বিএনপির সামনে ৫ প্রশ্ন: পরিকল্পনায় ঘুরে দাঁড়ানো

দীর্ঘ ১২ বছর ক্ষমতার বাইরে বিএনপি। ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমানের হাত ধরে বিএনপি গঠিত হওয়ার পর সব চেয়ে বেশি সময় ক্ষমতার বাইরে দলটি। সদ্য শেষ হওয়া একাদশ সংসদ নির্বাচনে দলটি পেয়েছে মাত্র ৬টি আসন। দলের দুই প্রধান খালেদা জিয়া কারাগারে এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশের বাইরে অবস্থান করছে। দলটির হাজার হাজার নেতাকর্মী বিভিন্ন মামলার আসামি হয়ে ফেরারি জীবন অতিবাহিত করছে।

[su_heading size=”20″]

  • দল পূর্ণগঠন
  • মামলায় জর্জরিত নেতাকর্মী
  • খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং বিএনপির নেতৃত্বে বিকল্প জিয়া পরিবার
  • উপজেলা নির্বাচনে অংশ না নেওয়া
  • জোটের ভবিষ্যৎ
  • বিষয়ভিত্তিক কমিটির প্রস্তাব[/su_heading]

দল পূর্ণগঠন 

রাজনীতির মারপ্যাঁচে বারবার ধরাশায়ী দলটি সাংগঠনিকভাবেও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। তাই দলকে চাঙ্গা করতে পুরনোদের সরে গিয়ে কাউন্সিলের মাধ্যমে বিএনপিকে পুনর্গঠনেরও তাগিদ উঠেছে। মঙ্গলবার (১৫ জানুয়ারি) অনুষ্ঠিত বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিপর্যয় কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য দল পুনর্গঠনের পক্ষ মত দিয়েছেন বিএনপির শীর্ষ নেতারা। দীর্ঘ দুই ঘণ্টার এই বৈঠকে ভিডিও কনফারেন্সে তারেক রহমানও উপস্থিত ছিলেন।প্রবীণ ও ব্যর্থ হিসেবে যারা পরিচিত হয়েছেন, প্রয়োজনে তারা সরে যাবেন। পাশাপাশি তারা কাউন্সিলের মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত তরুণ ও যোগ্যদের সামনে নিয়ে আসার পক্ষেও মত দিয়েছেন।সর্বশেষ ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ জাতীয় কাউন্সিল করেছিল বিএনপি।

শুক্রবার (১৮ জানুয়ারি) বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৮৩তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সন্ধ্যায় সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন মিলনায়তনে আয়োজিত আলোচনা সভায় বিএনপির শীর্ষ নেতারা জিয়াউর রহমানের অবদানের কথা স্মরণ করার পাশাপাশি কথা বলেন দলের ক্ষতিগ্রস্থ কর্মীদের পুনর্বাসন এবং দল গঠন নিয়ে।

মির্জা ফখরুল বলেন, ;গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে হবে। অন্ধকার থেকে আলোতে উঠে আসতে হবে। এজন্য যুবকদের এগিয়ে আসতে হবে। দেশটা আপনাদের, আপনাদেরই রক্ষা করতে হব। জিয়াউর রহমান আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া শিখিয়েছেন। পরাজিত হওয়া যাবে না। পরাজিত বোধ করলেই পরাজিত।’

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আমাদের প্রধান কাজটি হলো দল পুর্নগঠন করা। ঘুরে দাঁড়াতে হলে একটি কাউন্সিলের মাধ্যমে দলকে পুনর্গঠন করতে হবে। তুলনামূলকভাবে ত্যাগী-পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের নেতৃত্বে আনতে হবে। আমরা যারা ব্যর্থ বলে পরিচিতি হয়েছি, তাদের পদ ছাড়তে হবে তরুণদের জন্য। তাহলেই বিএনপি ঘুরে দাঁড়াবে।’

দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, ‘যারা দলের জন্য নিবেদিত প্রাণ হিসেবে কাজ করেছেন, তাদের সামনের দিকে এনে দল পুনর্গঠন করতে হবে। দরকার হলে আমরা প্রবীণরা সরে যাব। তারপরও দলটাকে টিকিয়ে রাখতে হবে। এই কাজ আগামী কয়েক মাসের মধ্যে করতে হবে। তাহলে আমরা আবার ঘুরে দাাঁড়তে পারব।’

মামলায় জর্জরিত নেতাকর্মী  

২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপিকে ছাড়া একতরফা ও একপেশে নির্বাচনের পর আন্দোলন সংগ্রাম করে খুব সহজেই আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্ষমতা থেকে নামানো সম্ভব হবে ভাবলেও জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলন সংগ্রামও করেও আওয়ামী লীগেকে ক্ষমতা থেকে নামাতে ব্যর্থ হয় বিএনপি। সরকার ৫ বছর পূর্ণ করে ৩০ ডিসেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচন দিলেও সে নির্বাচনে মাত্র ৬ টি আসন পায় বিএনপি। নির্বাচন পূর্ববর্তী সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিএনপির নেতাকর্মীরা। দল পূর্ণগঠনের সাথে সাথে দলের ক্ষতিগ্রস্ত নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়ানোর চিন্তা করছেন বিএনপির হাইকমান্ড। হতাশ নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে যাচ্ছে বিএনপি। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সিনিয়রদের কাছে এ লক্ষ্যে গাইডলাইনও চেয়েছেন।মামলায় জর্জরিত নেতাদের সহযোগিতা করার জন্যে দলীয় পক্ষ থেকে আদেশ দিয়েছে বিএনপি সমর্থিত আইনজীবীদের।

ড. মোশাররফ বলেন, ‘এখন আমাদের দরকার পুনর্বাসন। আমাদের নেতাকর্মীরা যেভাবে মামলা-মোকদ্দমার শিকার, যেভাবে বাড়িছাড়া—এগুলোর ব্যাপারে আমার প্রস্তাব মামলা-মোকদ্দমা থেকে তাদের পরিত্রাণ করানো, যারা জেলে আছে, তাদের মুক্ত করা, যারা আহত আছে, তাদের চিকিৎসা করানো।’

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমাদের যে সব ভাই পঙ্গু হয়েছেন, কারারুদ্ধ হয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। আমাদের যে সব মা-বোনেরা নির্যাতিত হয়েছেন, তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে।’

খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং বিএনপির নেতৃত্বে বিকল্প জিয়া পরিবার 

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। পুরোনো ছবি।

২০১৮ সালের দুর্নীতি মামলার রায়ে জেলে যান বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার এক বছর পূর্ণ হতে আর মাত্র ২০ দিন বাকি। খালেদার অবর্তমানে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় তারেক রহমানকে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ভরাডুবি হয় বিএনপির। ৬ টি আসনে পেলেও সংসদে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। দলীয় হাইকমান্ড থেকে আলোচনা শুরু হয়েছে বিএনপির নেতৃত্বে জিয়া পরিবার থেকে কাউকে নিয়ে আসার জন্য। যিনি দেশে থেকে সরাসরি দলের নেতৃত্ব দিতে পারবে। সর্বশেষ স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এক নম্বর ভাইস চেয়ারম্যান পদে জিয়া পরিবারের কোনো সদস্যকে আনার পরিকল্পনাও উঠে আসে। মহাসচিব ফখরুল থাকবেন নাকি অন্য কেউ আসবেন সেই সিদ্ধান্ত খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের ওপর ছেড়ে দেওয়া হবে।

দলটির নেতারা মনে করেন, তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সারাদেশের নেতাকর্মীদের দৃষ্টি দলীয় নেত্রীর মুক্তির দিকে। সেদিকে লক্ষ রেখে আইনি লড়াইসহ মুক্তি আন্দোলন বেগবান করা হবে।

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আজকে সব চেয়ে বড় প্রশ্ন আমাদের নেত্রী—যার নামে এখনো সমগ্র বাংলাদেশ একত্রিত হয়, তাকে কারাগার থেকে বের করে আনতে হবে। সেই জন্য সামনের দিনগুলোতে সমগ্র বাংলাদেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে দুর্বার আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে দেশনেত্রীকে মুক্ত করতে হবে।’

