সাম্প্রতিক আলোচিত আত্মহত্যা, আত্মহত্যার দায় কার? 

সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে আত্মহত্যার দায় কার? ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে আত্মহত্যা করা চট্টগ্রামের তরুণ চিকিৎসক মোস্তফা মোরশেদ আকাশের আত্মহত্যার পর এই প্রশ্নটি আর বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে জনমনে। এর আগে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জিন প্রকৌশল ও প্রযুক্তি (জিইবি) বিভাগের শিক্ষার্থীর মো. সাইফুর রহমান প্রতীকের আত্মহত্যা নিয়েও একই রকম প্রশ্ন উঠেছিল।

সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া কিছু আত্মহত্যা 

  • প্রথম ঘটনা 

ভিকারুননিসা নুন স্কুলের শিক্ষার্থী অরিত্রি অধিকারী। নবম শ্রেণির এই শিক্ষার্থীর ক্লাস রোল ১২। পরিবারের অভিযোগ, স্কুলে নকলের অভিযোগে অপমানের জের ধরে গত ৩ ডিসেম্বর আত্মহত্যা করে এই কিশোরী শিক্ষার্থী। আত্মহত্যার প্ররোচনার দায়ে এক শিক্ষক কারাগারে গেছেন৷ অধ্যক্ষ সামায়িক বরখাস্ত হয়েছেন৷

দ্বিতীয় ঘটনা চলতি বছরে শুরুতে সাইফুর রহমান প্রতীক নামের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জিন প্রকৌশল ও প্রযুক্তি (জিইবি) বিভাগের এক শিক্ষার্থী ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। প্রতীকের আত্মহত্যার জন্য শাবির জিইবি বিভাগের শিক্ষকদের দায়ী করেছেন তার বড় বোন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ বৈকল্য বিভাগের শিক্ষক শান্তা তাওহিদা। 

ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি লেখেন, অনার্সে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়া ছেলেটাকে বিভিন্ন ইস্যু বানিয়ে মাস্টার্সে সুপারভাইজার দেয় নাই। বিভিন্ন কোর্সে নম্বর কম দিয়েছে! আমার ভাইটা টিচার হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল এটাই তার অপরাধ… গত ছয় মাস ধরে ডিপার্টমেন্ট তিলে তিলে মেরে ফেলেছে আমার ভাইকে…আমার কলিজার টুকরা কষ্ট সহ্য করতে না পেরে কাল সুইসাইড করেছে

  • তৃতীয় ঘটনা 

সৈকত রঞ্জন মণ্ডল (২৫) নামের এক তরুণ সরকারি চাকরি না পেয়ে গত বছরে সেপ্টেম্বরে আত্মহত্যা করে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজিতে ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।

তার কক্ষ থেকে উদ্ধারকৃত ডায়েরির একটি পাতায় লেখা রয়েছে, ‘অনেক স্বপ্ন ছিল চাকরি করবো, মার মুখে হাসি ফোটাবো। কিন্তু সব এলোমেলো হয়ে গেলো। মার শরীর খুব খারাপ। তবুও আমি খুলনা থেকে পড়ার কথা ভাবছি। বাড়িতে যেতে গেলে সবকিছু নিয়ে যেতে হবে।

  • চতুর্থ ঘটনা

সদ্য ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় মানুষের হৃদয়ে তৈরি হওয়া ক্ষত এখনো শুকায়নি। চট্টগ্রামে চিকিৎসক মোস্তফা মোরশেদ আকাশের আত্মহত্যার প্ররোচনার দায়ে তার স্ত্রী তানজিলা হক চৌধুরী মিতু এখন কারাগারে৷ মিতু নিজেও একজন চিকিৎসক৷ এই ঘটনায় আরো ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে৷ আকাশ ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন৷ সেখানে কিছু ছবি আর ভিডিও আপলোড করেছেন৷ তার এই পোস্ট থেকে আত্মহত্যার কারণ প্রাথমিকভাবে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক বলে ভাবা হচ্ছে৷

পরিসংখ্যান এবং বিশ্লেষণ 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র (হু)  তথ্যমতে, বিশ্বে প্রতিবছর ৮ লাখ মানুষ আত্মহত্যা করে৷ প্রতিদিন এই সংখ্যা দুই হাজারেরও বেশি৷ প্রতি ৪০ সেকেন্ডে বিশ্বের কোথাও না কোথাও কেউ না কেউ আত্মহত্যা করছে৷বিশ্বে  ১৫-২৯ বয়সীদের মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ আত্মহত্যা৷

