সৌদি ফেরত নারী শ্রমিকদের ভয়াবহ প্রবাস জীবনের কথা

জীবনমানের উন্নয়ন করতে সৌদি আরব গিয়েছিলেন এমন প্রায় ৮০ জন নারী ফিরছেন নিঃস্ব হাতে। গৃহকর্মীর কাজ করতে গিয়ে নির্যাতিত হয়ে ফিরছেন তারা। নির্যাতিত এসব নারী সৌদি আরবের রিয়াদ ইমিগ্রেশন ক্যাম্পে (সফর জেল) অবস্থান করছিলেন।

রবিবার (২০ জানুয়ারি)  রাত ৯ টা ২০ মিনিটে এয়ার এরাবিয়ার এ৯-৫১৫ নম্বর ফ্লাইটে করে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায় তারা।

তাদের অভিযোগ, দেশটির নিয়োগকর্তা তাদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালাতো। এসব নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে গৃহকর্তার বাড়ি থেকে পালিয়ে এসে ক্যাম্পে আশ্রয় নেন অসহায় এসব নারী।

নির্যাতিত হয়ে সৌদি থেকে দেশে ফিরছেন নারীরা। ছবি: ইন্টারনেট

বাংলাদেশ থেকে উন্নততর জীবনের আশায় এসব নারীরা সৌদি আরব যায়। সেখানে অসহনীয় পরিস্থিতির মুখোমুখি হয় তারা। তাদের উপর কিরা হয় নির্মম নির্যাতন। বারবার এই ঘটনার পুনরাবৃত্তিতেও সরকার নেয়নি কোন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। যার কারণে অনবরত তাদের ভোগান্তি বেড়ে চলেছে। পাশাপাশি সৌদি থেকে শারীরিক ও মানসিকভাবে অত্যাচারিত বিপর্যস্ত নারীরা সহায় সম্বলহীনভাবে দেশে ফিরছেন।

১৯৯১ সাল থেকে ২০১৮ সালের মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৭ লাখ নারী বিভিন্ন দেশে কাজের উদ্দেশে গেছেন বলে তথ্য পাওয়া যায় প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ অভিবাসন বিষয়ক বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা থেকে। ২০১৫ সালে সৌদি সরকারের সঙ্গে সে দেশে নারী গৃহকর্মী পাঠানোর বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এরপর থেকে গত বছরের এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ নারী সৌদি আরব গেছেন। বিএমইটির দেওয়া তথ্যমতে, গত বছর ১৮টি দেশে যাওয়া নারী শ্রমিকের সংখ্যা ছিল এক লাখের বেশি। এর মধ্যে শুধু সৌদি আরবে গেছেন ৮৩ হাজার ৩৫৪ জন

২০১৮ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রতিমাসে গড়ে ২শ নির্যাতিত নারী শ্রমিক দেশে ফিরছেন। এর মধ্যে অধিকাংশই যৌন হেনস্থার শিকার। গৃহকর্মীর কাজের কথা বলে অবিবাহিত মেয়েদের বিদেশে নিয়ে দেহব্যবসা করানোর মতো জঘন্য অপরাধের তথ্যও মিলেছে। এর ফলে কুমারীরা অন্তঃসত্ত্বা হয়ে দেশে ফিরছে। লোকলজ্জায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে নিঃস্ব ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো। এছাড়াও নানাভাবে শারীরিক, মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং হচ্ছেন প্রবাসী বাংলাদেশি নারী শ্রমিকরা। দেয়া হচ্ছে না তাদের পারিশ্রমিক।

সৌদি ফেরত নারীদের ভাষ্যে নির্যাতনের বিবৃতি:

সৌদি থেকে ফেরত আসা সালমা জানান, সেখানে (সৌদি আরব) নারীরা প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হন। আমার পাসপোর্ট রেখে দেয়া হয়েছে। সেখান থেকে আমি পালিয়ে বাংলাদেশের দূতাবাসে আসি। দূতাবাস আমাকে আউট পাস দিয়ে দেশে পাঠিয়েছে। আমাকে গালাগালি করতো, খেতে দিত না ঠিক মতো।

