কবরের কাছেই একটি দোলনা ঝুলিয়ে রেখো : প্রিন্স মাহফুজ

‘ক্যাফে মধুজা’

ছেলেটির নাম পলিন। ও একটি মেয়েকে ভালোবাসতো।
মেয়েটির নাম মধুজা। ও চুমু বিক্রি করে ভাত খেতো।

মেয়েটি’র একটি ক্যাফে ছিলো যার নাম ‘ক্যাফে মধুজা’
যেখানে সস্তায় বিভিন্ন ধরণের চুমু পাওয়া যেতো।

মধুজা’র ঠোঁটে চুমু ছিলো, কিন্তু চোখে কোনো ঘুম ছিলো না।

সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত মেয়েটি শহরে শহরে মেন্যু কার্ড বিলি করতো
‘ঘরের চুমু খেতে একঘেয়েমি লাগছে?
এই কর্পোরেট মেট্রোজীবনে মধুকেও বিষ মনে হয়?
তবে এখনি চলে আসুন ক্যাফে মধুজা’তে
এখানে সুলভে চুমু পাওয়া যায়।
দেশী চুমু- ৫ টাকা
এরাবিয়ান চুমু- ২০ টাকা
ওয়েস্টার্ন চুমু- ১৬ টাকা
হায়াদ্রাবাদী চুমু- ২৫ টাকা
সেট মেন্যু- ৫২৫ টাকা’

এবং সূর্যাস্ত থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত মেয়েটি ক্যাফেতে দাঁড়িয়ে চুমু বিক্রি করতো।
উকিল থেকে ডাক্তার,
বিজনেসম্যান থেকে ইঞ্জিনিয়ার-
চুমু খাওয়ার পরে সবাই কবিতা চোর হয়ে উঠতো
এবং ক্যাফের দেয়ালে দেয়ালে কবিতাকে ফাঁসি দিতো-
‘সাইলেন্স ইয গোল্ডেন; চুমু হবে কিন্তু কোনো আওয়াজ হবে না।‘
‘ভালোবাসাময় কামড় ঘৃণাযুক্ত চুমু অপেক্ষা অধিক স্বাস্থ্যকর।‘
‘সত্যি বলছি ভাই, চুমুর চে’ বড় কোনো খাবার দাবার নাই।‘
‘চুমু একটি সাদা হাতি যা মরলেও লাখ টাকা-বাঁচলেও লাখ টাকা’
‘চুমু খাওয়ার জন্য হলেও আমি আরেকবার জন্মাতে চাই।‘

এসব কথা থাক।
যা বলছিলাম, ছেলেটির নাম পলিন। সে একটি মেয়েকে ভালোবাসতো।
মেয়েটির নাম মধুজা। রাত হলে সে সুলভমূল্যে চুমু বিক্রি করতো।
চুমু বিক্রি করে সে ডাল-ভাত খেতো।

পলিন সবসময় মধুজার কপালে চুমু খেতো কারণ সে দুটি বিষয় বিশ্বাস করতো-
প্রথমতঃ
ভালো না বেসেও ঠোঁটে চুমু খেতে পারে পথিক,
কিন্তু কপালে নয়;
প্রিয়জনকে যে ভালোবাসে মৃত্যুরও অধিক,
কেবল সে’ই কপালে চুমু খায়
দ্বিতীয়তঃ
পায়ের পাতায় চুমু খেতে পারে পুরুষ, নিতম্ব দেখেও তাদের ঠোঁট ধরে বায়না,
প্রিয় সত্য এটাই- পুরুষ কখনোই বেশ্যার কপালে চুমু খায় না।

কি যেনো বলছিলাম?
ও হ্যাঁ, মেয়েটির নাম মধুজা। মধুজা’র নিজের বলতে কিছুই ছিলো না
যেহেতু বেশ্যার কপাল ঈশ্বরের সম্পদ এবং কপাল ব্যতিত অন্যান্য অংশ সরকারী সম্পদ।

একদিন পলিন মধুজাকে টিপের পাতা দিলো, সেখানে সাতটা রঙ ছিলো
টিপের পাতা থেকে কালো টিপ রেখে বাকিগুলো মধুজা ফেলে দিলো।
কালো টিপকে কপালে রেখে বললো ‘তুই আমার জীবন, অন্ধকার-কালো।‘
কপালে চুমু খেয়ে পলিন বললো ‘আমার সাথে পালাবি?’
প্রশ্নের উত্তরে প্রশ্ন করলো মধুজা ‘দূরে, খুব দূরে, আমারে নিয়া যাবি?’

