আমি নদী দেখতে দেখতে নদী হয়ে ডুবতে চাইতাম, এখনও চাই–সানজিদা আমীর ইনিসী

কবি সানজিদা আমীর ইনিসী’র প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ডুবছি ঝিলাম নদী প্রকাশ পেল এবারের একুশে বইমেলায়। সন্দেশকে এ বই নিয়ে জানাচ্ছেন তিনি নিজেই সেইসঙ্গে তাঁর কাব্যভাবনাও। পাঠকদের জন্য দেওয়া হল পাণ্ডুলিপি থেকে দুইটি কবিতাও। সানজিদা আমীর ইনিসী’র সঙ্গে কথা বলেছেন–রাফসান গালিব।

কতদিন ধরে লিখছেনকখন এসে মনে হল এবার বই বের করা যায়?

লিখছি খুব অল্পদিন, যদি হিসেব করেন। গতবছর মার্চে আমি প্রথম কবিতা লিখি। এপ্রিল থেকে আমার এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হয়। ওইসময়ে অনেক লিখেছি। আমার পরীক্ষা, পারিপার্শ্বিক অবস্থা সব মিলিয়ে খারাপ সময় যাচ্ছিল। যখন সাময়িকভাবে একটু উতরে গেলাম, তখন মনে হচ্ছিল এই কবিতাগুলি আলাদা করে রাখব। বই করব কিনা ভাবিনি। বোধহয় সেই আলাদা করার প্রয়াস থেকেই বই করছি।

ডুবছি ঝিলাম নদীএই নাম কেন?

“ডুবছি ঝিলাম নদী” আমার লেখা প্রথম কবিতা। ২১ শে মার্চ, ২০১৮ তে লেখা। আমি নদী দেখতে দেখতে নদী হয়ে ডুবতে চাইতাম, এখনও চাই। সামহাউ মনে হয়েছে, এই নাম আমাকে প্রচ্ছন্নভাবে রিপ্রেজেন্ট করে। বইতে ৩৮ টি কবিতা আছে।

কবিতা লেখার ব্যঞ্জনা কিভাবে তৈরি হয় আপনার মধ্যে?

কবিতার প্রথম লাইনটা ওহী প্রাপ্তির মত, হাহা, হুট করে মাথায় আসে। এরপর লিখে ফেলা সহজ। আমি ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ছাড়া কিছু জিনিস বিশ্বাস করি। ব্যাখ্যা দরকার হয় না আমার। শুধু জানি, দুঃখ পেলে কবিতা লিখতে পারি। আনন্দ নিয়ে কবিতা লিখতে পারি না।

সাম্প্রতিক সময়ের কবিতাকে কিভাবে বিচার করবেন?

সাম্প্রতিক সময়ে অন্য সব সময়ের মতোই অনেকে লিখছেন, আগেকার সময়ের মতোই কোনো কোনো কবিতা কবির নামসমেত টিকে যাবে। আলাদা করে ভাবার কিছু পাই নাই আমি।

একবিংশ শতাব্দীর পরিবর্তিত সময়ে এসে কবিতার নতুন কোন ভাষা তৈরি হয়েছে কিনা?

রাজনৈতিক অস্থিরতা আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম না থাকলেও কবিতার নতুন ভাষা তৈরি হত। এখন যেভাবে হয়েছে, সেভাবে হত না, এই আর কী। মানুষের জীবন স্মুথ না যেহেতু, তাই বিভিন্ন ভাষা তৈরি হতেই থাকবে। কবিতার ভাষা সর্বদা পরিবর্তনশীল।

সানজিদা আমীর ইনিসী
আমি নদী দেখতে দেখতে নদী হয়ে ডুবতে চাইতাম, এখনও চাই–সানজিদা আমীর ইনিসী

কবিতা বিষয়টাই তারুণ্যনির্ভর–কী মনে হয় আপনার?

তারুণ্যনির্ভর নয়। কবিতা বিষয়টা কবির জগৎ নির্ভর। সেই জগতে যে যেভাবে সারভাইভ করে, সেটাই তার কবিতা।

কবিরাই কবিতা পাঠকএ-ধরনের কথা আমরা জানি সাধারণ পাঠকের কাছে কবিদের দূরত্বটা কোথায়?

