‘আমি বিশ্বাস করি, মৃত্যুতে আমার শেষ হবে না’ : আল মাহমুদ

মীর আব্দুস শুকুর আল মাহমুদ। যদিও সাহিত্য মহলে তিনি শুধুই আল মাহমুদ। তবে এই নামের অন্তরালে শ্বাস নেয় বাঙলা কবিতা। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান মৌলিক এই কবি ১৯৩৬ সালের ১১ই জুলাই প্রবল বর্ষণের এক রাতে ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার মোড়াইল গ্রামের এক ব্যবসায়ী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন কবি আল মাহমুদ। তার পিতার নাম আব্দুর রব মীর এবং মাতার নাম রওশন আরা মীর। আল মাহমুদের নাম বর্তমান জীবিত থাকা কবিদের মধ্যে প্রথমে উচ্চারিত হয়। অথচ কী এক অবহেলা ছেয়ে আছে কবি জীবনকে। মধ্যযুগীয় প্রণয়োপাখ্যান, বৈষ্ণব পদাবলি, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল প্রমুখের সাহিত্য পাঠ করে তিতাস নদীর পাড়েই বেড়ে ওঠা কবির। একুশ বছর বয়স পর্যন্ত এ শহরে এবং কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি থানার অন্তর্গত জগতপুর গ্রামের সাধনা হাইস্কুলে এবং পরে চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড হাইস্কুলে পড়াশোনা করেন। নগর জীবনে এসে বসবসাস মগবাজারে।

সৈয়দা নাদিরা বেগম কবির দাম্পত্যসঙ্গী। কবি আল মাহমুদের পাঁচ ছেলে— মীর মো. আরিফ, মীর মো. তারিক, মীর মো. মনির ও মীর মো. আনিস। আর তিন মেয়ে— আফিয়া মীর, তানিয়া মীর ও জুনিয়া মীর। সব ভাই-বোন ঢাকাতে বসবাস করছেন এবং মগবাজার এলাকাতেই।

কবি আল মাহমুদ


কর্মজীবন

সংবাদপত্রে লেখালেখির সূত্র ধরে কবি ঢাকা আসেন ১৯৫৪ সালে। সমকালীন বাংলা সাপ্তাহিক পত্র/পত্রিকার মধ্যে কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী সম্পাদিত ও নাজমুল হক প্রকাশিত সাপ্তাহিক কাফেলায় লেখালেখি শুরু করেন। তিনি পাশাপাশি দৈনিক মিল্লাত পত্রিকায় প্রুফ রিডার হিসেবে সাংবাদিকতা জগতে পদচারণা শুরু করেন। ১৯৫৫ সাল কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী কাফেলার চাকরি ছেড়ে দিলে তিনি সেখানে সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। কাব্যগ্রন্থ লোক লোকান্তর (১৯৬৩) সর্বপ্রথম তাকে স্বনামধন্য কবিদের সারিতে জায়গা করে দেয়। এরপর কালের কলস (১৯৬৬), সোনালি কাবিন (১৯৬৬), মায়াবী পর্দা দুলে উঠো (১৯৬৯) কাব্যগ্রন্থ গুলো তাকে প্রথম সারির কবি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি গল্প লেখার দিকে মনোযোগী হন। ১৯৭৫ সালে তার প্রথম ছোট গল্পগ্রন্থ পানকৌড়ির রক্ত প্রকাশিত হয়। ১৯৯৩ সালে বের হয় তার প্রথম উপন্যাস কবি ও কোলাহল। আল মাহমুদ সাংবাদিক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পরে তিনি দৈনিক গণকন্ঠ পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। তিনি স্বাধীনতা পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের সময় একবার জেল খাটেন। পরে তিনি শিল্পকলা একাডেমীতে যোগদান করেন এবং পরিচালক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।

আল মাহমুদের সাহিত্যজীবন

শুরুর দিকে আল মাহমুদের কবিতায় প্রাধান্য পেয়েছিল  লোকজ ঐতিহ্য। যদিও চল্লি­শের দশকে কবি আহসান হাবীবের হাতে আধুনিকতায় লোকজ উপাদানের ব্যবহার শুরু হয়েছিল। আল মাহমুদ একে ব্যাপকতা দান করেছেন এবং তা অবশ্যই স্বকীয় ভঙিতে।