২ তারিখ ওদের পালানোর কথা ছিলো
১ তারিখ রাতে অনিবার্য কারণবশত একজন চুমু ক্রেতার হাতে মধুজা খুন হলো।

একজন বেশ্যা পালানোর স্বপ্ন নিয়ে মরে গ্যালো, ভাবা যায়?
হোক সে বেশ্যা, তবুও প্রেমী মরলে প্রেমিক তো ব্যথা পায়!

মধুজা’কে কোলে নিয়ে পলিন দৌড়াচ্ছে
মানুষের শহরে, মানুষের নগরে, মানুষের বন্দরে।

মুসলমান বললো ‘বেশ্যার কখনো জানাযা হয় না।‘
দেখুন আল্লাহ দেখুন, তবুও একটি বেশ্যাকে কোলে নিয়ে একজন মানুষ দৌড়াচ্ছে।

হিন্দু বললো, ‘আগুন পবিত্র। বেশ্যার অপবিত্র দেহকে তাই পোড়ানো যাবে না।‘
দেখুন ভগবান দেখুন, তবুও একটি বেশ্যাকে কোলে নিয়ে একজন মানুষ দৌড়াচ্ছে।

খ্রীস্টান বললো, ‘কফিনের কাঠ বেশ্যার জন্য নয়।‘
দেখুন ঈশ্বর দেখুন, তবুও একটি বেশ্যাকে কোলে নিয়ে একজন মানুষ দৌড়াচ্ছে।

রাষ্ট্র পলিনকে ফাঁসি দিলো। ফাঁসি দেয়া কত সহজ, ভাবা যায়!
কারণ, পলিন বলেছিলো ‘যারা বেশ্যার সাথে রাত কাটায়
তাদের কেনো জানাযা হয়
আগুন কেন তাদের পোড়ায়
কফিন কেনো তাদের ঢেকে দেয়?’

যে ছেলেটিকে ফাঁসি দেয়া হলো তার নাম পলিন।
পলিন একটি মেয়েকে ভালোবাসতো। মেয়েটির নাম মধুজা।
মধুজা চুমু বিক্রি করে ভাত খেতো, তার একটি ক্যাফে ছিলো, ‘ক্যাফে মধুজা’
যেখানে সস্তায় চুমু পাওয়া যেতো-
নিম্নবিত্ত চুমু
মধ্যবিত্ত চুমু
উচ্চবিত্ত চুমু।

বই: নেক্রপলিস | প্রচ্ছদ: ইবনে শামস | প্রকাশনী: ঘাসফুল | স্টল:৬১২ | মূল্য:১৮০ (ছাড় সহ ১৩৫)

‘দ্বিতীয় মৃত্যু’

যেনো জানালা খুললেই আমাকে দেখতে পারো সেজন্য আমার কবর হবে তোমার জানালার পাশে!
জীবিত না হোক; মৃত এই আমি কেবলই তোমার জন্য।
কবরের কাছেই একটি দোলনা ঝুলিয়ে রেখো–
যেখানে তুমি এবং তোমার স্বামী পা ঝুলিয়ে দুলতে থাকবে।
দুলতে থাকা দোলনার বাতাসে আমার বুকের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠবে যেমনটি জ্বলতে থাকে তরল কেরোসিন ক্লাউনের মুখের ভিতর!

কবরের এপিটাফে লিখে রাখবো “দ্বিতীয় মৃত্যু”
কারণ, বেঁচে থাকাটাই ছিল “প্রথম মৃত্যু”!
প্রথম মৃত্যু হৃদয়ের;
বিশ্বাস, প্রেম এবং ভালোবাসার।
দ্বিতীয় মৃত্যু দেহের;
কাদা, মাটি এবং এক টুকরো শরীরের।
প্রথম মৃত্যুর জন্য দায়ী তুমি;
দ্বিতীয় মৃত্যুর জন্য দায়ী সে– তোমার স্রষ্টা!

