“আয়ুর ভিতর ফাঁকা হয়ে আসে স্টেশন”

 নেক গুলো বই জমা হয়েছে পড়ার জন্য। ফেইসবুক আসক্তি বাড়তি সময়টুকু টুপ করে গিলে ফেলে। এর থেকে  বেছে-কেছে একটু সময়ে উত্তরাধুনিক জটিল কবিতা বোঝার বুদ্ধির ভীষণ অভাব বোধ করি। কবিতা পড়ি শব্দের খেলা ভালো লাগে তাই। ঐন্দ্রজালিক শব্দগুচ্ছ সময়ের বিশাল দূরত্ব দৌড়াতে দৌড়াতে কোথা থেকে কোথা নিয়ে যায়। এ এক দারুণ খেলা!

শুভ্র সরকার
দৃষ্টিতে আটকে আছে শূন্য; কবি শুভ্র সরকার

“উড়তে জানা নদীকে ঝর্ণা বলে ডাকো”, “ব্রিজের ছায়ায় একা শিস্ দিয়ে উড়ে যাওয়া সফেদা ফুল… ” “কিংবা আয়ুর ভিতর ফাঁকা হয়ে আসে স্টেশন।” “নদীর গালের টোল” বা “ইথারে শুকাতে দেওয়া শৈশব….”এই যে শব্দ নিয়ে খেলা আর খেলার অন্তরালে ভাবনার ভাঙা চোরা তাই এই সময়ের কবিতার বিশেষ বৈশিষ্ট্য। “ঈর্ষার পাশে তুমিও জুঁইফুল” তেমন একটি কবিতার বই। যেখানে ভাবনাগুলোকে জাল বিছিয়ে ধরতে হয়। যেমন “জলের পাজরে মাছরাঙার মনোযোগ” তেমন করে যদি বা ধরি একমুঠো জল আরেক মুঠো ঠিক গলিয়ে যায় আঙুল বেয়ে।

‘কয়েক দৈর্ঘ্যের জীবন’ কবিতায় শব্দের যাদুতে টুকরো টুকরো শৈশবকে বাঁধা হয়েছে যেখানে প্রিয় সম্পর্ক হয়ে যায় “ডাকনাম”। কয়েক দৈর্ঘ্যের জীবন ফুরায় ঘুম ভাঙলেই…. এ এক বিষণ্ণ বেদনা। ‘ধূপছায়া’ কবিতায় একজন ‘তুমি’কে পাই যার শরত রঙা ত্বকে বড়ই ফুল ফোটে আবার ছুয়ে দিলে সে রেণুর মতো ঝরে পড়ে। কবির ডাকে যে তুমি হয়ে যায় এক “মোহবশ নদী” তবুও সেই তুমির আলোকচ্ছটায় কবি দেখেন ধূপছায়া যা মুছে দেয় মনুষ্য পরিচয়, অইরান।

ঈর্ষার পাশে তুমিও জুঁইফুল
প্রচ্ছদ : ঈর্ষার পাশে তুমিও জুঁইফুল

শুধু মাত্র একটা লাইন দিয়ে একজন মা’য়ের একটা পূর্ণ চিত্র তৈরি হয় যখন…
“উনুনের আঁচে একা হয়ে যাচ্ছে শীতকাল… .”
আবার,

“ঘড়ির থেকে উড়িয়ে দেয়া আয়ু
ছায়ার ভাঁজে লুকিয়ে থাকা ভিড়
ভীষণ এক গভীর মনোলিথ-
যেন তোমার আলগা করা মিড়

আয়ুর দিকে ফেরার পথে দেখো
নিহত এক ভিড়ের পাশে একা
ভাড়াটে ফুল কুড়িয়ে রাখে রেণু
পাখির শিসে পথ রয়েছে আঁকা

মেঘ ডিঙিয়ে জল বুনছে পথ
তোমার গায়ে সেলাই করে জ্বর
শস্য দিনের হিম প্রতুল ভাষা
কোথাও যেন শুনি তোমার স্বর

ঘুমের জলে সাঁতার ভোলা মীন
নদীর গালে আঁকছো তুমি টোল
তবুও কেন এড়িয়ে যেতে চাও
ঘড়ির আছে নিজের কোলাহল”

“গভীর মনোলিথে” মাত্রাবৃত্তে লিখা দারুণ এক জুঁইফুল। যার শব্দের দোলায় এক টুকরো বাতাস পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে এক গভীর মনোলিথে যেখানে স্মৃতিগুলোকে বিলীন করা হয়েছে।

কবি শুভ্র সরকার তাঁর কবিতায় ভাষাকে সেলাই করেছেন যা থেকে তৈরি হয়েছে এক ভিন্ন জগত। কবির মতে “ঈর্ষার পাশে তুমিও জুঁইফুল” ভাষার অধিক এক আবহ যাতে সময়কে ধরা হয়েছে অনুভবে। কবি যেমনটি বলেন…

বইটি একটা জার্নি। এতে আছে জুঁইফুল যা হতে পারে একটা বাসস্টপ। যাকে ছুঁয়ে দিলে যাতায়াত হয়ে যায় আঙুল।