সেলুনে পাঠাগার, নরসুন্দরের আঙুল শুধু মুখ নয় সুন্দর করে আত্মা

আপনি গেলেন চুল কাটাতে বা দাড়ি কামাতে আর আপনার সামনে এনে দাঁড় করানো হল রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরৎচন্দ্রসহ বাংলা সাহিত্যের তাবৎ সব রথী মহারথীদের। সেলুন হয়ে গেল সাহিত্যচর্চা বা নানা বিষয়ে জ্ঞান লাভের এক তীর্থস্থান।

এই ভাবনাটা ভর দুপুর কোন কল্পনা না। খুলনার বাটিয়াঘাটা বাজারের একটি সেলুনে ঠিল এমনটাই হচ্ছে। এই সেলুনটির মালিক মিলন শীল একজন বই পাগল মানুষ। সেলুনের একটি সেলফে থরেথরে সাজিয়ে রাখা আছে অসংখ্য বই।

পাঠাগারে আছে বিভিন্ন দেশ বরেন্য লেখকের ৩০০ এর বেশি বই। ছবি: ইন্টারনেট

মিলনের এই সেলুন পাঠাগারে রয়েছে রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশ বরেন্য লেখকের ৩০০ এর বেশি বই

অনেক সময় আমরা যেয়ে দেখি সেলুন ভর্তি মানুষ। সিরিয়ালে বসতে হয়। বসেই আমরা ব্যস্ত হয়ে যাই মোবাইলে। কিংবা খুঁজি অন্য কোন সেলুন। মিলন বের করেছেন এই সমস্যার সহজ সমাধান। নরসুন্দর আপনার আগে আসা লোকটিকে যখন নিয়ে ব্যস্ত, সময়টা কাজে লাগাতে সেলফ থেকে পছন্দের বইটি নিয়ে পড়া শুরু করলেন

মিলন নিজের সেলুনে গড়ে তুলেছেন একটি সমৃদ্ধ পাঠাগার। কষ্টার্জিত অর্থ জমিয়ে সেখানে সাজিয়েছেন বিখ্যাত মনীষীদের বই। সেলুনে আমরা মূলত যাই নিজেদের সুন্দর দেখানোর জন্য। নিজেদের চেহারা মেরামত করতে।  

কিন্তু মিলন সেলুনে আসা মানুষদের আত্মার মেরামত করার দায়িত্বও নিয়েছেন। এলাকাবাসী তার এই বিষয়টি ইতিবাচকভাবে নিয়েছেন। তার ভীড় করছেন সেলুনটাতে। পুরো এলাকা মিলনের দোকানকে সেলুন লাইব্রেরী হিসেবে একনামে চেনে।

এ প্রসঙ্গে নরসুন্দর মিলন বলেন, এতে সেলুনে লোকসমাগম বেড়ে গেছে। বই পড়তে অনেকেই সেলুনে আসেন। সেই সঙ্গে চুল, দাড়িও কামিয়ে যান।

মিলন জানান তার সংগ্রহে থাকা বইগুলোর কিছু তিনি নিজ উদ্যোগে আর কিছু বই বন্ধুদের কাছ থেকে সংগ্রহ করে এই লাইব্রেরী গড়েছেন। এই ইন্টারনেটের যুগে যখন মানষের বই পড়ার প্রবণতা ক্রমেই কমে যাচ্ছে, বই পড়ার অভ্যাসটা হারিয়ে যাচ্ছে, সেই জায়গায় মিলনের এই উদ্যোগ মানুষের মধ্যে বইয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি করছে।

বাটিয়াঘাটা বাজারের একটি সেলুনে গড়ে উঠেছে এলাকার একমাত্র পাঠাগার। ছবি: ইন্টারনেট

শুধু তার সেলুনে এসেই যে বই পড়তে হবে এমনটা নয়। ইচ্ছা করলে বাড়িতে নিয়েও পড়া যাবে বই। সেক্ষেত্রে একটি খাতায় নাম, ঠিকানা লিখেতে হবে পাঠকদের।

গ্রামের অনেকেই বই কিনে পড়তে পারেন না। মিলনের সেলুনে এসেই তারা তাদের চাহিদা মেটায়। মিলনের সেলুনের এমনই ওক নিয়মিত পাঠক নাজমুল বলেন, ‘এ উপজেলায় কোনো পাবলিক লাইব্রেরী নাই। এ কারণে মিলনের সেলুনে এসে বই পড়ি। মাঝে মধ্যে বাসায় নিয়েও যাই। মিলনের এ সেলুনের মাধ্যমে এলাকার সবার বই পড়ার অভ্যাস তৈরি হচ্ছে।’

তবে এই ধরণের উদ্যোগ বা পরিকল্পনার আড়ালের গল্পটা খুব একটা সুন্দরন নয়। আর্থিক সংকটের কারণে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় বাবার এই সেলুনের কাজে ঢুকে পড়েন মিলন। সংবাদপত্র পড়ার প্রতি খুব ঝোঁক ছিল তার। তবে একদিন এক বন্ধুর কাছ থেকে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘মেজদিদি’ বইটি নিয়ে পড়ে প্রথম বই পড়ার প্রতি আগ্রহ জন্মায়। শুরু হয় বই সংগ্রহ। এভাবেই একদিন ঝুলিতে জমা হয় অনেক অনেক বই।

আর সেসব বই দিয়েই নিজের ব্যবসাকেন্দ্রে এই পাঠাগার। সেলুন চালানোর পাশাপাশি উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করেছেন মিলন। বটিয়াঘাটা উপজেলার হেতালবুনিয়া গ্রামের মিলন শীল এখন একজন আলোচিত মুখ।

যে আঙুল বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টায়, সে আঙুল মুখ নয় সুন্দর করে আত্মা।