কাঁকড়া চাষে সাফল্য পাচ্ছেন বরগুনা ও পটুয়াখালীর চাষিরা

বরগুনা ও পটুয়াখালী উপকূলের মৎস্য চাষীরা বাণিজ্যিকভাবে কাঁকড়া চাষে সাফল্য পাচ্ছেন। এ অঞ্চলের মানুষের কাছে কাঁকড়ার চাষ নতুন হলেও গত কয়েক বছরে তা প্রসার লাভ করছে। সমুদ্রের লবস্টার বা গলদা চিংড়ির মতোই সুস্বাদু, রসনা তৃপ্তিকর খাবার হচ্ছে ক্রাব ফ্রাই বা কাঁকড়া ভাজা। আছে এতে শরীরের জন্য উপকারী প্রাকৃতিক খাদ্য উপাদানও। পারিবারিক ও ঘরোয়া রান্নায় সুস্বাদু কাঁকড়া ভাজি ও রান্না করা বিভিন্ন পদ পছন্দ করেন এমন সাধারণ মানুষের সংখ্যাও গত এক দশকে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।


পটুয়াখালীর পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটাসহ বরগুনার তালতলী ও পাথরঘাটার সমুদ্র উপকূলীয় পর্যটন স্পটগুলোর খাবার হোটেল ও দোকানগুলোতে গত এক দশকে এই খাবার জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। স্থানীয় চাহিদাসহ অন্যান্য জেলায় প্রতিদিনই বাড়ছে কাঁকড়ার চাহিদা। ভালো দামও মিলছে। নদী সাগর থেকে আহরিত কাঁকড়াসহ স্থানীয় ঘেরগুলোতে উৎপাদিত কাঁকড়া বিভিন্ন জেলায় রপ্তানি করা হচ্ছে।
এই দুই জেলাতে ছোট-বড় প্রায় দেড়হাজার কাঁকড়া ঘেরে কয়েক হাজার মৎস্য চাষীর জীবিকা নির্বাহ হচ্ছে। অনুকূল পরিবেশের কারণে দিনদিন কাঁকড়া চাষ জনপ্রিয়তা পাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট চাষী ও মৎস্য দপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। মৎস্য চাষীরাও আগ্রহভরে কাঁকড়া চাষ করছেন।
আমতলী উপজেলার কড়ইবাড়িয়া গ্রামে মনির গাজীর বড় সাইজের ডোবা সাদৃশ্য পুকুরটির চারপাশ বাঁশের চাটাই ও মশারীর জাল দিয়ে ঘেরা। মাঝ বরাবর চাটাইয়ের বেড়া ও মশারীর জাল পুকুরদিকে দুইভাগে ভাগ করেছে। এ এলাকায় সাধারণতঃ মাছ চাষের জলাশয়ে এত সুরক্ষা দেখা যায় না। সবুজ নামের এক কর্মী পুকুরে নেমে হাতরিয়ে বড় বড় সাইজের কাঁকড়াতুলে আনছে। ওই যুবকটি জানাল এখানে ছোট ছোট কাঁকড়া নাসিং (পরিচর্যা/মোটাতাজা করণ) করে বড় করা হয়। কাঁকড়া জন্য খুব বেশী পরিচর্যা দরকার পড়ে না। নিয়মিত খাবার দিলেই চলে। তবে পুকুরপাড়ে শক্ত ও ভাল বেড়ার দরকার পড়ে। না হলে কাঁকড়াগুলো হেঁটে হেঁটে চলে যাবে। এখানকার কাঁকড়া খুলনা ও বাগেরহাটে চালান করা হয়।

ঘেরের পাশেই মনির গাজী’র তার মাছের আড়ত। গত ২০ বছর ধরে তিনি গলদা ও বাগদা চিংড়িসহ বিভিন্ন সাদা মাছের (রুই, কাতলা, কোরাল, বোয়াল প্রভৃতি) আড়তদারী করছেন। বছর দশেক আগে এলাকার প্রথম ব্যক্তি হিসেবে কাঁকড়া রপ্তানী শুরু করেন মনির। স্থানীয় জেলেদের কাছ থেকে কাঁকড়া কিনে তা খুলনা, বাগেরহাট এলাকায় চালান করতেন। জেলেদের জালে ধরা কাঁকড়াগুলো আড়তে আসতে আসতেই দূর্বল হয়ে পড়ত। কাঁকড়াগুলোকে খুলনা পাঠানোর সময়ে অর্ধেকই মারা পড়ত। সেসময় থেকেই মনির ভাবতে শুরু করলেন কীভাবে তরতাজা কাঁকড়া চালানে পাঠানো যায়। সে ভাবনা থেকেই গত পাঁচ বছর আগে তিনি কাঁকড়া নাসিং (পরিচর্যা/মোটাতাজা করণ) শুরু করেন। মনির জানালেন, ‘চালানে পাঠালে এখনও কাঁকড়া মারা পড়ে। তবে খুবই কম পরিমাণে।’ মনির গাজীর সাফল্য দেখে ওই এলাকার শতাধিক উদ্যোগী মানুষ কাঁকড়া চাষ করছেন।
জেলার পাথরঘাটায় প্রায় তিন একর জায়গা ইজারা নিয়ে কাঁকড়ার ঘের করেছেন বরিশালের রফিকুল ইসলাম। তিনি জানান, স্থানীয় জেলেদের কাছ থেকে কাঁকড়া সংগ্রহ করে ঘেরে তা বড় করা হয়। বাজার থেকে ছোট ও গুড়া মাছ কিনে কাঁকড়াকে খাওয়ানো হয়। ৪১ দিন পড়ে ঐ কাঁকড়াগুলো প্রায় ৭শ থেকে ৮শ গ্রাম ওজনের হয়। বার মাস চলে কাঁকড়ার ব্যবসা। প্রতি দেড় মাসে ৫০ হাজার টাকা মূলধনে ১ লাখের বেশী টাকা আসে বলে তিনি জানান। খুলনাসহ বিভিন্ন মোকামে প্রতিকেজি কাঁকড়া বিক্রি হয় ৭ শ থেকে ১২শ টাকায়।

জেলা মৎস্য দপ্তরের একজন কর্মকর্তা রবীন্দ্রনাথ মন্ডল জানিয়েছেন, ‘উপকূলীয় এলাকা হিসেবে বরগুনাতে কাঁকড়া মোটাতাজাকরণ (নার্সিং) ও প্রজননের উপযোগী পরিবেশ রয়েছে। ভাদ্র থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত জেলেদের জালে প্রচুর কাঁকড়ার বাচ্চা ধরা পড়ে এবং অহেতুক মারা পড়ে। সেগুলোকে মোটতাজাকরণের মাধ্যমে প্রচুর অর্থ উপার্জন সম্ভব। জেলা মৎস্য বিভাগ কাঁকড়া চাষে উদ্যোগীদের প্রশিক্ষনসহ সর্বাত্মক সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত।’