বিষয়বস্তুর দিক থেকে সাম্প্রতিক কবিতা এগিয়ে–দুর্জয় আশরাফুল ইসলাম

কবি দুর্জয় আশরাফুল ইসলাম’র প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সমুদ্রের ব্যাকরণ প্রকাশ পেল এবারের একুশে বইমেলায়। সন্দেশকে এ বই নিয়ে জানাচ্ছেন তিনি নিজেই সেইসঙ্গে তাঁর কাব্যভাবনাও। পাঠকদের জন্য দেওয়া হল পাণ্ডুলিপি থেকে দুইটি কবিতাও। দুর্জয় আশরাফুল ইসলাম’র সঙ্গে কথা বলেছেন–রাফসান গালিব।

কতদিন ধরে লিখছেন? কখন এসে মনে হল এবার বই বের করা যায়?

গত সাত আট বছর ধরে ব্লগ, লিটলম্যাগ আর পরবর্তীতে ওয়েবজিনে লিখছি। ২০১৭ সালের নভেম্বরে প্রথম বই করার চিন্তা আসে। এটা অবশ্য এক বন্ধু ঢুকিয়ে দিয়েছিলো। এবং একটা পাণ্ডুলিপি দাঁড়িয়েছিল, এতদিন হয়নি, সম্ভবত ২০১৯তেই আমার দ্বিতীয় বই হিসেবে বইটি আসবে।

সমুদ্রের ব্যাকরণএই নাম কেন? এতে কয়টি কবিতা আছে?

সমুদ্রের সমস্ত নিয়ম কানুন তরঙ্গের দিকে যায়। তেমনই কবিতা, অন্তর্নিহিত কোন সুরের দিকে তার যাত্রা। আমি সে যাত্রায় নিজের নামটি লিখতে চাইলাম। আর অন্যভাবে বললে এই শব্দগুলো বইয়ের কোন এক কবিতার থেকে নেয়া। মোট ৭২ টি কবিতা আছে বইটিতে।

কবিতা লেখার ব্যঞ্জনা কিভাবে তৈরি হয় আপনার মধ্যে?

কবিতা তো মূলত মাথায় ঘুরপাক খাওয়া চিন্তার প্রকাশ। একার যে জগত সেখানে বিভিন্ন পরিপার্শ্বিকতা, বোধ কবিতার দিকে ধাবিত করে।

সাম্প্রতিক সময়ের কবিতাকে কিভাবে বিচার করবেন?

প্রচুর কবিতা লেখা হচ্ছে। প্রকাশের সহজলভ্যতা এ পথ খুলে দিয়েছে। যেহেতু প্রচুর লেখা হচ্ছে, অনেক ভালো কবিতা হচ্ছে, আবার এমন অনেক কবিতাও হচ্ছে যা আমার পাঠমেজাজের সাথে যাচ্ছে না। তবে কবিতার বিষয়বস্তুর দিক থেকে সাম্প্রতিক কবিতা অবশ্যই এগিয়ে।

দুর্জয় আশরাফুল ইসলাম
বিষয়বস্তুর দিক থেকে সাম্প্রতিক কবিতা এগিয়ে : দুর্জয় আশরাফুল ইসলাম

রাজনৈতিক পরিস্থিতি সেইসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এ সময়ে এসে কবিতার নতুন কোন ভাষা তৈরি হয়েছে কিনা?

কবিতার ভাষা আসলে ব্যক্তিগত। একজন কবি চাইবেন তার নিজস্ব একটা সুর, কবিতার ভাষা গড়ে তোলার। যারা পারবেন তারা কাল পেরিয়ে টিকবেন। যারা পারবেন না, সমকালে প্রচুর বিক্রিত আর বাহবা পেয়েও হারাবেন।

কবিতা বিষয়টাই তারুণ্যনির্ভর–কি মনে হয় আপনার?

