কবিতার দরোজা পাঠকের জন্য সর্বদা খোলা, পথ চিনে যে প্রবেশ করবে সে কামিয়াব হবে–ফরহাদ নাইয়া

কবি ফরহাদ নাইয়ার প্রথম কাব্যগ্রন্থ মাছেরা শহরে আসায় মানুষেরা নদীর ভাব ধরল প্রকাশ পেল এবারের একুশে বইমেলায়সন্দেশকে এ বই নিয়ে জানাচ্ছেন তিনি নিজেই সেইসঙ্গে তাঁর কাব্যভাবনাও। পাঠকদের জন্য দেওয়া হল পাণ্ডুলিপি থেকে দুইটি কবিতাও। ফরহাদ নাইয়ার সঙ্গে কথা বলেছেন–রাফসান গালিব।

কতদিন ধরে লিখছেন? কখন এসে মনে হল এবার বই বের করা যায়?

মাধ্যমিকে ভর্তির সময় কবিতা লিখন প্রতিযোগিতা হৈছিলো তো কেমনে কেমনে যেন একটা লিখে ফেললাম, লিখে থার্ড হলাম। জীবনে এই প্রথম কোন পুরস্কার পেলাম। তখন থেকেই শুরু আরকি। একটা রবীন্দ্রনাথের মতো তো আরেকটা নজরুল, জসীমউদ্দীন কিংবা ফররুখের মতো লিখে ফেলতিছি। পাঠ্য কবিতা ছাড়া তেমন কোন পাঠও নাই। এই অবস্থার ভেতর দিয়ে যাইতে থাকলাম দীর্ঘদিন, যাইতে যাইতে পঠন-পাঠন বাড়তে থাকলো, লেখাও বদলাইতে থাকলো। গতবছর থেকেই ভাবছিলাম একটা বই বের করব। কারণ এই দীর্ঘ জার্নির ভেতর দিয়ে আমি আমার কবিতার ভাষা খুঁজে পেয়েছি বলে আমার মনে হচ্ছে।দীর্ঘদিন ধরে লিখলেও কবিতাগুলো ২০১৬ থেকে ১৮ এর মধ্য লেখা।

মাছেরা শহরে আসায় মানুষেরা নদীর ভাব ধরলএই নাম কেন?

আসলে আমি বেনামে বের করতে চাইছিলাম বইটা। ভাইব্রেদার কইলো নাম ছাড়া তারে চেনা যাবে না । গ্রন্থটি আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ভূগবে। তাই একটা নাম দেয়া। তবে আমার কাছে কবিতাগুলো মাছের মতোই এবং পাঠক যেখানে একটা ঝুড়ির ভেতরে করে মাছগুলোরে নিয়ে যাচ্ছে আমিষের স্বাদ পাবার জন্য।

কবিতা লেখার ব্যঞ্জনা কিভাবে তৈরি হয় আপনার মধ্যে?

আমার কাছে লেখার ব্যঞ্জনা চিন্তার বিশৃংখলার ভেতর দিয়ে তৈরি হয় এবং টেক্সটের সামঞ্জস্যপূর্ণ উপস্থাপন আমাকে পুলকিত করে সর্বদা।

সাম্প্রতিক সময়ের কবিতাকে কিভাবে বিচার করবেন?

প্রথমত সাম্প্রতিক সময়ের কবিতা নিয়ে এই মুহূর্তে কিছু বলা মুশকিল। এই বিচার যুগ এবং কালের কাছে। তবে বেশির ভাগ কবিতাই ন্যারেটিভ না গল্প না কবিতা। দুর্বোধ্যতায় ঠাসা, পাঠে আনন্দ পাওয়া যায় না। আরেক ধরনের তুলতুলে কবিতা দেখা যায় যা আলগা গিতলতা খানিক ভাবুলতায় গলে পড়ছে বলে মনে হবে। এর বাইরে অনেকর লেখাই আমার ভালোলাগে মজনু শাহ, নাভিল মানদার, মহিম সন্যাসী, হাসান রোবায়েত, আরণ্যক টিটো, গ্যাব্রিয়েল সুমন উল্লেখযোগ্য। দ্রাবিড় সৈকতের কুত্রাপি বাংলা কবিতার নতুন সংযোজন বলে মনে হয়।

