অনিয়ম আর অস্বচ্ছতার কালচারে স্টল পাচ্ছে না ‘আদর্শ’ [বিশদ রিপোর্ট]

অমর একুশে গ্রন্থমেলায় বাংলা একাডেমি স্টল বরাদ্দে অনিয়ম ও অস্বচ্ছতার আশ্রয় নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নিয়মনীতি অনুসরণ করে আবেদন করা সত্ত্বেও দুই শতাধিক বইয়ের প্রকাশক ‘আদর্শ’কে এবারের স্টল বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে না। উল্লেখ্য, টানা নয় বছর ধরে মেলায় স্টল পেয়ে আসছে আদর্শ। অভিযোগ আছে বাংলা একাডেমি মানসম্পন্ন ও তারুণ্যনির্ভর প্রকাশকদের দাবিয়ে রাখার জন্য ‘অসম নীতি’ অনুসরণ করেছে।

এ প্রসঙ্গে আদর্শের স্বত্বাধিকারী মাহাবুবুর রহমান বলেন, ‘আমি বাংলা একাডেমির কাছে লিখিতভাবে জানতে চেয়েছি, স্টল বরাদ্দ না দেওয়ার কারণ কী? তারা কোনো কারণ জানাতে অপারগতা প্রকাশ করে। তবে মেলা কমিটির প্রভাবশালী এক সদস্যকে ম্যানেজ করতে বলা হয় আমাকে।

আদর্শ প্রকাশনী। ছবি: সংগৃহীত

মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ড. জালাল আহমেদ এ ব্যাপারে বলেন, ‘গত ৫ জানুয়ারি মেলা পরিচালনা কমিটির এক বৈঠকে দুটি পুরনো প্রতিষ্ঠানকে এবার বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর বাইরে আমি আর কিছু বলতে পারব না।’

যদিও ধারণা করা যাচ্ছে এ স্টল বরাদ্দের পেছনে আছে তাম্রলিপির প্রকাশক তরিকুল ইসলাম রনি। এর সূত্রপাত গণিত অলিম্পিয়াড থেকে।

সূত্র মতে, তাম্রলিপির মালিক রনি আদর্শের স্টল বরাদ্দ বাতিল করেন মেলা কমিটির সদস্য সুভাষ সিংহ রায়ের মাধ্যমে। প্রত্যেক গ্রন্থমেলায় সুভাষ সিংহের ব্যাপারে এমন অভিযোগ থাকে।

যদি এ বিষয়টি অস্বীকার করে সুভাষ সিংহ রায় বলেন, ‘আমার সারা জীবনের লড়াই, সবাইকে নিয়ে চলতে চাই। ২০০৯ সালে সবার সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে আমিসহ আরও দুজন প্রথমাকে মেলায় স্টল বরাদ্দ দিয়েছি।’

তিনি বলেন, ‘ব্যক্তিবিদ্বেষ আমি কখনো সামষ্টিক সিদ্ধান্তে আনি না। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ অসত্য।’

আদর্শের মালিক মাহাবুব বলেন, ‘আমি মেলা কমিটির সদস্য সুভাষ সিংহ রায়ের কাছে যাই, অনুরোধ করি স্টল বরাদ্দ দেওয়ার জন্য। তিনি অমুক-তমুকের কথা বলে বিষয়টি এড়িয়ে যান।’

তিনি আরও বলেন, ‘খোঁজখবর নিয়ে দেখলাম, তাম্রলিপির কর্ণধার তারিকুল ইসলাম রনি বাংলা একাডেমিকে নানা রকম কথাবার্তা বলে প্রভাবিত করেছে। আমাকে জামায়াত-শিবিরের সমর্থক হিসেবে মিথ্যা অভিযোগ দিয়েছে।

এ ব্যাপারে রনি বলেন, ‘মাহাবুবের সঙ্গে আমার কোনো ব্যবসায়িক বিরোধ নেই। বাংলা একাডেমি তার স্টল বরাদ্দ বন্ধ করেছে রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপের জন্য। সে ছাত্রলীগ, প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে বিভিন্ন ধরনের স্ট্যাটাস দিয়েছে। আমরা যত দূর জানতে পেরেছি, এই কারণে তার স্টল বরাদ্দ দেয়নি। এটা আসলে বাংলা একাডেমি ভালো বলতে পারবে।’

তাম্রলিপি। ছবি: সংগৃহীত

তাম্রলিপির প্রকাশকের সাথে আদর্শের বিরোধ যদিও পুরনো। এক সময় গণিত অলিম্পিয়াড সংশ্লিষ্ট লেখকদের বই একচেটিয়াভাবে তাম্রলিপি বিক্রি করত। ২০১৭ সালে আদর্শ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান লেখক মুনির হাসানের সহযোগিতায় গণিত অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণ শুরু করে। আদর্শ থেকে প্রকাশিত হতে থাকে মুনির হাসান, রাগিব হাসান, চমক হাসান, ঝংকার মাহবুবের বিভিন্ন বই। প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হয় তাম্রলিপি।

