‘ছায়াপথ’-এর আলো-ছায়ায় পরিভ্রমণ

 

প্রত্যেকটা মানুষই যেন একেকটা ছায়াপথ। তাকে কেন্দ্র করে ঘূর্ণায়মানরত থাকে অসংখ্য মানুষ। সেই মানুষগুলোও আবার আলাদা আলাদাভাবে অন্য কারো জীবনের ছায়াপথ। মানবজীবনের এই গভীরতম বোধটি উপলব্ধি করা যায় “ছায়াপথ” উপন্যাসের কাহিনীপটে।

 

কাহিনী সংক্ষেপ

উপন্যাসের নায়ক মুহিত। উড়নচণ্ডি, খ্যাপাটে, পড়ালেখায় অমনোযোগী, একরোখা। পরিবারের সকলে তাকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকে। আবার এই ছেলেটিই পরিবারের, নিজের পাড়ার, অন্যপাড়ার, পুরো গ্রামের সব মানুষের চোখের মনি। পরোপকারের ব্রত নিয়েই যেন তার জন্ম হয়েছে। যেখানে তার বাবা-চাচা-ভাই সবাই নিজের জায়গাজমি, বিষয়-সম্পত্তি নিয়ে খুব হিসেবী, সেখানে মুহিত নিজের সবকিছু অন্যের কল্যাণে বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত। ঘরে তাকে পাওয়ায় যায় না। সারাদিন টৈ টৈ করে ঘুরে বেড়ায় আর গ্রামের মানুষদের উপকার করে। এ ব্যাপারে যদি তাকে কিছু জিজ্ঞেস করা হয় তখন সে উত্তর দেয়, “আমি না থাকলে তো বাড়ির কোন কাজ পইরা থাকবো না। বাড়ির কাজ করনের লাইগা ম্যালা মানুষ আছে। কিন্তু গরীব মানুষগুলানের কেডা আছে? তাগো দিকে তাকানোর সময় ত কারোরই নাই।”

পরোপকারে যার এমন অদ্ভুত যুক্তি সে তো সকলের প্রিয় হবেই। কিন্তু সারাক্ষণ মানুষের কল্যাণের চিন্তায় মগ্ন থাকা মুহিত ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি, কী ভয়ংকর শত্রু সে সৃষ্টি করেছে নিজেরই অগোচরে। কে সেই শত্রু? মুহিত কি পেরেছে শত্রুকে জয় করতে? নাকি সে নিজেই হেরে গেছে? বিলীন হয়ে গেছে তার কক্ষপথ থেকে?

উপন্যাসের নায়িকা শাঁওলী। রাজকন্যার মতো রূপ নিয়ে জন্মেছে, কিন্তু রাজকন্যার কপাল জুটেনি তার। দৈন্যদশার মাঝে বড় হওয়া শাঁওলী অসম্ভব গুণবতীও। তাকে পাওয়ার জন্য উন্মুখ হয়েছিল কত শত যুবক। কিন্তু সে মন দিয়েছিল মুহিতকে, যে অন্য সব পুরুষ থেকে ভিন্ন। শাঁওলী কি পেরেছিল মুহিতকে ভালোবাসার বন্ধনে বাঁধতে? নাকি দুজনের দুটি পথ দুদিকে গেছে চলে?

শাহিদা বানু জমিদার দৌহিত্রী। মন্ডল পরিবারে বৌ হয়ে এসে মানিয়ে নিতে নিতেই কাটিয়ে দিল অনেকটা সময়। মনের দরজা খুলে অন্দরমহলে প্রবেশ করতে দেয়নি অন্য জা’দের, নিজেও তাদের অন্তরে জায়গা করতে পারেনি। অথচ তিনি এক সমূদ্র মানবিকতা ধারণ করে আছেন নিজের মধ্যে। যৌথ পরিবারকে দক্ষতার সাথে একত্র করে রাখতে পেরেছেন মন্ডল পরিবারের প্রধান হাফিজ মন্ডল। কিন্তু তিনিও জানতেন না, পাঁচ আঙ্গুল এক থাকে যতক্ষণ মুঠো ধরে রাখতে পারে ততক্ষণ। মুঠো ছেড়ে দিলেই আবার সব একে অন্য থেকে আলাদা হয়ে যায়।

মন্ডল পরিবারের সুখ-দুঃখ, পরিবারের মানুষগুলোর পারস্পরিক আন্তরিকতা, সম্পর্কের টানাপোড়েন, অপ্রকাশিত প্রেম সব নিয়েই উপন্যাসটি। যদিও এটা উপন্যাস, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের “শেষ হইয়াও হইলো না শেষ” এর মতো অনুভূতি হবে পাঠকের। কারণ, উপন্যাসের পরিসমাপ্তিতেও মুহিতের গল্প বাকি থেকে যায়।

ফাহমিদা বারীর উপন্যাস ‘ছায়াপথ’

 

পাঠ-প্রতিক্রিয়া

আধুনিকায়নের এ যুগে যৌথ পরিবারের দেখা সহজে মেলে না। যে কয়টা দেখা যায় সেখানেও যেন অলক্ষ্যে বাজতে থাকে ভাঙনের সুর। এ অবস্থায় “ছায়াপথ” এর মন্ডল পরিবারটি একটি আদর্শ যৌথ পরিবারের চিত্র তুলে ধরেছে চোখের সামনে। পাঁচ ভাই তাদের পরিবারসহ এক সাথে থাকে, একই রান্নাঘরে রান্না করে, একসাথে সকলে খাওয়াদাওয়া করে। তাদের এই একসাথে থাকার জন্য বড় ভাই হাফিজ মন্ডল ও তার স্ত্রী মাজেদা খাতুনের অবদান সবচে বেশি। পারিবারিক কলহ দূর করার জন্য হাফিজ মন্ডলের নেয়া পদক্ষেপগুলো যেমন শিক্ষণীয়, তেমনি মাজেদা খাতুনের ধৈর্য্যশীলতা থেকেও অনেক কিছু শেখা যায়।