শরীরের চাহিদা মিটে যাওয়ার পরে যখন তোমার স্বামী নাক ডেকে ঘুমোতে থাকবে,
তখন তুমি বিড়ালের মতো হেঁটে হেঁটে নিঃশব্দে চলে এসো আমার বুকে!
দিনের উষ্ণতায় কবর শুকিয়ে রেখেছি যাতে রাতের শিশিরে তুমি আমার বুক ভেজাতে পারো!
চিনি খাওয়ার অপরাধে একদিন যে পিঁপড়েগুলোকে হত্যা করেছিলে
আজ সেই পিঁপড়েদের তুমি আমার থেকেও বেশি ভালোবাসতে শুরু করেছো!
কারণ, কবর থেকে বেরিয়ে আসা পিঁপড়েদের দেহে তুমি এখন আমার গন্ধ পাও।

তুমি বেঁচে আছো
আর আমি বেঁচে গেছি……
বেঁচে থাকা মানেই মৃত্যু;
মৃত্যু মানেই বেঁচে যাওয়া!
মৃত মানুষ অক্ষম; অক্ষম মানুষদের ভালোবাসাটা পাপ।
তুমি বরং মনোযোগ সহকারে স্বামীভক্ত স্ত্রী হয়ে নাক ডাকার শব্দ গুণতে থাকো
আকাশের তারা কিংবা সমুদ্রের ঢেউ গোণার মত করে।
বেপরোয়া প্রেমিকা নয়;
বরং লক্ষ্মী রমণীর মতই সংসারী হতে শেখো।

সংসার জীবনের অবসান শেষে যেদিন তুমি মৃত্যবরণ করবে
সেদিন আমার কবরের পাশে তোমার কবর খুড়ে নিও!
পাশাপাশি দুই কবরের মাঝখানে জানালা থাকলে কি ঈশ্বর মন খারাপ করবেন?
যেনো জানালা খুললেই আমাকে স্পর্শ করতে পারো সেজন্য আমাদের কবর হবে পাশাপাশি!
জীবিত না হোক ; মৃত এই আমরা কেবলই আমাদের জন্য।

 

‘পনেরো টাকা’

পিতার নাম জিজ্ঞেস করা হ’লে
আমি বললাম, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’

তারা ‘গেট আউট’ ব’লে ভাইভা বোর্ড থেকে আমাকে বিদায় জানায়।

জীবনের শেষ চাকরিটা হাত ছাড়া হয়ে গেলে-
শোক পালনের জন্য কবজি ডুবিয়ে বিরিয়ানি খেতে শুরু করি।

আমার পাশে দাঁড়িয়ে দুই হাত এগিয়ে ভিক্ষা চায় আশি বছরের মুক্তিযোদ্ধা-
‘ও মনু! মোর লইগ্যা শান্তিতে বিরানি খাইতে আছো । দশ টাহা বাড়াইয়া দে মনু।’

আমি বাম হাত প্লেটে ডুবিয়ে বিরিয়ানি খেলাম
ডান হাত দিয়ে খোঁজাখুঁজি করে পনেরো টাকা দিলাম।

ভাবলাম
চিড়িয়াখানায় হরিণ দেখতে দরকার পঞ্চাশ টাকা
স্বাধীন দেশে মুক্তিযোদ্ধাকে দেখতে দরকার পনেরো টাকা
যদিও চাল এবং মাংসের মূল্য বৃদ্ধির জন্য বিরিয়ানির প্লেট একশো দশ টাকা!

পনেরো টাকা পেয়ে বিশ্বজয়ের হাসি হেসে মুক্তিযোদ্ধা বললেন,
‘বাজান, তোর নামডা কী?’

বিরিয়ানির প্লেটে হাত ধুয়ে বললাম,
‘আমিই শেখ রাসেল!’