এছাড়া গত বছর আয়মান সাদিকের একটি বই তাম্রলিপির মালিক রনির আরেকটি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত হয়। তবে এ বছর আয়মান আদর্শকে ‘ভাল্লাগে না’ নামে একটি পাণ্ডুলিপি দিলে, আদর্শকে আটকানোর জন্য সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির মেলা পরিচালক রনি কলকাতা বইমেলায় আদর্শের স্টল বাতিল করেন। যদিও সমিতির অন্যান্য প্রকাশকদের ভূমিকায় এ সমস্যা উতরে যায় আদর্শ।

যদিও বাংলা একাডেমি একুশে বইমেলায় গত কয়েক বছর ধরেই এরকম কিছু না কিছু অনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েই চলেছে। বইমেলায় রোদেলা প্রকাশনীর স্টল বন্ধ করে দেওয়া, শ্রাবণ প্রকাশনীর জন্য স্টল বরাদ্দ না দেওয়া— নিয়মিতভাবে এগুলো চলেই আসছে। এটাকে কালচারে পরিণত করছে বাংলা একাডেমি। মুক্ত বুদ্ধিবৃত্তির চর্চাকে বাঁধাগ্রস্ত করার পায়তারা।  

এদিকে ‘আদর্শ’কে স্টল বরাদ্দ না দেওয়া নিয়ে শোনা যাচ্ছে অন্য এক কারণ। প্রকাশক মাহবুবের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের সময়ে আন্দোলনের পক্ষে, ছাত্রলীগকে সমালোচনা করে পোস্ট দেয়ার বিষয়টি। যদিও এর কোন নির্ভরযোগ্য সূত্র নেই।

রাগিব হাসান এ প্রসঙ্গে ফেসবুক স্ট্যাটাসে লেখেন, আসন্ন বইমেলার জন্য একাধিক বই নিয়ে কাজ করছিলাম। ইচ্ছে ছিলো আদর্শ প্রকাশনী বরাবরের মতোই বইগুলো প্রকাশ করবে। কিন্তু আজ একটা খবর পেয়ে চমকে গেলাম! আমার প্রকাশক আদর্শ-কে এবারের বইমেলায় বাংলা একাডেমী স্টল দিতে অস্বীকার করছে! আদর্শর সাফল্যে হিংসিত আরেক প্রকাশকের চক্রান্তে বাংলা একাডেমীর খড়গ নেমে এসেছে আদর্শর উপরে।

ব্যাপারটা অত্যন্ত শকিং, আর এটা কেবল আমার জন্য নয়, আমার, চমক হাসান, ঝংকার মাহবুব, মুনির হাসান, রাকিবুল হাসান ভাই সহ আদর্শর বাঘা বাঘা সব লেখক ও তাঁদের পাঠকদের জন্য এক বড় অবিচার।

রাগিব হাসান। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের প্রকাশনা জগতে আদর্শ বেশ কয়েক বছর ধরে বিশাল সাফল্য পেয়েছে, আদর্শর কর্ণধার এর দুরদর্শী চিন্তাধারার কারণে। গত কয়েকটি বইমেলায় বেস্ট সেলার হিসাবে আসা অনেকগুলো বইই আদর্শ থেকে প্রকাশিত।  

প্রকাশকদের বিজ্ঞানবিমুখতা আর বর্তমানের পাঠকদের সাথে দূরত্বটা দেখে আমি দমে গিয়েছিলাম, এমন সময় আদর্শর মাহাবুব ভাই এগিয়ে এলেন। খুব উৎসাহের সাথে আমার গবেষণায় হাতে খড়ি আর মন প্রকৌশল বইগুলো প্রকাশ করে দিলেন খুব দ্রুততার সাথেই। ২০১৫ এর বইমেলায় এলো এগুলো, আর পুরানো সব প্রকাশকের ধারণাকে পাল্টে দিয়ে কয়েক হাজার কপি বিক্রি হলো গবেষণা আর বিজ্ঞানের বই। কেবল আমি নই, একই সাথে বেরুলো চমকের গণিতের বই — সেটাতো রেকর্ড ভেঙে ফেলার মতো জনপ্রিয় হলো। আমার ধারণা হুমায়ুন আহমেদ আর জাফর ইকবাল স্যার বাদে সেই বছর আর কারো বই এতোটা জনপ্রিয়তা পায়নি পাঠকদের কাছে। আদর্শ প্রকাশনী আস্তে আস্তে এরকম আরো অনেক নতুন প্রতিভাবান লেখকের বই বের করেছে পরের বছরগুলোতে।