সৌদি ফেরত কুলসুম বলেন, বাড়ির কর্তা ও পরিবারের লোকজন নির্যাতন করত। অসুস্থ হলে চিকিৎসা করাতো না। অনেক মেয়েকে পরিবারের ছোট-বড় সবাই যৌন নির্যাতন করেছে। নির্যাতনে অসুস্থ হলে এজেন্সির ক্যাম্পে পাঠায় তারা। সেখান থেকে কেউ বাড়িতে ফিরতে চাইলে তাকে আবার নির্যাতন করা হয়। এক্ষেত্রে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে এসব বিষয় জানানো হলে তারাও তেমন গুরুত্ব দেয় না বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা।

আটকে রেখে ইলেকট্রিক শক দেয়ার পাশাপাশি রড গরম করে ছেঁকা পর্যন্ত দেয়া হতো তাদের। ছবি: ইন্টারনেট

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেকজন বলেন, বলে নিয়েছিল, প্রতি মাসে ২২ হাজার টাকা দিবে। বলেছিল পরিবার অনেক ভাল। কিন্তু গিয়ে যখন এরকম দেখলাম, তখন দালাল হুমায়ুনকে ফোন দিলে সে আমার নাম্বার ব্লক করে দিয়েছে।

অন্য একজন বলেন, একটা কোম্পানিতে বিক্রি করে আমাকে। তারা আমাদের এক জায়গায় ১৫ দিন আটকে রাখে।

২০১৮ সালের জুন মাসে নির্যাতনের শিকার মানসুরা হোসাইন সহ ২৯ জন নারী দেশে ফেরত আসেন। মানসুরা হোসাইন বলেন, ‘ছবি, ভিডিও কইরা কী করবেন? পারলে অন্য নারীদের সৌদি যাওয়া ঠেকান। সৌদিতে আটকা পড়ছে যে নারীরা তাদের দেশে আননের ব্যবস্থা করেন।’

২০১৮ সালের ১৯ মে নির্মম নির্যাতনের কারণে দেশে ফেরত আসা মল্লিকা জানান, সৌদি আরবে প্রতিনিয়ত তাকে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। তাকে আটকে রেখে ইলেকট্রিক শক দেয়ার পাশাপাশি রড গরম করে ছেঁকা পর্যন্ত দেয়া হতো

দিনাজপুরের মনজুরা বেগম বলেন, ‘আমার পাসপোর্টসহ ইজ্জত-সম্মন সব দিয়ে (ধর্ষিতা হয়ে) এসেছি। মালিকের নির্যাতন থেকে পালিয়ে বাংলাদেশের দূতাবাসে যাই। দূতাবাস থেকে ট্রাভেল পাস নিয়ে দেশে আসি।’

দু’বছরের চুক্তিতে সৌদিতে গেলেও মাত্র ১১ মাস পরে গত ১৯ মে খালি হাতে দেশে ফিরে আসা সুনামগঞ্জের তাসলিমা আক্তার বলেছেন, ‘অনেক আশা নিয়ে ওই দেশে গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখলাম তেমন কিছু না। দালাল বলেছিল, সেখানে গেলে ২০ হাজার টাকা বেতন দেবে। মোবাইল দেবে। দেশে পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে দেবে। কাপড়চোপড়-সাবান, তেল- সবকিছু ফ্রি। কিন্তু আসলে তেমন কিছু না। ঠিকমত বেতনও দেয় না। আমার আট মাসের বেতন বাকি। নিজের গাঁট থেকে টাকা দিয়ে সবকিছু কিনতে হয়।’