কবিরা যখন ক্রিটিসিজমের উদ্দেশ্যে কবিতা পড়ে, তখন সে ক্রিটিক। বাকি সময়ে সেও পাঠক। সাধারণ পাঠককে কিছু কবিতা রিচ না করতে পারার কারণ দুর্বোধ্যতা। এছাড়া কোনো ঝামেলা আছে কি? আমি বিশদভাবে জানি না।

এমন একটি সাক্ষাৎকার : ‘সমসাময়িক কবিদের মধ্যে দু’একজনই থাকেন সম্ভাবনাময়, বাকিসব হাবুডুবু খায়’ : নৈরিৎ ইমু

কার কার কবিতা সবসময়ই ভাল লাগেসমসাময়িক কোন কোন কবিকে সম্ভাবনাময়ী মনে হয়?

জীবনানন্দ দাশের কবিতার ব্যাপারে আলাদা করে বলি। আমি যখন এইটে পড়তাম, তখন বনলতা সেন কবিতা পড়ে আমি ভাবতাম বনলতা আমারই মত হয়ত। হাহা। আমার চুল তখনও বড় ছিল। আমি খুব সকালে অনেকসময় কীর্তনখোলা নদীর কাছে গিয়ে বসে থাকতাম। বসে কবিতা পড়তাম। তখন আমি কেবল জীবনানন্দই পড়ি। ওনার কবিতার পরে বিনয় মজুমদার, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা ভালো লাগত (এখনও লাগে)। সমসাময়িক আমার পরিচিত সব কবি আমার থেকে বয়সে এবং লেখার বয়সেও বড়। এদের সম্ভাবনা নিয়ে আমি ভাবি মাঝেমধ্যে। কেউ কেউ সম্ভাবনাময় জায়গা পেরিয়ে আরও সামনে চলে গেছেন।

ডুবছি ঝিলাম নদীকেন কিনবে বা পড়বে পাঠক?

“ডুবছি ঝিলাম নদী” কেন পড়বে? আমি যে ডুবে যাচ্ছি, এটা জানতেই পড়া উচিত বলে মনে হয়। কিন্তু এটা জেনেও বা তারা কী করবে? কোনো উত্তর নাই। আসলে কেন কিনবে-মূলক প্রশ্নের উত্তর যারা কিনবে, তারা জানে। আর বিশদভাবে ভাবলে আমিও জানতে পারি, পরে।

কারা কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশ করেছেপ্রচ্ছদ কার করামেলায় কোথায় পাওয়া যাচ্ছে?

এটা খুব সুন্দর প্রশ্ন। সৃজনশীল প্রশ্নের জ্ঞানের মত। কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশ করছে বৈভব। প্রচ্ছদ করা আনিসুজ্জামান সোহেলের। মেলায় এখনও পাওয়া যাচ্ছে না। পাওয়া যাবে সম্ভবত ১৮/১৯ তারিখ থেকে, বৈভবের স্টলে, স্টল নং ৪২২ (সোহরাওয়ার্দী উদ্দ্যান)।

ডুবছি ঝিলাম নদী
প্রচ্ছদ : আনিসুজ্জামান সোহেল

পাণ্ডুলিপির দুইটি কবিতা

ডুবছি ঝিলাম নদী
~
বিবাহ করিতে পারতাম
ব্যাগ কাঁধে আপিসে ছোটা লম্বা দেখতে লোকটারে
যাইতাম বৈদেশ
দেখতাম স্বপ্ন
আমি আমাদের সন্তানের মা হইতেছি
বৈদেশের হাসপাতালে
পরম যত্নে
কিনিয়া দিয়াছো শাড়ি আর সীতাহার
যেহেতু আমরা দেশে ফিরব।

আমি ফিরতে চাই আরও ওপরে
বা ভূতলে যাইতে চাই।
যাইতে চাই,
যাইতে হইলে সমন্ধ আসা সেই চাকরীওয়ালার বউ হইতে হইবে না
ওইযে সে
কবিতা লেখে
আর রাস্তায় হাঁটে দিকভ্রান্তের মত
আমি ওরে ভালোবাইসা যাব
ঘর থেকে অল্প দূরে
মানুষ কিছু কম
ব্রিজ হইছে নতুন
নদীর বুকের ওপর ভার হইয়া আছে সে
লম্বা সাইডওয়াক দুইপাশে
হাঁটতেছি
আমি ঠিকমত পা ফেলতে পারি না
দুঃখে বা ঘুমে।