যতটুকু জানতে পারলাম, আরেকটি প্রকাশনীর মালিক পিছন থেকে কলকাঠি নাড়ছেন, আদর্শকে নানা রকমের ট্যাগ লাগিয়ে বাংলা একাডেমীকে দিয়ে ব্যান করিয়েছেন বইমেলা থেকে। এটা অনেক বড় রকমের একটা অন্যায়। আমার যাঁরা পাঠক আছেন, আমার বইগুলো কিংবা চমক, ঝংকার, মুনির ভাই সহ অন্যান্য লেখকের বই পড়ে যাঁরা উপকৃত হয়েছেন, তাঁরা এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করুন। আদর্শ প্রকাশনী বাংলাদেশের মুক্তচিন্তা বিজ্ঞানচিন্তা কেবল নয়, ধর্ম ইতিহাস সহ সব বিষয়েই অগ্রগণ্য একটি প্রকাশনা সংস্থা। কেবল ব্যক্তিগত শত্রুতার বশে পাঠকদের কাছ থেকে তাদের দূরে সরিয়ে দেয়ার এই ষড়যন্ত্রটা রুখে দিন। [অংশবিশেষ]

এ প্রসঙ্গে চমক হাসান লেখেন, সাত বছর পর এবার একুশে বইমেলায় শুরুর কয়েকটা দিন সশরীরে থাকতে পারব, এটা নিয়ে মনের ভেতর তুমুল আনন্দ- উত্তেজনা ছিল। একটা খবরে সেটা অনেকখানি মিইয়ে গেল।

আমার প্রকাশক ‘আদর্শ প্রকাশনী’কে মেলাতে স্টল বরাদ্দ দেয়া হয়নি। এখনও চূড়ান্ত হয়নি ব্যাপারটা, কিন্তু বাংলা একাডেমির প্রাথমিক তালিকায় আদর্শ প্রকাশনীর নাম নেই। স্টলে বসে পাঠকের সঙ্গে সরাসরি কথোপকথনের যে সুন্দর কল্পনা আমার ছিল, সেটা এখন অধরা স্বপ্ন হবার পথে!

চমক হাসান। ছবি: সংগৃহীত

প্রায় এক দশক ধরে যে প্রতিষ্ঠান নিয়মিত স্টল পাচ্ছে হঠাৎ কেন তাকে দেয়া হলো না? ঝংকার মাহবুব ভাইয়ের নতুন বই আসার কথা, রাগীব হাসান ভাই লিখছেন, বন্ধু ফরহাদ হোসেন মাসুমের চারটে বই আসার কথা, মুনির হাসান ভাইয়েরও বই এখান থেকে প্রকাশিত হয়েছে। এবার আয়মান সাদিকেরও একটা বই বের হবার কথা। হয়তো এটাই অন্যদের গাত্রদাহের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমি জেনেছি, কীভাবে আরেকটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান পেছনে কলকাঠি নেড়েছে। জেনেছি এককালের প্রগতিশীল ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতি করা একটা মানুষকে কী করে জামাতের ট্যাগ লাগিয়ে দেয়া হলো। আর এই ট্যাগের চেয়ে ভয়াবহ তো কিছু নাই। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময়ের প্রকাশক মাহাবুবুর রহমানের একটা ব্যক্তিগত পোস্টের স্ক্রিনশট দেখিয়ে বাংলা একাডেমিকে বোঝানো হয়েছে তিনি নাকি সরকারবিরোধী কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত! কী ভয়ঙ্কর! এমনিতেই বাংলাদেশে প্রকাশনা ব্যবসা খুব সহজ ব্যবসা নয়। ওনাদের সারা বছরের আয়ের বড় উৎস থাকে বইমেলা। একটা প্রকাশনী মেলাতে অংশ না নিতে পারা মানে ওখানে যে কয়জন গরীব মানুষ কাজ করেন, তাদের জীবনের উপর খড়গ নেমে আসা।

আমি শুধু এতটুকু বলতে পারি, আমি আদর্শের সঙ্গে বা আরও ভালো করে বললে মাহাবুব ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করে খুবই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছি। আমার যতটুকু প্রাপ্য সম্মানী, সেটা বুঝিয়ে দিতে মাহাবুব ভাই কখনও কোনো কার্পণ্য করেননি।

ওনাকে মেলার মধ্যিখানেও জ্বালাতন করেছি, উনি হাসিমুখেই সয়েছেন সেসব। অঙ্কভাইয়া প্রকাশের সময় উনি রাত নিজে রাত জেগে ইকুয়েশন ঠিক করেছেন। এক একটা করে অধ্যায় ঠিক করে পাঠিয়েছেন, আমি দেখে দিয়েছি। পুরো কাজটা এত বেশি আন্তরিকতার সাথে করেছেন, বলার মতো না। বলেছিলাম দেশে আসলে আপনাকে স্টারে খাওয়াবো! সেটা এখনও করবো, আশা রাখছি হাসিমুখেই সেটা করতে পারবো!

মেলার এখনও ১০ দিন বাকি, হয়তো এখনও সিদ্ধান্ত বদলানোর সময় আছে। বাংলা একাডেমির প্রতি বিনীত অনুরোধ রইবে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করার জন্য।