নির্বাচন পরবর্তী সময়ে দেশ জুড়ে ধর্ষণের ভয়াবহতা

চলতি বছরের প্রথম ১৮ দিনে প্রথম আলোয় ২৩টি ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার খবর প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৫ জনই শিশু-কিশোরী। এর মধ্যে দুই বছরের শিশুও আছে। চারজনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। আরেকজন ধর্ষণের পর অসুস্থ হয়ে মারা গেছে।

ঘটনা: ভোট কেন্দ্রে বাকবির্তকের জের ধরে গত ৩০ ডিসেম্বর রাত ১২টার দিকে ব্যাগা গ্রামের সিরাজ উদ্দিনের ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে ভাঙচুর চালায় স্থানীয় কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী। তারা সিরাজসহ চার সন্তানকে বেঁধে রেখে তার স্ত্রীকে দলবেঁধে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টা করে। পরে এই ঘটনায় সিরাজ উদ্দিন বাদী হয়ে নয় জনকে আসামি করে একটি মামলা করেন। ঘটনার মূল হোতা রুহুল আমিনকে গ্রেফতার করা হয় এবং পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়।

সুবর্ণচরে ধর্ষণ: আ. লীগ নেতা রুহুল আমিন। ছবি: সংগৃহীত

ঘটনা: লিপস্টিক দিয়ে সাজিয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে দুই শিশুকে বাসায় ডেকে নিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা চালায় গোলাম মোস্তফা (৩০) ও আজিজুল বাওয়ানী (২৮)। ওই সময় শিশু দুটি চিৎকার করলে ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে দু’জনকেই গলা টিপে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করে তারা।

ঘটনার পরে ঘাতকরা পালিয়ে গেলে তাদের তাৎক্ষণিক তাদের ধরা সম্ভব হয়নি। পরে মঙ্গলবার রাতে যাত্রাবাড়ীর ভাঙ্গা প্রেস এলাকা থেকে মোস্তফাকে এবং তার দেয়া তথ্যে ডেমরার কাউন্সিল ব্রিজ এলাকা থেকে আজিজুলকে গ্রেফতার করা হয়।

সূত্র মতে, শিশু দুটি নিখোঁজের পরে অনেক খোঁজখুঁজি করেও না পেয়ে এলাকায় মাইকিং করা হয়। পরে সন্ধ্যার দিকে মোস্তফার স্ত্রী গার্মেন্ট থেকে বাসায় ফিরলে স্বামীর আচরণ ও কথাবার্তায় অসংলগ্নতা পায়। তখন তিনি মেঝেতে শিশু দুটির স্যান্ডেল পড়ে থাকতে দেখেন। এ বিষয়ে মোস্তাফাকে জিজ্ঞাসা করলে তাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে উত্তেজনা শুরু হয়। বিষয়টি টের পেয়ে প্রতিবেশীরা পুলিশে খবর দিলে মোস্তফা পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে রাতে মোস্তফার বাসায় খাটের নিচ থেকে শিশু দুটির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

ডেমরার কোনাপাড়ার শাহজালাল রোডের ‘নাসিমা ভিলা’ থেকে নুসরাত জাহান (৪) ও ফারিয়া আক্তার দোলা (৫) নামে দুই শিশুর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ছবি: সংগৃহীত

ঘটনা: গত সোমবার পিরোজপুরের ভান্ডারিয়ায় নদমূলা ইউনিয়নে এক মাদ্রাসাছাত্রীকে (১৩) ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। বৃহস্পতিবার রাতে তার বাবা একই উপজেলার একটি গ্রামের এক যুবক (১৮) ও আরেক গ্রামের বাসিন্দা সজল জমাদ্দারকে (৩০) আসামি করে থানায় মামলা করেন।

সূত্র মতে, গত সোমবার বেলা ১১টার দিকে মেয়েটি বাড়ি থেকে হেঁটে নানার বাড়িতে যাচ্ছিল। পথে একটি গ্রামের সড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় পূর্বপরিচিত যুবকসহ ওই দুজন তার মুখ চেপে ধরে জোর করে সড়কের পাশে একটি পানের বরজে নিয়ে যান। এরপর দুজন মিলে তাকে ধর্ষণ করে।

ঘটনা: গত বৃহস্পতিবার জামালপুরের মেলান্দহে এক স্কুলছাত্রীকে (১৩) ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ করেছে তাদের পরিবার। ধর্ষণচেষ্টায় জড়িত সন্দেহে পুলিশ একজনকে গ্রেপ্তার করেছে।

সূত্র মতে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় স্কুলছাত্রী বাড়ি থেকে খানিকটা দূরে একটি কোচিং সেন্টারে পড়তে যায়। পড়া শেষে বাড়ি ফেরার সময় রাস্তায় তার পিছু নেন নয়ন খাঁ ও তাঁর সহযোগী রাসেল খাঁ। একটি নির্জন স্থানে যাওয়ার পর তাঁরা ছাত্রীকে টেনেহিঁচড়ে একটি খেতে নিয়ে যান। এ সময় নয়ন খাঁ ধর্ষণের চেষ্টা করেন। স্কুলছাত্রী দুজনকেই ধাক্কা দিয়ে দৌড়ে বাড়িতে ফেরে।

ঘটনা: নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলায় গণধর্ষণের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার কবিরহাট উপজেলার ধানসিঁড়ি ইউনিয়নের নবগ্রামে শুক্রবার রাতে গৃহবধূর ঘরে ঢুকে একই এলাকার জাকের হোসেনসহ তিন ব্যক্তি অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে গৃহবধূ ও তার তিন সন্তানকে জিম্মি করে ধর্ষণ করে। গৃহবধূর অভিযোগ পাওয়ার পরই অভিযান চালিয়ে জাকের হোসেনকে (২৮) আটক করেছে পুলিশ।

শিশু ধর্ষণ। ছবি: সংগৃহীত

সূত্র মতে, উপজেলা ধানশালিক ইউনিয়নের নবগ্রামের এক বিএনপির কর্মীকে ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনের আগে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। গৃহবধূর স্বামী বাড়িতে না থাকায় যুবলীগ নেতা জহির উদ্দিন ওরফে জাকের হোসেনের নেতৃত্বে ৪-৫ জন গৃহবধূর ঘরে ঢুকে। তাদের বাধা দিতে গেলে গৃহবধূকে এলোপাতাড়ি মারধর করে। এ সময় তারা অস্ত্রের মুখে গৃহবধূকে জিম্মি করে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। পরে গৃহবধূর চিৎকারে এলাকার লোকজন ছুটে এলে অভিযুক্তরা পালিয়ে যায়।

ঘটনা: শুক্রবার মধ্যরাতে ফরিদপুর শহরের পশ্চিম আলীপুর এলাকায় ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়েছে।

সূত্র মতে, নির্যাতিত কিশোরী মা-বাবার সঙ্গে পশ্চিম আলীপুর মহল্লার একটি বাড়িতে ভাড়া থাকে। রাতে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গেলে পাশের বাড়ির ওবায়দুল্লাহ (২০) নামের এক তরুণ ওই কিশোরীকে মুখ বেঁধে দোতলা বাড়ির ছাদে নিয়ে ধর্ষণ করে

ধর্ষণের শিকার কিশোরীর মা বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। বিভিন্ন বাসাবাড়িতে কাজ করে দিন চালাই। মেয়েও আমাদের সঙ্গে থাকে। আমার মেয়েকে ওবায়দুল্লাহ প্রায়ই উত্ত্যক্ত করতো। শনিবার সকালে মেয়ে ধর্ষণের বিষয়টি জানায়। তখন আমি মেয়েকে নিয়ে থানায় যাই।

ঘটনা: মঙ্গলবার বিকেলে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার সীমান্ত এলাকায় চার বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ করা হয়েছে। গুরুতর অবস্থায় শিশুটিকে উদ্ধার করে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত হারিস মিয়াকে আটক করেছে পুলিশ। আটক হারিস মিয়া তাহিরপুর উপজেলার শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী চারাগাঁও গ্রামের কুবেদ আলীর ছেলে।

সূত্র মতে, মঙ্গলবার বিকেলে এক আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়ার পথে শিশুটিকে তুলে নিজের বাড়িতে নিয়ে ধর্ষণ করে হারিস মিয়া। এ সময় শিশুর চিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে আসে। পরে শিশুটিকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে তাহিরপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থা গুরুতর হওয়ায় সেখান থেকে শিশুটিকে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

ঘটনা: সাতক্ষীরায় এক প্রতিবন্ধী শিশুকে (৯) ধর্ষণ শেষে খাটের নিচে লুকিয়ে রাখল সাজেদুল ইসলাম (১৮) নামের এক ব্যক্তি। মঙ্গলবার ভোরে শহরের তালতলা এলাকা থেকে সাজেদুল ইসলামকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গ্রেফতার সাজেদুল ইসলাম শহরের তালতলা গ্রামের ইন্তাজ আলীর ছেলে।

নির্যাতিত শিশুর বাবা আব্দুল লতিফ বলেন, ‘আমি ইটভাটায় কাজ করি। সোমবার বিকেলে মেয়েকে বাড়িতে রেখে কাজে যাই। বাড়িতে কেউ না থাকার সুযোগে সাজেদুল ইসলাম আমার মেয়েকে তুলে তাদের বাড়িতে নিয়ে যায়। এরপর ধর্ষণ করে খাটের নিচে মেয়েকে লুকিয়ে রাখে। পরে মেয়ের চিৎকারে এলাকার লোকজন সাজেদুলের বাড়ির খাটের নিচ থেকে গুরুতর অবস্থায় মেয়েকে উদ্ধার করে। আমি এ ঘটনার বিচার চাই।’