মাছেরা শহরে আসায় মানুষেরা নদীর ভাব ধরল
কবিতার দরোজা পাঠকের জন্য সর্বদা খোলা, পথ চিনে যে প্রবেশ করবে সে কামিয়াব হবে–ফরহাদ নাইয়া

একবিংশ শতাব্দীর পরিবর্তিত সময়ে এসে কবিতার নতুন কোন ভাষা তৈরি হয়েছে কিনা?

কবিতা মূলত ভাষাকে সমৃদ্ধ করে। ভাষাকে বিবিধ অলংকারে ঝলমলে করে গড়ে তোলে। বিভিন্ন ব্যঞ্জনার ভেতর সেসব কবিতাকেই কালোত্তীর্ণ হতে দেখেছি যেগুলো ভাষা, বিন্যাস, প্রকরণে নতুনত্ব নিয়ে হাজির হয়েছিলো। একবিংশ শতাব্দীর কবিতায় একটি নতুন ভাসার আভাস দেখা যায় তবে সেটি খুব ক্ষীণ, কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তা এখুনি বলা মুশকিল। এখনকার কবিদের ভাষা মোটা দাগে ইমেজ এবং ইমাজিনারি নির্ভর। কেউ কেউ অবশ্য ন্যারেটিভ ফর্মে লেখে। তবে চিত্র আর কল্পনার সাথে ভারতীয় গীতিময়তা বাংলা কবিতাকে একটি মহৎ যায়গায় নিয়ে গেছে বলে আমার মনে হয়।

কবিতা বিষয়টাই তারুণ্যনির্ভর–কি মনে হয় আপনার?

তারুন্যনির্ভর তো বটেই তবে তারুণ্যকে আপনি কিভাবে সঙ্গায়িত করছেন সেটির উপর নির্ভর করবে। আমার মনে হয় একজন কবি তার মহৎ কবিতাগুলো ৩৫ এর মধ্যেই লিখে ফেলে। এরপর মূলত বিগত লেখার ককটেল বানিয়ে নতুন লেখা তৈরির পায়তারা করে বেশিরভাগ। কবিতা তো ব্যক্তির যাপনের বাইরে নয়। ফলে নিজেকে ক্রমাগত উত্তরণের ভেতর দিয়ে ৮০ বছর বয়সেও তারুণ্যের চিরায়ত কবিতা লেখা যায়।

কবিরাই কবিতা পাঠক–এ-ধরনের কথা আমরা জানি সাধারণ পাঠকের কাছে কবিদের দূরত্বটা কোথায়?

কবিরাই কবিতার পাঠক কথাটা একেবারে অমূলক নয়, এর কারণ বহুবিধ। দূরত্বটা হলো ‘ভাষা’র পাঠক কবিতার সাথে নিজেকে রিলেট করতে পারছে না। এখানে তার সংকট, টানা-পোড়েনের কথা নেই। ভারতীয় কবিতার জনরা  বা প্রকরণ মূলত   ‘গীতিময়তা’ প্রধান যেমন রামায়ন কিংবা মহভারত থেকে শুরু করে আমাদের চর্যা, মধ্যযুগের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন  কিন্তু গাওয়া হতো। ফলে ঐ সময়ের কবিতা খুব বেশি কানেকটিভ ছিলো সাধারন মানুষের কাছে। যা এখন নেই। উত্তরআধুনিক সময়ে কবিতা বিষয়, ভাবে, প্রকরণে এতো বেশি বৈচিত্রময় যে সাধারন পাঠক পাজলড হয়ে যাচ্ছে, ধরতে পারছে না।

এমন একটি সাক্ষাৎকার : ‘সমসাময়িক কবিদের মধ্যে দু’একজনই থাকেন সম্ভাবনাময়, বাকিসব হাবুডুবু খায়’ : নৈরিৎ ইমু

কার কার কবিতা সবসময়ই ভাল লাগেসমসাময়িক কোন কোন কবিকে সম্ভাবনাময়ী মনে হয়?

