পাণ্ডুলিপি থেকে কবিতা : কেভ অব ডেথ – প্রসেনজিৎ রায়

প্রসেনজিৎ রায়

আপনি, রাষ্ট্র ও একটি পাপ

হুইসেল শোনা গেছে;
শুনেছি বিকেলের ট্রেন ধরে আপনার ফিরে আসার যাবতীয় আয়োজন গতকালই সম্পন্ন হয়ে আছে।
অবশিষ্ট বলতে একমাত্র সাক্ষাৎ-ই।
পুরাতন প্লাটফর্ম;
মাস্টার দাঁড়িয়ে আছেন;
পেছনে পুরোনো দালান,
বেহায়া নারীর মত চুন খসে চেয়ে আছে ইট,
নিথর দাঁড়িয়ে আছে জানালার জং ধরা বয়োজীর্ণ শিক।

আপনি কি সত্যিই ফিরছেন?
কেমন একটা অবাক স্বপ্নদৃশ্য ঘোর;
আপনার স্পষ্ট মুখটাও কবে যেন ভুলে গেছি!
মনে করতে গেলেই কোথাও তলিয়ে যাই;
কানের দুপাশে তীব্র কোলাহল,
আগুন জ্বলছে,
গুলির পর গুলির আওয়াজ,
ধেয়ে আসা বুটের হিংস্র শব্দ,
প্রচণ্ড চিৎকার,
উঠোনে গোটা তিনেক লাশ,
হেমাদের কাঁচারিঘরে জ্বলন্ত হারিকেন,
চেয়ারে রতনের গুলিবিদ্ধ দেহ,
কুসুমের বিভৎস চিৎকার,
অন্ধকারের পুকুরপাড়,
ঝাপসা দুটো চোখ,
একটি ভীতকম্প কণ্ঠস্বর-
“চলুন, সাতক্ষীরা, ওখান থেকে সোজা ওপারে।”
কিছু বুঝে ওঠার আগেই মায়ের হেঁচরা টানে হঠাৎ মিলিয়ে গেলেন বিস্তৃর্ণ অন্ধকারে।
এর পর আর কিছু মনে করতে পারিনা।
কানদুটো চেপে নিয়ে প্রচণ্ড চিৎকার ছুড়ি।

রাষ্ট্রের কাছে আমার কোন বলার মত জবাবদিহিতা নেই;
আজকের রাষ্ট্রীয় দিবসগুলোতে আমাকেই নিতে হয় পতাকার ভার,
আমাকে সম্মান করে ডাকা হয় “কমান্ডার বুলু”।
শুনেছি আপনার সন্তানেরাও নাকি ওপারে রক্ষিত রাখে দেশ!
কাশ্মীর সীমান্ত ঘেঁষে আপনার স্বামীও নাকি বুক পেতে গেছে!
৪৬ বছর আগে যেবার সর্বশেষ সাক্ষাৎ হয়েছিলো,
বলতে পারিনি- আপনাকে কতটুকু ভালোবাসি।
তবুও আপনার কাছেই আমার একমাত্র আত্মস্বীকার আছে।
আপনাকে বলতেই দীর্ঘদিন চষে বেড়িয়েছি বঙ্গ থেকে
হরিকেল,
বুকের পাথর চেপে খুঁজে গেছি পাপশিক্ত মৃত্যুবাণ।

হুঁইসেল শোনা গেছে,
ট্রেনবগি ডুকে গেছে প্লাটফর্মে;
আপনার কুচকানো চেহারায় কতটুকু দ্যুতি আছে কে জানে!
ভারক্লিষ্ট পা দুটো অসাড় হচ্ছে ক্রমশ;
আমার পৃথিবীটুকু গোগ্রাসে ধেয়ে আসছে ভেতরে;
তবুও একবার আপনার সাক্ষাৎ চাই;
আপনাকে বলে যেতে চাই-
আমার লাশ যেন পতাকায় ঢেকে দেয়া না হয়,
আমার শেষ যাত্রায় যেন ছিঃ ছিঃ দুয়োধ্বনি ওঠে।
একমাত্র আপনাকেই বলার আছে সাবিত্রী-
আমিই সেদিন রাতে পাকিদের চড় ছিলাম;
আমার চেনানো পথেই পাকিরা চালিয়ে গেছি মৃত্যুযোগ উৎসব!
আমার বিশ্বস্ত হাতই ওদেরকে নিয়ে গেছে হেমাদের বাড়ি,
একাদশী শিউলির অপক্ক দেহমূলে বিভৎসে চলে গেছে
বেয়নেট ছেনী।

রাষ্ট্রের জন্য আমার একটি ব্যক্তিগত দীর্ঘশ্বাস আছে।
আলাপচারিতার আগে একমাত্র আপনাকেই বলার আছে আমার একমাত্র বৃহত্তম পাপ।
শুনেছি বিকেলের ট্রেন ধরে আপনার ফিরে আসার যাবতীয় আয়োজন গতকালই সম্পন্ন হয়ে আছে।
আপনি ফিরছেন, ৪৬ বছর পরে।


