শূন্য পদ পূরণে উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি , সুযোগ পাবেন কম বয়সী নেতারাও

সর্বশেষ ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল করেছিল বিএনপি। দলটির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জাতীয় নির্বাহী কমিটি ৩ বছরের জন্য নির্বাচিত হবে এবং পরবর্তী জাতীয় নির্বাহী কমিটি দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত এই কমিটি দায়িত্ব পালন করবে।

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাবন্দি । তাঁকে ছাড়া জাতীয় কাউন্সিল করার কথা ভাবছে না বিএনপি।তবে জাতীয় স্থায়ী কমিটির পাঁচটি শূন্য পদ রয়েছে ।তাই দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সেসব শূন্য পদ পূরণের উদ্যোগ নিয়েছে ।

ইতিমধ্যে এ ব্যাপারে সম্মতিও দিয়েছে দলটির হাইকমান্ড। স্থায়ী কমিটির দু’জন সদস্য রাজনীতি থেকে অবসর নিতে পারেন। সেক্ষেত্রে পরীক্ষিত ও ত্যাগী প্রবীণ নেতার পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত কম বয়সী নেতাদেরও স্থায়ী কমিটিতে স্থান দিতে চায় দলটি।

একইসঙ্গে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদ, দলের ভাইস-চেয়ারম্যানসহ নির্বাহী কমিটির ফাঁকা পদও পূরণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিএনপির একাধিক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক নীতিনির্ধারক বলেন, মার্চে দলের নির্বাহী কমিটির মেয়াদ শেষ হবে ঠিকই।কিন্তু আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাবন্দির এক বছর পূর্ণ হবে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানও দেশের বাইরে রয়েছেন। লাখ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা, তারা ঘরে থাকতে পারছেন না।হাজারও নেতাকর্মী রয়েছেন কারাগারে। এমন অবস্থায় নতুন করে দলের জাতীয় কাউন্সিল করার মতো পরিস্থিতি নেই। তাই এখন স্থায়ী কমিটি ও জাতীয় নির্বাহী কমিটির শূন্য পদ পূরণের বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান পরামর্শ দিয়েছেন।এ ব্যাপারে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অনুমতির অপেক্ষায় রয়েছি আমরা। অনুমতি পেলেই শূন্যপদগুলো পূরণ করা হবে।

কমিটি ঘোষণার সময়ই ১৯ সদস্যের স্থায়ী কমিটির ২টি পদ ফাঁকা ছিল। বাকি ১৭ সদস্যের মধ্যে তরিকুল ইসলাম, আ স ম হান্নান শাহ ও এম কে আনোয়ার মারা গেছেন। ফলে বর্তমানে ৫টি পদ ফাঁকা। লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান ও ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া অসুস্থতার কারণে নিয়মিত সময় দিতে পারছেন না। স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ কমিটি ঘোষণার আগে থেকেই ভারতের শিলংয়ে আছেন।

সূত্র জানায়, মঙ্গলবার গুলশান কার্যালয়ে নীতিনির্ধারকদের এক বৈঠকে দলের জাতীয় কাউন্সিল নিয়ে অলোচনা হয়। স্থায়ী কমিটির একজন সিনিয়র সদস্য বিষয়টি বৈঠকে তোলেন। তবে অন্য সদস্যদের এ ব্যাপারে আগ্রহ না থাকায় এ নিয়ে বেশি আলোচনা হয়নি।

বৈঠকে বিএনপির নির্বাহী কমিটির শূন্য পদসহ দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন পুনর্গঠনের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। তবে এবার অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা নির্বাচন হবে সরাসরি ভোটে এমন সিদ্ধান্ত হয় বৈঠকে।

বিএনপির একজন সিনিয়র নেতা বলেন, দলের স্থায়ী কমিটির শূন্য পদ পূরণের বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মহাসচিবকে নির্দেশনা দিয়েছেন। আগামী সপ্তাহে কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে স্থায়ী কমিটির সদস্যরা দেখা করতে পারেন। সে সময় বিএনপি নেতারা চেয়ারপারসনের সঙ্গে এ বিষয়টি নিয়েও আলাপ করার কথা রয়েছে।

জানা গেছে, স্থায়ী কমিটির দু’জন সদস্য শারীরিক অসুস্থতার কারণে রাজনীতি থেকে অবসর নেয়ার কথা ভাবছেন। এ নিয়ে ওই দুই নেতা তাদের ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে কথাও বলেছেন। স্থায়ী কমিটির শূন্য পদে আসতে পারেন ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, আবদুল আউয়াল মিন্টু, সেলিমা রহমানের মতো প্রবীণ নেতা। তবে দু’জন অপেক্ষাকৃত কম বয়সী নেতাকেও এই পদে অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে।

উপদেষ্টা-ভাইস চেয়ারম্যানসহ নির্বাহী কমিটির শূন্য পদও পূরণ হচ্ছে । এদিকে শুধু স্থায়ী কমিটি নয় দলের চেয়াপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিল, জাতীয় নির্বাহী কমিটির কর্মকর্তা ও সদস্যের শূন্য পদ পূরণেরও উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এক মাসের মধ্যেই শূন্য পদে নতুন নেতাদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে জানা গেছে। সূত্র জানায়, দলটির ৭৩ সদস্যের উপদেষ্টা কমিটির বেগম সরোয়ারি রহমান, হারুনার রশিদ খান মুন্নু, ফজলুর রহমান পটলসহ সাতজন মারা গেছেন। ৩৭ জন ভাইস চেয়ারম্যানের মধ্যে কমিটি ঘোষণার পরপরই পদত্যাগ করেন মোসাদ্দেক আলী ফালু। ইনাম আহমেদ চৌধুরী দলত্যাগ করে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন। নির্বাহী কমিটির গুরুত্বপূর্ণ ছাত্র ও সহ-ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক পদ দুটি কমিটি ঘোষণার পরই ফাঁকা। নির্বাহী কমিটির সাতটি আন্তর্জাতিক সম্পাদকের মধ্যে ২টি ফাঁকা। সহ-যুববিষয়ক সম্পাদকের নাম ঘোষণা করা হলেও যুববিষয়ক সম্পাদকের পদটি এখনও ফাঁকা। এছাড়া নির্বাহী কমিটির সদস্যদের মধ্যে মারা গেছেন ৪ জন। নির্বাহী কমিটির সদস্য নুর মোহাম্মদ মণ্ডল দলত্যাগ করে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন। এসব ফাঁকা পদে নেতাদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা নির্বাচন হবে সরাসরি ভোটে । ছাত্রদলসহ মেয়াদোত্তীর্ণ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন ঢেলে সাজানোর উদ্যোগও নিয়েছে বিএনপি। পর্যায়ক্রমে তাদের নতুন কমিটি গঠন করা হবে। এসব কমিটি আর প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ‘সুপার ফাইভ’ বা ‘সুপার সেভেন’ নামে নয়, কাউন্সিলের মাধ্যমে সরাসরি ভোটে নেতা নির্বাচন হবে। জানা গেছে, ছাত্রদলের কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে অনেক আগেই। যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঝুলে আছে দীর্ঘদিন ধরে। স্বেচ্ছাসেবক দলেরও একই অবস্থা। কৃষক দল, শ্রমিক দল, তাঁতী দল ও মৎস্যজীবী দলের আরও বেহাল অবস্থা। এসব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গসংগঠন পুনর্গঠনের দাবি অনেক আগে থেকেই করে আসছে নেতাকর্মীরা।

বিএনপি কেন্দ্রীয় এক নেতা বলেন, আগে প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কমিটি করা হতো। যাকে অনেকেই ‘পকেট কমিটি’ বলত। এতে করে তৃণমূলের মতামত উপেক্ষা হয়। এবার অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নতুন কমিটি করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যেখানে তৃণমূলের মতামতও থাকবে। ভোটের মাধ্যমে সব কমিটির নেতা নির্বাচন করা হবে।

‘ড্যাবের’ নতুন কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এদিকে গত শনিবার নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বিএনপি সমর্থিত চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) নেতারা অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করেন। বিকালে শুরু হওয়া এই বৈঠক চলে টানা তিন ঘণ্টা।

বৈঠকের পুরোটা সময়ই স্কাইপিতে যুক্ত ছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সূত্র জানায়, বৈঠকে অধ্যাপক আজিজুল হক, অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন, অধ্যাপক ফরহাদ হালিম ডোনারসহ ১৭ সদস্যের একটি ‘সাবজেক্ট’ কমিটি গঠন হয়। এই কমিটি ১৯ জানুয়ারির মধ্যে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করবে।

ড্যাবের একজন কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, আহ্বায়ক কমিটি সারা দেশের ইউনিট কমিটি গঠন করবে। কাউন্সিলের মাধ্যমে সরাসরি ভোটে এসব ইউনিট কমিটির নেতা নির্বাচনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যদি প্রয়োজন হয় তাহলে গোপনে ব্যালটের মাধ্যমেও কমিটি গঠন হতে পারে। ৩ মাসের মধ্যে ড্যাবের কেন্দ্রীয় কমিটিও একই প্রক্রিয়ায় গঠনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

জানতে চাইলে বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, কাউন্সিলে সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া ড্যাব থেকে শুরু হয়েছে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যখন দেশে ছিলেন তিনিই বগুড়া থেকে এই প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন। আমরা একে ‘বগুড়া মডেল’ বলতাম। এতে করে মূল শক্তি যে মাঠ পর্যায়ের তৃণমূল; তারা মতামত দিতে পারেন। এটি করা হলে তৃণমূলের প্রতি নেতৃত্বের টান থাকে। আবার কেন্দ্রীয় নেতাদেরও দায়িত্ব বেড়ে যায়।