১৯৫৪ সাল অর্থাৎ ১৮ বছর বয়স থেকে তার কবিতা প্রকাশ পেতে থাকে। ঢাকা থেকে প্রকাশিত সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত সমকাল পত্রিকা এবং কলকাতার নতুন সাহিত্য, চতুষ্কোণ, ময়ূখ ও কৃত্তিবাস ও বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকায় লেখালেখির সুবাদে ঢাকা-কলকাতার পাঠকদের কাছে তার নাম সুপরিচিত হয়ে ওঠে এবং তাকে নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত হয়।

তিনি আধুনিক বাংলা কবিতার শহরমুখী প্রবণতার মধ্যেই ভাটি বাংলার জনজীবন, গ্রামীণ আবহ, নদীনির্ভর জনপদ, চরাঞ্চলের জীবনপ্রবাহ এবং নরনারীর চিরন্তন প্রেম-বিরহকে তার কবিতায় অবলম্বন করেন। নারী ও প্রেমের বিষয়টি তার কবিতায় ব্যাপকভাবে এসেছে। উদ্দীপনা সৃষ্টিকারী হিসেবে নারীর যৌনতা, আকাঙ্ক্ষা ও ভোগের লালসাকে তিনি শিল্পের অংশ হিসেবেই দেখিয়েছেন।

কাব্যগ্রন্থ লোক লোকান্তর (১৯৬৩) সর্বপ্রথম তাকে স্বনামধন্য কবিদের সারিতে জায়গা করে দেয়। এরপর কালের কলস (১৯৬৬), সোনালি কাবিন (১৯৬৬), মায়াবী পর্দা দুলে উঠো (১৯৬৯) কাব্যগ্রন্থগুলো তাকে প্রথম সারির কবি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। ১৯৯৩ সালে বের হয় তার প্রথম উপন্যাস কবি ও কোলাহল। ১৯৬৮ সালে ‘লোক লোকান্তর’ ও ‘কালের কলস’ নামে দুটি কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। তার সবচেয়ে সাড়া জাগানো সাহিত্যকর্ম সোনালি কাবিন।

আল মাহমুদের কবিতা প্রসঙ্গে

‘পঞ্চাশের দশকে আবির্ভূত কবি আল মাহমুদ আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান পুরুষ। বোদলেয়ারীয় আধুনিকতায় জারিত আমাদের প্রায় সব কবির রচনায় যখন সকালের বন্ধ্যাত্ব, নৈরাশ্যবাদিতা, পাশ্চাত্যের অনুকরণে মেকি নগর-যন্ত্রণা এবং এক সর্বগ্রাসী বিনষ্টি ও বিমানবিকীকরণের আগ্রাসন ঘটেছিল, তখন আল মাহমুদ তাঁর প্রবেশলগ্নের দেশজতা, মানবিকতা, সাম্যবাদ ও এতে লগ্ন থাকার আকুতি দিয়েই আকৃষ্ট করেছিলেন পাঠককে। কিন্তু এসবের পরিণতিপ্রাপ্তির আগেই তিনি ‘মানবিক নির্মাণের প্রতি’ আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন বলে ঘোষণা দিয়ে কিছু ‘ইসলামি’ কবিতা লেখার প্রয়াস পান, যা কাব্যরসিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এর কারণ এই নয় যে, এগুলোর বিষয়বস্তু ইসলাম ধর্ম এবং আল্লাহ-রাসূলের সততা। এর মূল কারণ তাঁর প্রবেশলগ্নের কবিতার শিল্প-সফলতা এগুলোতে প্রতিফলিত হয়নি। শেষোক্ত কবিতাগুলো তাঁর মধ্যবয়স থেকে শুরু করে শেষ-বয়সে লেখা এবং সম্ভবত বয়স বাড়ার কারণেই কবিত্বশক্তিও হ্রাস পেয়েছে, যেমনটি ঘটে থাকে প্রায় সব কবির ক্ষেত্রেই। অবশ্য প্রবেশলগ্ন থেকেই আল মাহমুদের অনেক ভালো কবিতাও নির্মাণকলার বিবেচনায় নানারূপ স্খলন-পতনের শিকার হয়েছে। এসব সীমাবদ্ধতা নিয়েও তিনি জনপ্রিয় হয়েছেন তাঁর কবিতার প্রসাদগুণের কারণে। সব ছন্দেই তিনি পারদর্শী হলেও বিশেষত পয়ারনির্ভর তাঁর কবিতা পাঠককে মুগ্ধ করে সহজ-সচ্ছল ডিকশনের (উচ্চারণের) কারণে। কিন্তু অত্যন্ত বড়মাপের কবি হয়েও ছন্দ ও মিল রক্ষার্থে স্বভাবকবিদের মতো তিনি অনেক স্থানে অর্থবিপত্তি তৈরি করেছেন।’

আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদ

আল মাহমুদের কবিতায় নারী প্রসঙ্গ

আল মাহমুদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো প্রেম ও নারী। তবে নারী ও সৌন্দর্যকে তিনি আলাদা করে দেখতে চান। এক নারী একজনের কাছে সুন্দর, অন্যের কাছে তা না-ও হতে পারে। তাই আল মাহমুদ নারীকে সৌন্দর্য না বলে আকর্ষণীয় বলতে চান। তার মানে নারী আকর্ষণ করে, তার মধ্যে আকর্ষণ করার শক্তি আছে। সেই আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু বলেই নারী ও প্রেমের বিষয়টি তার কবিতায় এত ব্যাপকভাবে এসেছে। উদ্দীপনা সৃষ্টিকারী হিসেবে নারীর যৌনতা, আকাঙ্ক্ষা ও ভোগের লালসাকে তিনি আর্টের অংশ হিসেবেই দেখতে চান।

কবি তার ‘সোনালী কাবিন’ কাব্যগ্রন্থের শিরোনাম কবিতায় লিখেছেন— ‘বিবসন হও যদি দেখতে পাবে আমাকে সরল/ পৌরুষ আবৃত করে জলপাইর পাতাও থাকবে না/ তুমি যদি খাও তবে আমাকে দিও সেই ফল/ জ্ঞানে ও অজ্ঞানে দোঁহে পরস্পর হবো চিরচেনা/ পরাজিত নই নারী, পরাজিত হয় না কবিরা/ দারুণ আহত বটে আর্ত আজ শিরা-উপশিরা।’

আবার তিনি লিখেছেন—‘আমার চুম্বন রাশি ক্রমাগত তোমার গতরে/ ঢেলে দেবো চিরদিন মুক্ত করে লজ্জার আগল/ এর ব্যতিক্রমে বানু এ-মস্তকে নামুক লানৎ/ ভাষার শপথ আর প্রেমময় কাব্যের শপথ।’

`লোক লোকান্তর`-এর `সিম্ফনি` কবিতায় শুধু নারীর শরীরকে আরাধ্য করেননি কবি, কবিতার চরণসজ্জায় আবরণহীন শব্দের আভরণ স্থান করে নিয়েছে। কবি লিখেছেন- `শঙ্খমাজা স্তন দুটি মনে হবে শ্বেতপদ্ম কলি/লজ্জায় বিবর্ণ মন ঢেকে যাবে ক্রিসেনথিমামে`। `নূহের প্রার্থনা` কবিতায়ও নারী-পুরুষ সম্পর্কই মুখ্য স্থান গ্রহণ করেছে। লিখেছেন ‌`আবার করবো পান বুকের এ উৎস ধারা হতে/জারিত অমৃত রস/এতোদিন যৌবনের নামে/যা ছিল সঞ্চিত এই সঞ্চারিত শরীরের কোষে/হে নূহ সন্তান দেবো, আপনাকে পুত্র দেবো`। `শোকের লোবান` কবিতা নিবেদিত নারীর দাবি পূরণের গল্প-ভালোবাসার কথা তুলে ধরেছেন। লিখেছেন `তামসিক কামকলা শিখে এলে/যেন এক অক্ষয় যুবতী/তখন কবিতা লেখা হতে পারে একটি কেবল/যেন রমণে কম্পিতা কোনো কুমারীর/নিম্ননাভিমূল`। `কালের কলস` গ্রন্থের `শূন্য হাওয়া` কবিতায় কামবিন্দুকে ঘিরে নারী-পুরুষের ব্যক্তিগত পর্যায়ের সম্পর্কের চরণবৃত্ত গড়ে উঠেছে- `ঘুমের ছল কামের জল/এখনো নাভিমূলে/মোছেনি তবু আবার এলো/আগের শয্যায়।`

রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে আল মাহমুদ

আল মাহমুদের ভাষ্যমতে তার প্রিয় লেখক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। যদিও ঠাকুরের এই জমিদারি বাঙলা সাহিত্যে নতুন কিছু নয়। রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে আল মাহমুদ বলেন, রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আমার কয়েকটি লেখা আছে। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের স্রষ্টা যদি রবীন্দ্রনাথকে বলা হয় তাহলে হয়তো বাড়িয়ে বলা হবে না। আমি তাকে অনেক বড় কবি মনে করি। ছন্দ, মিল, উপমা ও উৎপ্রেক্ষা তার কবিতায় যেমন আছে, অন্য আর কোন কবির কবিতাতে তেমনটি নেই। ইংরেজি ভাষায় আমরা যা পাই একাই বাংলা ভাষায় তা করে গেছেন। বাংলা ও বাঙালিদের জন্য রবীন্দ্রনাথ অপরিহার্য। রবীন্দ্রনাথ ব্রাহ্ম, আমি মুসলমান- এতে রবীন্দ্রনাথ পড়তে এবং তাকে ভালোবাসতে আমার কোন অসুবিধা হয়নি। রবীন্দ্র সাহিত্যে একাত্মবাদের অস্তিত্ব রয়েছে বিশাল অংশজুড়ে- এটা আমার কাছে বিরাট ব্যাপার মনে হয়। রবীন্দ্র রচনার ব্যক্তি এবং সৌন্দর্যবোধ আমাকে মুগ্ধ ও বিস্মিত করে। কেউ প্রশ্ন তোলেন রবীন্দ্র সাহিত্যে মুসলিম চরিত্র নেই কেন? এটা তিনি স্বীকার করেছেন যে, মুসলমানদের সম্পর্কে তিনি জানতেন না। বলেছেন- ‘মাঝে মাঝে গেছি আমি ও পাড়ার প্রাঙ্গণের ধারে,/ভিতরে প্রবেশ করি সে শক্তি ছিল না একেবারে।’এই দুর্বলতা কবি নিজে স্বীকার করে গেছেন। আর সাহিত্য তো ধর্ম-গোত্রের ধার ধারে না। রবীন্দ্রনাথ সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠতে পেরেছিলেন।রবীন্দ্রনাথের গানও আমার খুবই প্রিয়।

আমরা রবীন্দ্রনাথ পড়বো এবং প্রয়োজনে তার সমালোচনা করারও স্বাধীনতা আমাদের রয়েছে, আমরা তা করতেই পারি। রবীন্দ্রনাথের পাশাপাশি নজরুলের কথাও বলতে হয়। রবীন্দ্র যুগে নজরুলের আগমন আমাদের সাহিত্যের জন্য বিরাট ব্যাপার। নজরুল কোন সাধারণ কবি নন, অসাধারণ কবি। তার গানের জগৎ বৈচিত্রে পরিপূর্ণ। চার হাজার গান নিজে লিখে সুর করে গেছেন- এটা তো একটা ঐশ্বরিক ব্যাপার।

রাজনৈতিক আল মাহমুদ

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আগে এবং পরে আল মাহমুদের মতাদর্শে ব্যাপক পরিবর্তন হয়। আল মাহমুদের কবিতায় মুক্তিযুদ্ধের আগে বাম ধারা দেখা গেলেও ১৯৭৪ সালের পর থেকে তাঁর কবিতায় ইসলামী ভাবধারাও লক্ষ্য করা যায়।

১৯৭২ সালে আল মাহমুদ তৎকালীন গণকন্ঠ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। যে পত্রিকাটির মালিকানা ছিল জাসদের এবং সেটি সরকার বিরোধী হিসেবে পরিচিত ছিল।

আল মাহমুদের সম্পাদনায় তখন গণকন্ঠ পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেছেন গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদ। তিনি মনে করেন, আল মাহমুদ গণকন্ঠের সম্পাদক থাকলেও তার দলীয় কোন পরিচয় ছিলনা। রাজনৈতিক দল জাসদের প্রতি সহানুভূতি থাকলেও আল মাহমুদ কখনো সরাসরি রাজনীতিতে জড়াননি।

১৯৭২ সালে আল মাহমুদ তৎকালীন গণকন্ঠ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন।

১৯৭৪ সালের ১৭ই মার্চ তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ির সামনে জাসদের উদ্যোগে ঘেরাও কর্মসূচীর ডাক দেয়া হয়। সেদিন রাতেই তৎকালীন গণকন্ঠের সম্পাদক আল মাহমুদকে গ্রেফতার করা হয়।