কেভ অব ডেথ | প্রকাশনী: ভূমিপ্রকাশ

সুনীতি

একটি কবিতা আমার ডানপকেটে ভাঁজ করে রাখা ছিলো;
কথা ছিলো, সকালের ঘুম ভাঙলেই সুনীতি আসবে।
আমি দীর্ঘদিন নিজেকে ভেঙে ভেঙে কিছু শব্দবন্ধ লিখেছিলাম।
নিশ্বাস থেকে দীর্ঘশ্বাস জুড়ে যতগুলো অমসৃণ অনুভূতি আছে, সবটাই।
সারাটা রাত আমার দখিনের জানালাটা খোলা ছিলো।
আমি কান পেতে শুনেছি, আমলকীর পাতায় কিভাবে শিশিরেরা তানপুরা হয়।
আমি ছুঁয়ে দেখেছি অন্ধকার;
বুকের রাফখাতা খুলে উলটে দেখেছি সবকটা পাতা।

সুনীতির সাথে আমার বহুদিন সাক্ষাৎ নেই।
ছোটবেলায় শেষবার যখন দেখেছিলাম- ও তখন গজকাপড়ের ফ্রক পড়া ছিলো।
সেবার বারোতে পা- তখনও বেণীবাঁধার মত চুল লম্বা হয়নি।
এখন শাড়ি পরে; শাড়িতে নিশ্চয়ই মেয়েটাকে অদ্বিতীয়া লাগে!

সুনীতিরা আমাদের প্রতিবেশী ছিলো;
ধর্মে হিন্দু, পাক্কা কায়স্থ।
দুপুর আর সন্ধ্যায় নামাজে বসলেই ও বাড়ির ঘণ্টার আওয়াজ আসতো দু’কানে।
আমার সুরা থেকে মন সরে দেয়াল টপকে যেতো ওপারে;
বাধ্য হারমনি আর সুনীতির গানে।

এভাবেই কবে যেনো বুকের চৌকাঠে বেঁধে গেলো মেয়েটি;
আমার ঘুমের শরীরে ভেসে উঠতো মুখ;
তীব্র ব্যস্ততায় কানে বাজতো ঠাকুরঘরের সুর-
তুমি নির্মল করো মঙ্গল করে মলিন মর্ম মুছায়ে…

সুনীতিকে ভেবেই আমার প্রথমবার কবি হয়ে ওঠা।
ভেবেছিলাম- দেখা হলে জেনে নেবো এটাকেই প্রেম বলে কিনা!

বাবার মৃত্যুর পরে আমরা শহরে এলাম;
বখে যাবো ভেবে আমার ঠাঁই হলো মাদ্রাসার বোডিংয়ে;
লুকোনো ডায়রীতে জমা হলো কবিতার শরীর;
তিনবছর আমার আর বাড়ি ফেরা হয়নি;
বড্ড হাঁপিয়ে গিয়ে একদিন পালালাম- সুনীতিকে বহুদিন দেখিনা যে!
একটি কবিতা আমার ডানপকেটে ভাঁজ করে রাখা ছিলো।
সুপারিপাতার বেড়া ঘেরা বাড়িটিতে ব্যস্ততা সেদিন;
রাতটুকু পেরুলেই সুনীতি ফিরবে।
প্রথম নাইওরে।
সেই প্রথম জানলাম- সিঁথির সিঁদুরে ঠিক কতটুকু আভা।

আমি ফিরে এলাম;
সারাটা রাত আমার দখিনের জানালাটা খোলা ছিলো।
আমি কান পেতে শুনেছি, রাতের আমলকীর পাতায় কিভাবে শিশিরেরা তানপুরা হয়।
আমি ছুঁয়ে দেখেছি অন্ধকার;
বুকের রাফখাতা খুলে উলটে দেখেছি সবকটা পাতা।
প্রতিটা শব্দকে- যেখানে এখনও সুনীতিই থাকে।


কাব্যগ্রন্থঃ কেভ অব ডেথ
প্রকাশনীঃ ভূমিপ্রকাশ
প্রচ্ছদঃ সজল চৌধুরী
মলাট মূল্যঃ ১৫০ টাকা

এটি কবির দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ। প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম “বিকেল কিনে রাখি” (বইমেলা ২০১৭),

কবির জন্ম ও বেড়ে ওঠা বরিশালের বানারীপাড়ায় হলেও বর্তমান ঠিকানা পিরোজপুর এর স্বরূপকাঠিতে। এখানে প্রায় ১৯ বছর ধরে আছেন৷ বরিশাল বিএম কলেজ থেকে ইতিহাস বিভাগে অনার্স ও এই বছর মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন।