আধুনিক কবিতার বুঝাপড়ায় পাঠকদের মাঝে একটা শূন্যতা তৈরি হয়েছে–হুজাইফা মাহমুদ

কবি হুজাইফা মাহমুদের প্রথম কাব্যগ্রন্থ অন্তঃস্থ ছায়ার দিকে প্রকাশ পেল এবারের একুশে বইমেলায়। সন্দেশকে এ-বই নিয়ে জানাচ্ছেন তিনি নিজেই; সেইসঙ্গে তাঁর কাব্যভাবনাও। পাঠকদের জন্য দেওয়া হল পাণ্ডুলিপি থেকে দুইটি কবিতাও। হুজাইফা মাহমুদের সঙ্গে কথা বলেছেনরাফসান গালিব।

কতদিন ধরে লিখছেন? কখন এসে মনে হল এবার বই বের করা যায়?

একেবারে কিশোর বয়সের কাঁচা আর সরল উত্তেজনাপূর্ণ লেখাগুলোর কথা বাদ দিয়ে বললে, পাঁচ থেকে ছয় বছর দাঁড়ায় আমার লেখার বয়স।

বই করার ব্যাপারে অনেকদিন ধরেই একটা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছিল আমার ভেতর। আদৌ বই করার মতো কবিতা আছে কিনা, এ-ব্যাপারে বেশ সিদ্ধান্তহীনতায় ছিলাম। তারপর এই দোলাচলের ভেতরেই এ বছর ঢাকাপ্রকাশের কমল ভাই ও জয় ভাই বই করার প্রস্তাব করলেন, এবং আমিও এতোকিছু না ভেবে রাজি হয়ে গেলাম।

অন্তঃস্থ ছায়ার দিকেএই নাম কেন? এতে কয়টি কবিতা আছে?

এই নামটা মূলত আমার কবিতারই একটা লাইন থেকে নেয়া হয়েছে। যে ধরনের টেক্সট আছে বইয়ে তার সাথে এই নামটিকেই বেশ যুতসই মনে হয়েছে। কবিতায় আমার অন্বেষা থাকে মূলত অন্তর্গত সুর আর দৃশ্যের নির্মাণের দিকে। সে দিক বিবেচনায়, আমার যাত্রা যতটা বহিরাঙ্গের দিকে তারচেয়ে বেশি অন্তঃস্থতার দিকে। বস্তুর অন্তঃস্থ রূপটিইত ছায়া! নামটি বোধহয় এই কনসেপ্টটিকে ধারণ করতে পেরেছে।

এ বইয়ে মোট ৩৪ কবিতা আছে।

অন্তঃস্থ ছায়ার দিকে
আধুনিক কবিতার বুঝাপড়ায় পাঠকদের মাঝে একটা শূন্যতা তৈরি হয়েছে–হুজাইফা মাহমুদ

কবিতা লেখার ব্যঞ্জনা কিভাবে তৈরি হয় আপনার মধ্যে?

এটা আসলে একটা অদ্ভূত ব্যাপার। আমি নিজেও সচেতন না এ-ব্যাপারে, কিভাবে কবিতার ব্যঞ্জনা তৈরি হয়। অবশ্য এ কথা বলে কবিতাকে  মিস্টিক্যাল বা অলৌকিক কোন ব্যাপার হিসাবে উপস্থাপন করাও আমার উদ্দেশ্য না এখানে। যেকোন সময় এই বোধ তৈরি হতে পারে, এমনকি আপনি চরম অসুবিধাজনক কোন অবস্থায় থাকলেও অসাধারণ তন্দ্রালু সুরের কবিতা আপনার মনে ঝিলিক দিয়ে উঠতে পারে। আবার  কখনো একটা শব্দের ব্যাঞ্জনা থেকেও তৈরি হয় পুরো একটি কবিতা। যেন এই একটি শব্দের নিগূঢ় গুঞ্জনই আপনাকে পথ দেখিয়ে দেখিয়ে একটা প্রান্ত পর্যন্ত এনে ছেড়ে দিবে, এর বাইরে আর চাইলেও আপনি যেতে পারবেন না। কবিতার পুরো জার্নিটাই একটা অনিশ্চিত ও ঘটনাপ্রবণ যাত্রা। আমার কাছে এমনটাই মনে হয়।

সাম্প্রতিক সময়ের কবিতাকে কিভাবে বিচার করবেন?

কবিতাকে এভাবে টাইমফ্রেমে রেখে সাধারণত পাঠ করা হয় না আমার। ভাল কবিতা সবসময়ই লেখা হয়েছে, এখনও হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ের কবিতাকে এখনই কোন ছাঁচে ফেলে বিচার করার সময় হয়তো হয়নি। আমার কাছে মনে হয়েছে, কবিতার স্টাইল ও ফর্মের বৈচিত্রের কারণে এই সময়টা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ হয়ে থাকবে। নানান ধরনের টেক্সট লেখা হচ্ছে।

রাজনৈতিক পরিস্থিতি সেইসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এ সময়ে এসে কবিতার নতুন কোন ভাষা তৈরি হয়েছে কিনা?

দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিকভাবে খুবই অস্থিতিশীল এবং অস্বাভাবিক একটা সময় পার করছি আমরা। কবিতার উপর এর প্রভাবও অবশ্যই আছে। তবে এতোটা ব্যাপক হয়ে দেখা দেয়নি সেটা, যতটা হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। সবকিছুই স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে, এবং আমরা সবকিছু খুব দ্রুতই ভুলে যাচ্ছি। হয়তো বর্তমান সময়ের বাস্তবতাই আমাদেরকে এ-পর্যায়ে এনেছে।

এর ব্যতিক্রমও চোখে পড়ছে অবশ্যই।

কবিতা বিষয়টাই তারুণ্যনির্ভরকী মনে হয় আপনার?

এমন সরল সিদ্ধান্তে উপনিত হওয়াটা ঠিক হবে না হয়তো। যেহেতু কবিতা একটা সামগ্রিক ব্যাপার। ব্যাক্তিক কালখণ্ডের সাথে একে বিশেষায়িত করে রাখার সুযোগ নাই। তরুণ বয়স অতিক্রম করে মধ্যবয়সে এমনকি বার্ধক্যে উপণিত হয়েও অনেকে দুর্দান্ত সব কবিতা লিখেছেন। তবে, এটা হয়তো বাস্তব, একজন কবির তরুণ বয়সে মেধা, চিন্তা ও বোধের যে মহা স্ফূরণ ঘটে, এবং টেক্সট নিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার যে সাহসী প্রবণতা গড়ে উঠে, পরবর্তীতে সেটা ওইরকমভাবে আর থাকে না হয়তো। এবং অনেকের ক্ষেত্রেই দেখা যায়, বয়সের সাথে সাথে তারাও ফুরিয়ে আসছেন, কবিতায় নতুন কিছু আর বলার নেই তাদের। তবে এটা সামগ্রিক কথা না, অবশ্যই।

কবিরাই কবিতা পাঠকধরনের কথা আমরা জানি। সাধারণ পাঠকের কাছে কবিদের দূরত্বটা কোথায়?

বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে এটা একটা দুঃখজনক বাস্তবতা বটে। তবে এটাও সত্য, নির্বিশেষে জনসাধারণ, যারা সাহিত্যের পাঠক, কখনো কবিতার পাঠক ছিলেন বলে মনে হয় না। বরং ওই পাঠকদের মধ্য থেকেই বড় একটা শ্রেণী ছিলেন, যারা কবিতার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন। এখন সেই শ্রেণীটারও অনুপস্থিতি লক্ষ করা যাচ্ছে, ফলে কবিতার সাথে একটা ব্যাপক শূন্যতা ও বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছে।

আসলে, আধুনিক কবিতার বুঝাপড়ার ব্যাপারে পাঠকদের মাঝে একটা শূন্যতা তৈরি হয়েছে। বেশির ভাগ মানুষই অভিযোগ করেন, আধুনিক কবিতা বুঝি না, এখনকার কবিরা বুঝার মতো করে লেখেন না, ইত্যাদি।

তো, এইসব অভিযোগের নানান কৈফিয়ত দেয়া যাতে পারে। আমি বলতে চাই, এখানে পাঠকেরও কিছু দায়বদ্ধতা আছে। তাদেরও  মানসিক প্রস্তুতির একটা ব্যাপার আছে এখানে। ১৮শতকের কবিতা আর ২১শতকের কবিতার ভাষা এক হবে না। এই পরিবর্তনকে মেনে নিয়েই কবিতাকে স্বাগত জানাতে হবে।

কার কার কবিতা সবসময়ই ভাল লাগে? সমসাময়িক কোন কোন কবিকে সম্ভাবনাময়ী মনে হয়?

কারো কবিতাই সবসময় ভালো লাগে না আসলে। ভালো মন্দ মিলিয়েই একেকজন প্রিয় কবির তালিকায় জায়গা করে নেন, এবং এ ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি হলে তাদের কথাই সবার আগে মনে পড়ে। এমন কবিতো অনেক, কয়েকজনের কথা বলতে বললে, বলবো জীবনানন্দ দাশ, অমিয় চক্রবর্তী, ফররুখ আহমদ, আল মাহমুদ, সিকদার আমিনুল হক, আব্দুল মান্নান সৈয়দ ও আবিদ আজাদ।

এই সময়ের অনেকের কবিতাই মুগ্ধ করছে। আগ্রহ নিয়ে পড়ি তাদেরকে। এদের মাঝে সম্ভাবনাময়ীকে, এই কথা বলার যোগ্যতা আমার নাই আসলে। আমি কেবল আমার ভালো লাগার কথা বলতে পারি, আর তাদের তালিকাও বেশ লম্বা। সে তালিকা আর না দেই। তবে,এর মাঝে হাসান রোবায়েতের কথা বিশেষভাবে বলা দরকার মনে করি। কবিতায় তার কাজের ব্যাপ্তি ও বৈচিত্র্য তাকে অন্যস্তরে নিয়ে গেছে।

অন্তঃস্থ ছায়ার দিকেকেন কিনবে বা পড়বে পাঠক?

কেন কিনবে বা পড়বে পাঠক, এর কোন উত্তর নাই আমার কাছে। নিজের টেক্সটের ব্যাপারে আমার এতটুকু আস্থা নাই যে, এ ব্যাপারে পাঠককে নিশ্চয়তা দিয়ে কোন কথা বলতে পারবো। আমি বরং সবিনয়ে বলবো,যদি আপনি কবিতার পাঠক হয়ে থাকেন, তাহলে আমার বইটিও আপনি অন্যান্য কবিতার বইয়ের সাথে আপনার পাঠ তালিকায় রাখতে পারেন।

কারা কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশ করেছে? প্রচ্ছদ কার করা? মেলায় কোথায় এবং আর কোন কোন জায়গায় পাওয়া যাবে?

বইটি প্রকাশ করেছে ঢাকাপ্রকাশ। প্রচ্ছদ করেছেন রাজীব দত্ত। বইটি মেলার মূল প্রাঙ্গনে মেঘ–২৭৩ এর স্টলে পাওয়া যাবে। আর একাডেমি প্রাঙ্গনের লিটলম্যাগ চত্বরে ফেস্টুনের স্টলে পাওয়া যাবে।

এমন আরও একটি সাক্ষাৎকার পড়ুন‘সমসাময়িক কবিদের মধ্যে দু’একজনই থাকেন সম্ভাবনাময়, বাকিসব হাবুডুবু খায়’ : নৈরিৎ ইমু

অন্তঃস্থ ছায়ার দিকে
অন্তঃস্থ ছায়ার দিকে : রাজীব দত্ত

পাণ্ডুলিপির কবিতা
আম্মা

আম্মা বাড়ি নেই, দূরে,
রোদনরত বাড়িটির ভেতর
আমি মরে যাচ্ছি তার
ফেলে যাওয়া শ্বাসের ঘ্রাণে

আম্মা বাড়ি নেই, নেই
কান্নার ভারে অবনত বাড়িটি
একা হতে হতে
ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে কসমিক কোলাহলে

ভোরের বৃষ্টি

আর, সহসা উন্মাদ বৃষ্টির গানে মুখরিত হলো
আমাদের অলৌকিক ভোরের বাগান
সহস্র জলজ ফুল ফুটে থাকে পাতায় পাতায়
এই আধফোঁটা আলোহীন বিবশ দিন
আরও নিস্তেজ হয়ে পড়ে
যেন সহজ মেয়েলি গ্রামখানা
ঢেকে গেছে সঘন মেঘের স্তূপে
আর তুমুল বৃষ্টির উচ্ছ্বাস
বয়ে আনছে দূর লেবু বাগানের ঘ্রাণ
আমাদের যত নির্জন কান্না
অবোধ, অকারণে, এইসব
স্মৃতি, বিস্মৃত মুখ, আর জলস্নিগ্ধ মেঠোপথ ঘিরে
ঘূ্র্ণাবর্ত্যের মতো বারবার ফিরে আসে
এমন মাতাল বৃষ্টিচিহ্নিত দিনে
বিপন্ন হৃদয় আর মগজে
হয়তো ঘুমভাঙা জানালার শার্শিতে
কেউ এসে রেখে যায় তার হারানো সুরের গান
আমার মন, দেখো বৃষ্টির ভারে অবনত পাতাগুলো
তোমার মতই দুলছে কেবল
বেঘোর নেশাতুর!

সন্দেশ২৪ [www.sondesh24.com] -এ লেখা পাঠাতে চান? তাহলে আজই লেখা পাঠান ই-মেইলে : [email protected] । আমাদের যেকোনো লেখা নিয়ে আপনার মূল্যবান মন্তব্য জানান। লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করে পাশে থাকুন। ধন্যবাদ জানবেন।