নদীর শরীর আমারে জানে না
জানবে
এইত কিছুক্ষণ
তার আগে দীর্ঘ পথ
কে জানি বলছিল আমারে
“মাথায় নদী নিয়া কেউ নদীতে ডোবে না”
আমার মাথার চুলরে তার নদী মনে হইত
ঝিলাম নদী

আমি মরতে চাইছিলাম একটা দীর্ঘ বারান্দায়;
সাদা শাড়ির লাল পাড় জড়াইয়া
কপালে লাল টিপ
আর ইউকুলেলে শুনতে শুনতে

মৃত্যু কত সহজ
তবে বাঁচতে কেন কঠিন লাগে?
যে কবিতা লেখে আমার জন্য
তারজন্য বাঁচাও কেন কঠিন?

ঈশ্বর
তুমি এক এবং অদ্বিতীয় বইলা আমি বিশ্বাস আনলাম মৃত্যুর আগে
আমি জলস্পর্শ পাওয়ার আগে
ভাইসা থাকার এই মুহূর্তে
তুমি নির্বিষ করো
পৃথিবী
প্রেমের জন্য পৃথিবী মৃত্যুকূপ।

বিতিকিচ্ছি প্রেমহীনতা ছাড়ছি
আমি ডুবলাম
সূর্য মলিন
মাঝিরা নাই
আমি ডুবছি।

 

প্রস্থান
~
ওয়াকিবহাল থাকো
হঠাৎ চারদিক ফুঁসে ওঠা আর বিদ্যুৎ চমকদের ব্যাপারে

তওবা কর, নত হও
পাপ স্বীকার করে স্থির হও
বিশ্বাস রাখো প্রেমে
কালকাসুন্দা বেড়ে ওঠার সময়টা তুমি কেবল আমার দিকে চেয়ে থাকবা
তারপর এপ্রিল আসতে-আসতে ঝড় শুরু হইলে
আশু ক্ষয়ক্ষতিতে
মানুষের দিশেহারা চেহারা বিদ্যুৎ চমকে দেখা গেলে
তোমাকে তখনই বুইঝা নিতে হবে—
আমার ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা না থাকলেও আমি পায়চারি করতেছি দোতলার বারান্দায়
তোমার তখন সব চমকের আলোতে রাস্তা চিনে আইসা পড়তে হবে নিউ সার্কুলার রোড

পিচ্ছিল পিচঢালা রাস্তা—সব তুমি ফেলে আসছো
বাসার সামনের শেষ আলোর চমকে তোমার মনে হইল—প্রেমে না জড়াইয়া কেন একটু-একটু কইরা ধর্মে বাঁধা পড়লা
কেন এত বাধ্যতামূলক প্রেম আর তার নিয়ম—
তোমার শরীর ভারী হইয়া উঠতেছে

আমার সন্দেহের বাতিক আর অস্থির পায়চারি, কপালের ভাঁজ, নিদ্রালু চোখ
প্রেমের নিয়ম, যা আমাদের মধ্যে ছিল, তার প্রবর্তক হিসাবে আমার পরিণতি ভয়াবহ
এখানে, বাসার গায়ে ঝুলছে, তোমার মুক্তির জন্য নেওয়া দ্রুত সিদ্ধান্ত
তোমার প্রথম ও শেষ এতেলানামা— তুমি চইলা যাইতেছো।
এই ঝড়ঝাপটার রাত্তিরে সব ছাইড়া চইলা যাইতেছো।

সন্দেশ২৪ (www.sondesh24.com) আপনাদের পত্রিকা। আপনার যেকোনো লেখা পাঠিয়ে দিন আমাদের ঠিকানায়। ই-মেইল : [email protected] । আর হ্যাঁ, Like, Comment, Share করতে ভুলবেন না। ধন্যবাদ জানবেন।