদের সাথে যুক্তিতর্ক এমনকি বাকবিতণ্ডার সৃষ্টি হয়। সেখানে একজন গ্রাহক শরণার্থী খায়স্তা
খান ,এএফপিকে জানান, আফগানিস্তানে "কিছুই অবশিষ্ট নেইশুধুমাত্র "তালিবান ও দাশ (ইসলামিক স্টেট) এবং
বোমা ছাড়া'।
বিতর্ক স্থিমিত হলে তিনি বলেন, "আমি এখানে জন্মগ্রহণ করেছি ... পাকিস্তান আমার দেশ এবং 
আমি পাকিস্তান ছেড়ে যেতে চাই না"।
 
সূত্রঃ এএফপি