এ প্রসঙ্গে মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘জাসদ গণকন্ঠের মালিক ছিল বলে আল মাহমুদ ভিকটিম হলেন। এবং তিনি অনেকদিন বিনা বিচারে কারাগারে ছিলেন।’ মহিউদ্দিন আহমেদের বর্ণনায় জেল থেকে মুক্তি পাবার পর ‘অন্যরকম এক আল মাহমুদের’ দেখা মিলল। তখন আল মাহমুদের মধ্যে ইসলামী ধ্যান-ধারণা প্রবল হয়ে উঠে বলে উল্লেখ করেন মহিউদ্দিন আহমেদ।

আল মাহমুদ কবি হলেও তিনি নিজেকে রাজনৈতিক দর্শন থেকে দূরে রাখেননি। এনিয়ে তর্ক-বিতর্ক যাই থাকুক না কেন, কবি আসাদ চৌধুরী আল মাহমুদকে বিচার করেন তাঁর লেখা এবং শিল্পের বিচারে।

শুরুর দিকে বামপন্থী চিন্তাধারার হলেও, সেখান থেকে সরে এসে আল মাহমুদ কেন ইসলামী ভাবধারার দিকে ঝুঁকলেন? ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিবিসি বাংলার সাথে এক সাক্ষাৎকারে তিনি সে ব্যাখ্যাও দিয়েছেন।

আল মাহমুদ বলেছিলেন তিনি কখনো মার্কসবাদী ছিলেন না বরং তাঁর চরিত্রে এক ধরনের দোদুল্যমানতা ছিল। তার ভাষ্যে ‘আমি যে পরিবারে জন্মেছি তারা সবাই ছিল খুবই ধর্মপ্রবণ লোক। কিভাবে যেন তাদের মধ্যেই যে রয়েছে সত্যিকারের পথের ঠিকানা এটা আমাকে দূর থেকে ইশারায় ডাকতো’

আসাদ চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর অনেক মুক্তিযোদ্ধার মতো তাঁরও ক্ষোভ বেশি ছিল। এবং ক্ষোভের প্রকাশটা রাজনৈতিক আচরণের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। যেটা অনেকে পছন্দ করেননি। কিন্তু শিল্পীকে বিচার করতে হয় শিল্পের মাপকাঠিতে। আল মাহমুদকে বিচার করতে হবে তাঁর কবিতা দিয়ে।’

কবি হলেও আল মাহমুদ বিভিন্ন সময় সংবাদপত্রে কাজ করেছেন। কিন্তু বরাবরই তিনি প্রাধান্য দিয়েছেন তাঁর কবিতাকে। লোক-লোকান্তর, কালের কলস, সোনালী কাবিন – একের পর এক কাব্যগ্রন্থ লিখেছেন তিনি।

মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আল মাহমুদ সবসময় দাবী করতেন তিনি একজন কবি। তিনি কখনোই বলেননি যে তিনি একজন সম্পাদক’।

মি: আহমেদ বলেন, আল মাহমুদ সব সময় চাইতেন তাকে তাঁর কবিতা দিয়েই মূল্যায়ন করা হোক। একবার মাহমুদ ভাই একটা কথা বলেছিলেন , যেটা এখনো আমার কানে ভাসে। সেটা হলো যে – আর কেউ কি আরেকটি সোনালী কাবিন লিখতে পেরেছে?

পুরষ্কার

আল মাহমুদ একাধারে একজন কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, ছোটগল্প লেখক, শিশুসাহিত্যিক এবং সাংবাদিক। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতার শহরমুখী প্রবণতার মধ্যেই ভাটি বাংলার জনজীবন, গ্রামীণ আবহ, নদীনির্ভর জনপদ, চরাঞ্চলের জীবনপ্রবাহ এবং নরনারীর চিরন্তন প্রেম-বিরহকে কবিতায় অবলম্বন করেন।

কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ৮২ বছরের জীবন দশায় কবি আল মাহমুদ পেয়েছেন বেশ কিছু পুরস্কার ও সম্মাননা। চলুন দেখে নেওয়া যাক সেগুলো।

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৮), জয় বাংলা পুরস্কার (১৯৭২), হুমায়ুন কবীর স্মৃতি পুরস্কার (১৯৭২), জীবনানন্দ স্মৃতি পুরস্কার (১৯৭২), কাজী মোতাহার হোসেন সাহিত্য পুরস্কার (১৯৭৬), কবি জসীম উদ্দিন পুরস্কার, ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৬), একুশে পদক (১৯৮৭), নাসির উদ্দিন স্বর্ণপদক (১৯৯০), ভানুসিংহ সম্মাননা পদক (২০০৪), লালন পুরস্কার (২০১১)।