প্রথম আলোতে গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে গত চার বছরে প্রতিদিন গড়ে ২৮ জন আত্মহত্যা করেছেন। শুধু গত বছর ফাঁসিতে ঝুলে ও বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছেন ১০ হাজার ১২৯ জন। এ তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও পুলিশ সদর দপ্তরের। যাঁরা আত্মহত্যা করেছেন বা চেষ্টা করেছেন, তাঁদের বড় অংশের বয়স ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে।

এক গবেষণা দেখা গিয়েছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর ১ লাখ ৩৯ দশমিক ৬ জন আত্মহত্যা করে। ছেলেদের মধ্যে আত্মহত্যার হার বেশি হলেও বাংলাদেশে এই হার নারীদের মধ্যে বেশি। সাধারণত কম বয়সী মেয়েদের মধ্যে এর প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। স্বল্পশিক্ষা, দারিদ্র্য, দাম্পত্য কলহের জন্য অনেকে আত্মহত্যা করে। এ ছাড়াও প্রেম-সম্পর্কিত জটিলতা, আর্থিক অনটন, দীর্ঘস্থায়ী রোগ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব আত্মহত্যার পেছনের অন্যতম কারণ।

জাতীয় মানমিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম ডয়চে ভেলেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, দায় কার তা নির্নয় করা কঠিন৷ কারণ এই একই ধরণের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে অনেকেইতো আত্মহত্যা করেন না৷ এরচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতেও অনেকে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন না৷ একটি মানসিক পরিস্থিতিতে কেউ আত্মহত্যা করেন৷ আবার কেউ করেন না৷ যিনি হতাশায় শূন্য হয়ে যান৷ মনে করেন জীবন অর্থহীন৷ জীবনের কোনো মানে থাকেনা তার কাছে সে আত্মহত্যা করতে পারে৷ এটা অনেকটা মানসিক গঠনের ওপরও নির্ভর করে৷”

তাজুল ইসলাম বলেন, ‘‘তবে আমাদের সমাজ, পরিবার ও রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যেই আত্মহত্যার কারণ বিদ্যমান৷ কে কোন পরিস্থিতি চরম হতাশ হয়ে জীবনকে অর্থহীন মনে করবে তা বলা মুশকিল৷ চরম শূন্য বোধই এর কারণ৷ এই যে পারিবারিক কারণ, বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কথা উঠে এল এর বাইরেও সমাজে ও রাষ্ট্রে নানা অসঙ্গতি আছে যা আত্মহত্যার পিছনে কাজ করে৷ মাদকাসক্তিও আত্মহত্যার কারণ৷”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান বলেন, ‘‘আত্মহত্যার ক্ল্যাসিকাল কারণগুলোর বাইরে বাংলাদেশে নতুন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে৷ মানবিক এবং সামাজিক সম্পর্কের নতুন ধারা এবং  মাত্রা আমাদের সমাজে প্রবেশ করছে৷ অন্য সমাজে যা স্বাভাবিক আমাদের এখানে তা স্বাভাবিক নয়৷ ফলে এক ধরণের মানসিক দ্বন্দ্ব তৈরি হচ্ছে৷ যা  কাউকে কাউকে গভীর হতাশায় নিমজ্জিত করে আত্মহত্যার দিকে ধাবিত করছে৷ সমাজে অর্থনেতিক ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তন আসছে৷ দারিদ্র্য যেমন আত্মহত্যার কারণ হতে পারে তেমনি ধন সম্পদও হতে পারে৷ কোটি টাকার লটারি জিতেও কেউ আত্মহত্যা করতে পারেন৷”

চিকিৎসা:

সাইকিয়াট্রিস্টের তত্ত্বাবধানে থেকে নানান প্রকারের কার্যকরী এন্টিডিপ্রেশেন্ট ড্রাগ সাইকোথেরাপি ও কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে একজন ডিপ্রেশনের রোগীকে সম্পূর্ণরূপে সুস্থ করে তোলা সম্ভব। সাধারণত এমিট্রিপটাইলিন, সিটালোপ্রাম, এস সিটালোপ্রাম, মিরটাজাপিন এন্টিডিপ্রেশন হিসেবে খুবই কার্যকরী।

সারা বিশ্বে ক্রমবর্ধমান ডিপ্রেশনের এই ভয়াবহতা উপলব্ধি করেই গত বছরের ৭ এপ্রিল (২০১৭) বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের স্লোগান করা ছিল

“ডিপ্রেশন: লেট’স টক” অর্থাৎ “আসুন, ডিপ্রেশন নিয়ে আলোচনা করি”। সবশেষে আবারো বলছি, ডিপ্রেশনের রোগীরা সবার অগোচরে আত্মহত্যা করে বসেন। তাই তাদের সঙ্গে প্রাণ খুলে কথা বলুন, সময় দিন এবং বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হোন।

তথ্য সূত্র: ডিডাব্লিউ, প্রথম আলো, যুগান্তর