মুহিতের চরিত্রটিকে ঔপন্যাসিক যেভাবে চিত্রায়ণ করেছেন তাতে যেকোন পাঠকেরই মুহিতের প্রতি ভালো লাগা কাজ করবে। ঔপন্যাসিক আদতে মুহিতকেই ছায়াপথের সাথে তুলনা করেছেন। তার অনন্য ব্যক্তিত্বে সকলে মুগ্ধ হয়ে তার চারপাশে ঘুরতে থাকে, যেমন ছায়াপথকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকে অসংখ্য নক্ষত্র।

গ্রাম্য প্রকৃতির অসাধারণ চিত্র এঁকেছেন ঔপন্যাসিক। যারা গ্রামে থাকেন বা ছিলেন তারা নস্টালজিক হয়ে যাবেন, আর যারা কখনও গ্রামে যাননি তারাও লেখকের বর্ণনার সাহায্য নিয়ে কল্পনায় মনোরম গ্রামের ছবি দেখতে পাবেন। রইসের ছিপ দিয়ে মাছ ধরা, ফুলের গন্ধ নিতে গিয়ে মুহিতের বোলতার কামড় খাওয়া, বাড়ির আঙ্গিনায় সখের ফুল গাছ সব চমৎকারভাবে উঠে এসেছে।

“জীবন অনেক ছোট অথচ কত কাজ আছে করার! আজগুবি মনোমালিন্য আর দাঙ্গা ফ্যাসাদ নিয়ে পরে থাকলে তাদের লক্ষ্যটাই হয়তো একসময় দূরে সরে যাবে।”

“মন্ডল বাড়ির অঢেল ঐশ্বর্য আছে সেকথা ঠিক। কিন্তু আভিজাত্য ভিন্ন জিনিস। এই জিনিস ঠিক টাকা পয়সার সাথে আপনা আপনি চলে আসে না। এটা মিশে থাকে বংশের ধারায়… রক্ত প্রবাহের মতো। চোখে দেখা না গেলেও সেটাকে ঠিকই অনুভব করা যায়।”

এমন অনেক জীবন সম্বন্ধনীয় অনুভূতি প্রকাশ পেয়েছে উপন্যাসে। উপন্যাসটিতে নাটকীয়তার চেয়ে বাস্তবতা বেশি ফুটে উঠেছে বলে মনে হয়েছে আমার। অতিরঞ্জিত, কাল্পনিক মনে হয়নি কিছুই। আর শেষে যেখানে হাহাকারে মন ছেয়ে যায়, সেখান থেকেই আবার আশার আলো দেখিয়েছেন ঔপন্যাসিক। সে সম্বন্ধে আর বেশি কিছু নাইবা বলি।

বর্ণনাভঙ্গি এতটাই সাবলীল ছিল যে এক বসাতেই পড়ে শেষ করা যায়। কিছু শব্দচয়নের কারণে পাঠকের ঠোঁটে এক চিলতে হাসি লেগে থাকবে। সামাজিক উপন্যাস যেখানে গুরুগম্ভীর হয়ে থাকে, সেখানে এই উপন্যাসটি সহজ, সাবলীলভাবে এগিয়েছে। গ্রাম্য জীবনযাত্রার অনবদ্য বর্ণনায় পাঠকমন হারাবে। ঔপন্যাসিক খুব কাছ থেকে জীবনের বাঁকগুলো দেখেছেন বলেই উপন্যাসে তা সাজাতে পেরেছেন বলে মনে হয়েছে আমার। তাঁর উপন্যাস “নির্লজ্জ” যেটা ২০১৮ সালের বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছিল সেটাও পড়েছি আমি।

“নির্লজ্জ”“ছায়াপথ” দুটোই জীবনধর্মী উপন্যাস। কিন্তু দুটোর প্লট একেবারেই ভিন্ন। “নির্লজ্জ” জাঁকজমকপূর্ণ বিলাসী বেপরোয়া শহুরে জীবনের পরিণতি। আর গ্রামীণ জীবনযাত্রার ভাঁজে ভাঁজে লুকানো কিছু গল্প মিলে “ছায়াপথ” উপন্যাস। দুটো উপন্যাস পড়ে বুঝলাম লেখক ডায়নামিক চিন্তাভাবনা করতে পারেন এবং সেগুলোকে স্বাচ্ছন্দ্যে লেখ্য রূপ দিতে পারেন। আশাকরি আমার মতো অন্য পাঠকদেরও “ছায়াপথ” এর আলো-ছায়ার পথে পরিভ্রমণ করে ভালো লাগবে।

 

এক নজরে ছায়াপথ

ঔপন্যাসিক- ফাহমিদা বারী

পৃষ্ঠাসংখ্যা- ১৯২

মলাটমূল্য- ৩৫০ টাকা মাত্র (বিক্রয়মূল্য ২৬০ টাকা মাত্র)

প্রকাশনী- চৈতন্য

প্রচ্ছদ- তৌহিন হাসান

প্রকাশকাল- ফেব্রুয়ারি ২০১৯