মার্চ থেকে উপজেলা নির্বাচন

আসন্ন উপজেলা নির্বাচন বর্জনের পক্ষে বিএনপির তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় নেতাদের বড় একটি অংশ। কাজেই নির্বাচনে অংশ নেয়া না নেয়া নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছে দলটি।

গত রোববার ও সোমবার এবং গতকাল মঙ্গলবার বিএনপির সিনিয়র নেতারা পৃথকভাবে একাধিক বৈঠক করেছেন। প্রত্যেক বৈঠকেই স্কাইপের মাধ্যমে ভিডিও কলে সরাসরি যুক্ত থেকে কথা বলেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি এই মুহূর্তে দলের করণীয় নিয়ে কথা বলার পাশাপাশি নিজেদের মধ্যে ঐক্য ধরে রাখার আহ্বান জানান। তবে আসন্ন উপজেলা নির্বাচনসহ অন্যান্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি বিএনপি। এ বিষয়ে আরো পরে সিদ্ধান্ত জানাবে দলটি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান যুগান্তরকে বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হলেও আতঙ্ক এখনও কাটেনি। সারা দেশ থেকে সংসদ নির্বাচনের অনিয়ম ও জালিয়াতির তথ্য সংগ্রহ করে তা পর্যালোচনা করছি। এ অবস্থায় আবার উপজেলা নির্বাচন। এ নিয়ে আমরা কোনো আলোচনা করিনি। সময় হলে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

জোটের ভবিষ্যৎ 

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অকল্পনীয় ব্যর্থতার টানাপোড়ন শুরু হয়েছে বিএনপি এবং ঐক্যফ্রন্টের মধ্যে। হতাশা ভর করেছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক দলগুলোর মধ্যেও। সেই সঙ্গে নানা হিসাব-নিকাশ চুকাতে গিয়ে টানাপোড়েন শুরু হয়ে গেছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ভেতরে-বাইরে।ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শরিক দল গণফোরামের সাথে বিএনপির সম্পর্ক মূলত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে থেকেই দূরত্ব সৃষ্টি হলেও ভোটের পর গত কয়েক দিনে সেই সম্পর্কের চরম অবনতি হয়েছে। তারই বহির্প্রকাশ ঘটেছে গতকাল বৃহস্পতিবার ঐক্যফ্রন্টের বৈঠকে। সেখানে বিএনপির কোনো প্রতিনিধি-ই উপস্থিত ছিলেন না। জামায়েত, গণফোরামের নির্বাচিত দুইজন সংসদ সদস্যের শপথ গ্রহণে এবং নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণে বিএনপি এবং গণফোরামের সাথে দ্বিমত দেখা দেয়।

গণফোরামের সভাপতি কামাল হোসেনের বিএনপি এবং জামায়েত নিয়ে সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্য জোট শিবিরে ফাটলের সৃষ্টি করে।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, ‘ড. কামাল হোসেনের জামায়াতের সঙ্গে রাজনীতি না করার প্রস্তাবকে আমরা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছি। একই সঙ্গে তার কাছে আমাদের দাবি, তিনি (ড. কামাল) যেন আওয়ামী লীগের কাছে আহ্বান জানান- যেসব জামায়াত নেতাকে আওয়ামী লীগ ফুল দিয়ে বরণ করে নিয়েছে, যাদের ইউনিয়ন, উপজেলা পর্যায়ে চেয়ারম্যান, মন্ত্রী-এমপি বানিয়েছে, তাদের যেন বাদ দেয়া হয়। তাতে জনগণ খুশি হবে।’

বিএনপির মধ্যম সারির অনেক নেতা মনে করছেন, জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ থাকায় বিএনপি নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের জোট থেকে বের করে দেয়া উচিত।

জামায়াত নেতারা বলছেন, জোট হয়েছে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে তাদের। সুতরাং বিএনপি চেয়ারপারসনই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে পারবেন, আর কেউ নয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।