মহিম সন্যাসী, সামতান রহমান, নাভিল মানদার, হাসান রোবায়েত এদের কবিতা ভালো লাগে। তবে সবসময়ই ভালোলাগে এমন নয়। বন্ধু আদিত্য আনাম এবং সারোক সিকদারের কবিতাও আমার ভালো লাগে। ওরা খুবই সম্ভাবনাময়। নিসাত তাসনিম, রুম্মানা জান্নাত’ র কবিতাও আমার ভালো লাগে ।

মাছেরা শহরে আসায় মানুষেরা নদীর ভাব ধরলকেন কিনবে বা পড়বে পাঠক?

পাঠকের কেনা বা পড়া জরুরি না। পাঠকের কেনা-না-কেনা দিয়ে আমি কিছু বিচার করতে পছন্দ করি না। সবার ভালো লাগবে এমন কিছু লিখিনিও আসলে। আমি কিছু বলতে চাইছি, সেটি আপনার অন্তর ছুয়ে যাবে এমনটি নয় তবে প্রতিটি কবিতা আমার কাছে একএকটি ঘরের মতো যেখানে প্রবেশ করে আমি শান্তি পাই, পুলক অনুভব করি। এবং এই ঘরের দরোজা পাঠকের জন্য সদা সর্বদা খোলা সে পথ চিনে প্রবেশ করতে পারলে কামিয়াব হবে। তবে পথ চেনার যোগ্যতা নিশ্চয়ই থাকতে হবে।

কারা কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশ করেছে? প্রচ্ছদ কার করা? মেলায় কোথায় পাওয়া যাচ্ছে?    

প্রকাশিত হয়েছে ‘মেঘ’ থেকে। দাম রাখা হয়েছে ১৮০ টাকা। প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ করেছেন আল নোমান। গ্রন্থমেলায় ‘মেঘ’–এর ২৭৩ নম্বর স্টলে পাওয়া যাচ্ছে বইটি।

মাছেরা শহরে আসায় মানুষেরা নদীর ভাব ধরল
প্রচ্ছদ : আল নোমান

পাণ্ডুলিপির কবিতা

বেদনা
*
আমার চোখদুটি উপড়ে ফেলা হয়েছে
এই বেদনায় আমি আর কাদতেও পারব না।

ভালোবাসা
*
মনটারে ডুমুর খেতে ফেলে
ফুলের আশায় বসে থাকি রোজ।

শীতকাল
*
চেরাগ প্রাপ্তির পর উড়বার ইচ্ছা পোষণ করলে
ঈশ্বর আমাকে পাতা বানিয়ে রাখলো।

শহর
*
এই হাইতোলা প্যারাবোলা শহর
মানুষের ভীড়ে আমি পা ডুবিয়ে বসে থাকি
আদতে এ শহর ডুবে গেছে মাছের কান্নায়
পালিত রাজহাস সাতার শিখেনি তবু।

নাম
*
গতকাল থেকে নাম ভুলে গেছি
পৃথিবীর সমূদয় শব্দের তাড়া খেয়ে
গড়িয়ে পড়েছি আমি…
নামহীন
একখণ্ড আকুতি পাথর।

সন্দেশ২৪ (www.sondesh24.com) আপনাদের পত্রিকা। আপনার যেকোনো লেখা পাঠিয়ে দিন আমাদের ঠিকানায়। ই-মেইল : [email protected] । আর হ্যাঁ, Like, Comment, Share করতে ভুলবেন না। ধন্যবাদ জানবেন।