১৮ দিনে প্রথম আলোয় ২৩টি ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার খবর প্রকাশিত হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

ঘটনা: কুমিল্লায় নারী নির্যাতনের মামলার রায় পক্ষে পাইয়ে দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিচারপ্রার্থী চার সন্তানের জননী এক গৃহবধূকে গণধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় বুধবার দুপুরে মামলা দায়েরের পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে আইনজীবীর সহকারী আনিছুর রহমান ও এক আইনজীবীর বাড়ির দারোয়ান লিটন বিশ্বাসকে গ্রেফতার করেছে। জেলার সদর দক্ষিণ মডেল থানার অধীন লালমাই উপজেলার শানিচোঁ গ্রামে এক আইনজীবীর বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে।

ঘটনা: ৬ তারিখে (রোববার) সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার গাবতলা গ্রামে তৃতীয় শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ঘটেছে। হত্যার পর প্রথমে মরদেহটি পুকুরে ও পরে বাথরুমে রাখা হয়।

এ ঘটনায় জয়দেব সরকার নামে এক কিশোরকে আটক করেছে পুলিশ। জয়দেব গাবতলা গ্রামের নির্মল সরকারের ছেলে ও বুধহাটা বিবিএম কলেজিয়েট স্কুলের একাদশ শ্রেণির ছাত্র।

সূত্র মতে, জয়দেবের বোন ওই ছাত্রীকে প্রাইভেট পড়াতো। রোববার মেয়েটি প্রাইভেট পড়তে গেলে বাড়িতে কেউ না থাকার সুযোগে তার উপর নির্যাতন চালায় জয়দেব। এক পর্যায়ে মেয়েটি জ্ঞান হারিয়ে ফেললে মারা গেছে ভেবে পুকুরে ফেলে দেয়। পরে মেয়েটির পরিবার ও গ্রামবাসী খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে পুকুরে জাল ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়। এ সময় কৌশলে জয়দেব পুকুর থেকে মরদেহ তুলে নিজের বাথরুমে রাখে।

ঘটনা: মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে চতুর্থ শ্রেণির এক শিশু শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় রুশন মিয়া (৩২) নামে একজনকে সুনামগঞ্জের দোয়ারা বাজার থেকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনের দিন মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের কামারছড়া রাবার বাগানে এ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে।

সূত্র মতে, রুশন মিয়া ভোটের দিন রোববার (৩০ ডিসেম্বর) সকালের দিকে ছনগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেণির ওই ছাত্রীকে (১১) ডেকে নিয়ে যায়। তারপর পাশের কামারছড়া রাবার বাগানের ভেতরে ধর্ষণ করে। ঘটনার পর গ্রামবাসী শিশুটিকে উদ্ধার করতে পারলেও অভিযুক্ত রুশন মিয়া পালিয়ে যেতে সমর্থ হয়।

ঘটনা: মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলায় কাশিনগর এলাকায় এক সন্তানের জননীকে (২২) গণধর্ষণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। গণধর্ষণের ঘটনায় জড়িত তিনজন। এর মধ্যে ফজলু এবং মাসুক নামে দুইজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

নির্যাতিত নারীর বাবা বাদী হয়ে এ ঘটনায় জড়িত ফজলু, মাসুক ও রিপনকে আসামি করে জুড়ী থানায় ধর্ষণ মামলা করেন।

ওই নারীর বাবা জানান, তিনি মেয়েকে ফুলতলায় বিয়ে দেন। তার মেয়ের ঘরে এক কন্যা সন্তান রয়েছে। মানসিক ভারসাম্যহীন হওয়ায় মেয়ের স্বামী তাকে তালাক দেয়। কিন্তু মেয়ে ও নাতনি তার বাড়িতে থাকে। মাঝে মধ্যে তার মেয়ে একা ঘুরে বেড়াত। বুধবার রাতে প্রতিবেশী সিএনজি অটোরিকশাচালক মাসুক তার মেয়েকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে যায়। পরে তার সহযোগী রিপন ও ফজলু মিলে রাতভর ধর্ষণ করে।

আমাদের দেশে আজও ধর্ষণে নারীর দোষ খোঁজা হয়। এর ফলে ধর্ষণের শিকার নারী শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার শিকার হয়ে যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। ডাক্তারি বা মনস্তাত্ত্বিক সাহায্য ছাড়াও প্রয়োজন পরিবার ও সমাজের বন্ধুবৎসল আচরণ।

নারী নির্যাতন ও ধর্ষণ রোধে সবাইকে যার যার অবস্থান থেকে চেষ্টা করে যেতে হবে এ অবস্থা পরিবর্তনে। যাতে আমার আপনার পরিবারের বা আশেপাশের কেউ এ অবস্থার শিকার না হয়।