‘আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি’

সুরের জগৎ থেকে নিজেকে ছুটি দিলেন বরেণ্য সুরকার, গীতিকার, সংগীত পরিচালক, মুক্তিযোদ্ধা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল।

‘সব কটা জানালা খুলে দাও না’ গানের মূর্ছনায় মোহিত করা ইমতিয়াজ বুলবুল মঙ্গলবার সকালে মহাখালীর আয়েশা মেমোরিয়াল হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন।

২২ জানুয়ারি সকাল ৭টার দিকে শিল্পীর ব্যক্তিগত সহকারী রোজেন বলেন, ‘স্যার ভোর সোয়া ৪টার দিকে মারা গেছেন। এর আগে তিনি আমাকে ফোন দিয়ে জানান, ‘‘তাড়াতাড়ি বাসায় আসো, আমার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে।’’ তার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি স্যারের বাসায় যাই। পরে মহাখালীর রাজধানীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (আয়েশা মেমোরিয়াল হাসপাতাল) নিয়ে যাই।’

২০১৮ সালের মাঝামাঝি বুলবুলের হার্টে আটটি ব্লক ধরা পড়ে। তখন তার চিকিৎসার দায়িত্ব নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর বুলবুলকে ভর্তি করা হয় জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে। সেখানে চিকিৎসকরা বুলবুলের বাইপাস সার্জারি না করে শরীরে রিং পরানোর সিদ্ধান্ত নেন। এরপর চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরেন তিনি। তখন রাজধানীর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডা. অধ্যাপক আফজালুর রহমানের অধীনেই বুলবুলের শরীরে দুটি স্টেন্ট (রিং) স্থাপন করা হয়।

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের ফেসবুক স্ট্যাটাস। ছবি: ফেসবুক

মৃত্যুর আগে গত ২ জানুয়ারি সকালে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে নিজের একটি ছবি দিয়ে লিখেছিলেন, ‘আমাকে যেন ভুলে না যাও… তাই একটা ছবি পোস্ট করে মুখটা মনে করিয়ে দিলাম।’ তিনি স্ট্যাটাসের শেষে দেশের লাল-সবুজ একটি পতাকার ছবিও জুড়ে দেন।

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সংরক্ষিত স্থানে দাফন করার অনুমতি চেয়েছে তার পরিবার।

তার ছেলে সামির আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান, তার বাবাকে আজই দাফন করতে চান। মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সংরক্ষিত স্থানে দাফনের জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ জানান।

সুরের জগতে উজ্জ্বল তারারোদ: 

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ১লা জানুয়ারি ১৯৫৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন। একাধারে তিনি একজন গীতিকার, সুরকার এবং সঙ্গীত পরিচালক। ১৯৭০ দশকের শেষ লগ্ন থেকে অমৃত্যু বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পসহ সঙ্গীত শিল্পে সক্রিয় ছিলেন।

১৯৭৮ সালে মেঘ বিজলি বাদল ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করেন। তিনি স্বাধীনভাবে গানের অ্যালবাম তৈরি করেছেন এবং অসংখ্য চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন। সাবিনা ইয়াসমিন, রুনা লায়লা, সৈয়দ আব্দুল হাদি, এন্ড্রু কিশোর, সামিনা চৌধুরী, খালিদ হাসান মিলু, আগুন, কনক চাঁপা-সহ বাংলাদেশী প্রায় সকল জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পীদের নিয়ে কাজ করেছেন তিনি। তিনি নিয়মিত গান করেন ১৯৭৬ সাল থেকে।

বীর মুক্তিযোদ্ধা, গীতিকার, সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। ছবি: ইন্টারনেট

তিনি ১৯৭১ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ স্মৃতি বিস্মৃতি নিয়ে বহু জনপ্রিয় গান লিখেছেন এবং সুর করেছেন তিনি।

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল তিন শতাধিক চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনা করেন। চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনা করে দুই বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, এগারো বার বাচসাস পুরস্কার সহ বিভিন্ন পুরস্কার পান।

জনপ্রিয় কিছু গান: 

বুলবুলের লেখা উল্লেখযোগ্য গানের মধ্যে রয়েছে- ‘সব কটা জানালা খুলে দাও না’, ‘মাঝি নাও ছাইড়া দে ও মাঝি পাল উড়াইয়া দে’, ‘সেই রেললাইনের ধারে’, ‘আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি’, ‘আমার বুকের মধ্যেখানে’, ‘আমার বাবার মুখে প্রথম যেদিন’, ‘আমি তোমারি প্রেমও ভিখারি’, ‘আমার গরুর গাড়িতে বউ সাজিয়ে’, ‘পৃথিবীর যত সুখ আমি তোমারই ছোঁয়াতে যেন পেয়েছি’, ‘তোমায় দেখলে মনে হয়, হাজার বছর আগেও বুঝি ছিল পরিচয়’, ‘আম্মাজান আম্মাজান’, ‘স্বামী আর স্ত্রী বানায় যে জন মিস্ত্রি’, ‘ঈশ্বর আল্লাহ বিধাতা জানে’সহ আরও অনেক গান।

পুরষ্কার: 

তিনি রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মান একুশে পদক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং রাষ্ট্রপতির পুরস্কার সহ অন্যান্য অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল দুই শতাধিক চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন। চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনা করে পেয়েছেন দুই বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, রেকর্ড এগারো বার বাচসাস পুরস্কার সহ বিভিন্ন পুরস্কার।

২২ জানুয়ারি ভোর সোয়া ৪টার দিকে মারা যান তিনি। ছবি: ইন্টারনেট

মৃত্যুর আগে গৃহবন্দি ছিলেন বুলবুল:

যুদ্ধাপরাধ মামলায় সাক্ষী ছিলেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। অনেকেই যেখানে টাকা আর জীবনের হুমকিতে স্বাধীনতা বিরোধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে সাক্ষী দিতে চাননি, চুপ থেকেছেন দিনের পর দিন; সেখানে বাঘের মতোই বীরত্ব দেখিয়েছেন এই গানের মানুষ। তিনি আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বলেছেন সত্যের কথা, ন্যায়ের পক্ষে, রাষ্ট্রের হয়ে। মৃত্যু তাকে পিছপা করতে পারেনি।

এই সাক্ষ্য দেয়ার বিনিময়ে অনেক চড়া মূল্যই দিতে হয়েছে তাকে। হারিয়েছেন ছোট ভাইকে। ভাইয়ের মৃত্যু তাকে হতবাক করে দিয়েছিল, হতাশও। তিনি মেনে নিতে পারেননি, স্বাধীন বাংলাদেশে স্বাধীনতার নেতৃত্ব দেয়া দলের শাসনামলে স্বাধীনতার বিরোধীদের বিরুদ্ধে সাক্ষী দেয়ার বিনিময়ে ভাই হারাতে হবে একজন মুক্তিযোদ্ধাকে। রাজধানীর খিলগাঁও রেললাইনে পাওয়া গিয়েছিল বুলবুলের ভাইয়ের গলাকাটা লাশ

ভাইয়ের শোক নিয়ে ঘর থেকেই বের হতেন না গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। নিরবে নিভৃতে কাটিয়েছেন জীবনের শেষ দিনগুলো।

এর মধ্যে আসে তারও মৃত্যুর হুমকি। এরপর থেকে সরকারি নিরাপত্তার বলয়ে বাঁধা পড়েন তিনি। শুরু হয় শারীরিক অসুস্থতা। তার হৃদযন্ত্রে ৮টি ব্লক ধরা পড়ে।

Comments are closed.