অন্য এক সাক্ষাৎকারে তাসলিমা বলেন, আমি নিয়োগকর্তা মহিলাকে বলেছিলাম, সাত-আট মাস বাড়িতে টাকা পাঠাইনি, বেতন দে। সে আমার ওপর হাত তুলতে চেয়েছিল। তখন আমি পুলিশকে ফোন করি। পুলিশ আমাকে বাংলাদেশ দূতাবাসে নিয়ে যায়। সেখানে গিয়ে দেখি হাজার হাজার মেয়ে। অনেককে মেরেছে, কারো হাত ভেঙেছে, কারো পা ভেঙেছে, কারো গায়ে গরম পানি দিয়েছে- অনেক রকম নির্যাতন করেছে। কোনো কোনো মেয়েকে নিয়োগদাতার ছেলেরা খারাপ (ধর্ষণ) নির্যাতন করেছে। কাউকে কাউকে এক দেড় বছর খাটিয়েছে, বেতন দেয়নি। সে তুলনায় আমার কমই হয়েছে- আমি এগারো মাস থেকেছি, পরনের কাপড়টাই ঠিকমত দেয়নি।

নির্যাতনের শিকার নাহার বলেন, ‘আমাকে প্রথমে বলেছে এক হাজার রিয়াল বেতন দেবে। কিন্তু কাজের চুক্তি করার সময় দেখি ৮০০ রিয়াল। তারপরও কাজ করলাম। কিন্তু মালিকের ব্যবহার ছিল খুবই খারাপ। কথায় কথায় গালি দিতো। আরবিতে বলতো, মিসকিন, তোরা মিসকিন। আমাদের কিনে নিয়েছে, অনেক টাকা দিয়ে এনেছে-এসব কথা বলতো।’

নির্যাতনের ভয়াবহতা:

কাজের কথা বলে মেয়েটিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সৌদি আরবে। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর থেকেই তার ওপর যৌন নির্যাতন চালানো হয়। মেয়েটি তাতে রাজি না হওয়ায় বেধড়ক মারধর করা হয়। একপর্যায়ে ছাদ থেকে ফেলে দেওয়া হলে মেয়েটির পা ভেঙে যায়। মেয়ের এমন দুরবস্থার কথা বলতে বলতে কেঁদে ওঠেন মালার (ছদ্মনাম) মা। মালাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও মেয়ে সুস্থ হলে আবারো এমন নির্যাতনের শিকার হতে হবে বলে আতঙ্কিত তার মা। মেয়েকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য তিনি বিভিন্ন জায়গায় ছোটাছুটি করছেন।

ছবি: ইন্টারনেট

সৌদিতে বাংলাদেশি গৃহকর্মীর ঝুলন্ত লাশ সৌদি আরবের তুরবাহ থেকে ২০ কিলোমিটার দক্ষিণে মরুভূমির মাঝখানে গাছের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। আল বাহা তায়েফের মাঝামাঝি তুরবাহ শহর। গত বছর মে মাসের ৮ তারিখে পাওয়া ওই লাশের সঙ্গে ইকামাতে নাম পাওয়া গেছে কোহিনূর বেগম। ইকামা চেক করে পুলিশ গৃহকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে। গৃহকর্তার দাবি, ঘটনার দু’দিন আগে কোহিনূর তার বাসা থেকে পালিয়ে যায়। তারপর কোহিনূরের সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, যৌন নির্যাতনসহ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে কোহিনূর ওই বাসা থেকে পালিয়ে আত্মহত্যা করেছে। কোহিনূরের লাশ পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছিল।

শারমিন এক এজেন্সির মাধ্যমে গৃহকর্মী হিসেবে সৌদি আরব গিয়েছিলেন। সেখানে যাওয়ার পর তাকে কয়েকবার বিভিন্ন জনের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। প্রতিটি জায়গায় সে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়। শুধু যৌন নির্যাতনই নয়, লোহার রড গরম করে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। গায়ে বিভিন্ন জায়গায় জ্বলন্ত সিগারেটের ছ্যাঁকা দেওয়া হয়েছে। দুই হাত শিকলে বেঁধে ঝুলিয়ে রেখেও চলেছে নির্যাতন। সারা শরীরে অসংখ্য নির্যাতনের চিহ্ন নিয়ে মুমূর্ষু অবস্থায় সে দেশে ফেরে।

Comments are closed.