ন ফেব্রুয়ারি অসুস্থ হয়ে পড়েন কবি

মৃত্যু

১৫ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার রাত ১১টা ৫ মিনিটে রাজধানীর ইবনে সিনা হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।  এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন আল মাহমুদের ব্যক্তিগত সহকারী কবি আবিদ আজম। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। তিনি নিউমোনিয়াসহ বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন।

এর আগে গত ৯ ফেব্রুয়ারি রাতে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় কবিকে ধানমন্ডির ইবনে সিনা হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। ওই দিন ইবনে সিনা হাসপাতালে তাঁকে প্রথমে সিসিইউতে ও পরে আইসিইউতে নেওয়া হয়। শুক্রবার রাতে তাকে ‘লাইফ সাপোর্ট’ দেওয়া হয়।

আল মাহমুদকে ঘিরে কিছু গুজব

মাঝে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে, শেষ জীবনে সন্তানেরা তাকে গ্রামের বাড়িতে একা রেখেছেন, অযত্ন আর অবহেলায়। বিনা চিকিৎসায় দিন কাটছে তার। পরবর্তীতে জানা যায় বড় ছেলের বাসায় আছেন কবি। শয্যাশায়ী কবিকে ঘিরে সেবাযত্নে ব্যস্ত ছেলে, ছেলের বউ ও নাতিরা। এ প্রসঙ্গে কবির বড় ছেলে মীর শরীফ মাহমুদ বলেন, ‘এসব কথা মোটেই সত্য নয়। যারা বলছেন, তারা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়েই সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়াচ্ছেন। কবি এবং কবির পরিবারকে সামাজিকভাবে হেয় করতেই এসব করা হচ্ছে।’

আল মাহমুদকে ঘিরে গুজব

একবার কবি আল মাহমুদের একটি ছবি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে মিথ্যা প্রচারণা চালান হয়। ছবিতে কবি আল মাহমুদ এবং এক তরুণীকে মালা পরিহিত অবস্থায় দেখা যায়। ফেসবুকে ছবিটি শেয়ার দিয়ে অনেকেই অনেক ধরণের মন্তব্য করতে থাকেন। বৃদ্ধ বয়সে আল মাহমুদ বিয়ে করেছেন বলেও প্রচারণা চালানো হয়। আল মাহমুদের পুত্রবধু শামিমা আক্তার বকুল বলেন, ‘হঠাৎ ছড়িয়ে পড়ল, বরিশালের একটি মেয়েকে নাকি আব্বা বিয়ে করেছেন! সে সময়ে আমরা এর নিন্দা জানিয়েছিলাম। এরপর এসব আমরা আর আমলে নেই না। খুব বেশি বাড়াবাড়ি হলে জবাব দেয়ার চেষ্টা করি।’।এই ছবি প্রসঙ্গে আল মাহমুদের ব্যক্তিগত সহকারী আবিদ আজম জানান, ছবিটি গত বছরের একটি সামাজিক অনুষ্ঠানের ছবি। ওই অনুষ্ঠানে আল-মাহমুদের সাথে ওই মেয়েটিকেও সম্মানিত করা হয়। উল্লেখ্য, ছবিতে যে তরুণীকে দেখা গেছে তিনি নিজেও লেখালেখি করেন। বর্তমানে একটি জাতীয় দৈনিকের লাইফ স্টাইলে বিভাগে নিয়মিত লিখছেন। তিনি বাংলা একাডেমির তরুণ লেখক প্রকল্পেও অংশ নিয়েছেন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে বেশ কয়েকবার কবির মৃত্যুকে ঘিরে গুজব ছড়ানো হয়। এর মধ্যে ২০১৮ সালের ২২ অক্টোবর কবির বড় ভাই মীর মো: ফরহাদ হোসেন (৭০) মারা গেলে কবি অনেকটা ভেঙে পড়েন। এমনিতে তিনি বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগেছেন অনেকদিন ধরে। সে সময় ফেসবুকে প্রচার করা হয় আল মাহমুদ মারা গেছেন। তার পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বার্ধক্যজনিত কারণে হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন তিনি। বাসায় চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাকে নিয়ে আশংকার কিছু নেই।