মননে যদি তারুণ্যের কথা বলা হয় তাতে খুব একটা আপত্তি নেই। কিন্তু একটা বয়েস পেরিয়ে যে অভিজ্ঞতা দেখি অনেক অগ্রজ কবিদের কবিতায়, সেখানে ওই বয়স হয়ে যাওয়াটাকেও কবিতাটি লিখতে পারার প্রধান কারণ মনে হয়। আর বয়স বিবেচনায় নিলেও এ মুহূর্তে বাঙলাভাষায় দুর্দান্ত কবিতা লিখে যাচ্ছেন অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, কালীকৃষ্ণ গুহ’র মতো কবিরা।

কবিরাই কবিতা পাঠক–এ-ধরনের কথা আমরা জানি। সাধারণ পাঠকের কাছে কবিদের দূরত্বটা কোথায়?

কবিতা অন্তর্নিহিত সুরের কথা বলে। এজন্য নিবিড় পাঠ দাবি করে। আর পাঠকদের একটা বড় অংশই চিন্তায় অংশগ্রহণ করতে চান না, এটা একটা কারণ।

আরও সাক্ষাৎকার : আধুনিক কবিতার বুঝাপড়ায় পাঠকদের মাঝে একটা শূন্যতা তৈরি হয়েছে–হুজাইফা মাহমুদ 
‘সমসাময়িক কবিদের মধ্যে দু’একজনই থাকেন সম্ভাবনাময়, বাকিসব হাবুডুবু খায়’ : নৈরিৎ ইমু

কার কার কবিতা সবসময়ই ভাল লাগে? সমসাময়িক কোন কোন কবিকে সম্ভাবনাময়ী মনে হয়?

জীবনানন্দ দাশ, ভাস্কর চক্রবর্তী থেকে মজনু শাহ, নির্ঝর নৈঃশব্দ্য এ ক্রমরেখায় তালিকাটা বিশাল। সমসাময়িক অনেক কবিই সম্ভাবনাময়। এক দুটো নাম নিতে চাচ্ছি না বিবিধ কারণে, তবে যে কবি বিজ্ঞাপনী নন, চিন্তাচেতনায় গোরা নন, বাঙলা সংস্কৃতিকে ভালোবাসেন, এরকম সব কবিই আমাদের আশাবাদের কারণ।

সমুদ্রের ব্যাকরণ–কেন কিনবে বা পড়বে পাঠক?

যারা কবিতা ভালোবাসেন আর আমার চিন্তাকে পরখ করতে চান তারা পড়বেন। বৈচিত্র্যের কথা যদি বলি, অনেকে সেটা হয়তো খুঁজে পাবেন।

কারা কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশ করেছে? প্রচ্ছদ কার করা? মেলায় কোথায় এবং আর কোন কোন জায়গায় পাওয়া যাবে?

বইটির প্রকাশক ‘বোধি প্রকাশালয়’। এটা বিখ্যাত বইবিপণী ‘তক্ষশিলা’র প্রকাশনা বিভাগ। প্রচ্ছদটি নির্ঝর নৈঃশব্দ্য’র করা। অমর একুশে গ্রন্থমেলায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পাশে ৪৭৭ নং স্টলে পাওয়া যাবে। আর এমনিতেও আজিজ মার্কেটের তক্ষশিলা আর জনান্তিকে বইটি পাওয়া যাবে। যারা দূরের পাঠক তারা তক্ষশিলা থেকে কিংবা সব বই ডটকম থেকে কুরিয়ারেও নিতে পারবেন।

সমুদ্রের ব্যাকরণ
প্রচ্ছদ : নির্ঝর নৈঃশব্দ

পাণ্ডুলিপির দু’টি কবিতা

শীতঘুমে স্বপ্নহীন

প্রেম পদাবলি পড়ে আছে, পড়ে আছে দেখা হবে প্ল্যাকার্ড
এইসব প্রাচীন ইতিহাস, কৃত্তিবাস যুগের কথা
উত্তরাধিকারে পাওয়া নির্জনতা চিঁড়ে গান গেয়ে যায় পাখি
বেদনা তার ডাকনাম, সূর্যোদয় কেবল জানতো এসব
তারপর অল্প কথা প্রেরিত হতে হতে অস্তগমনের পথে পথে
জয় পরাজয়হীন ভাবনা নিয়ে কতবার যেতে হয়েছে
অন্ধকার সুড়ঙ্গপথে, আর বুদ্ধের ধ্যান ভেঙে অলৌকিক
কে এসে শুনিয়েছিল আয়না বিষয়ক কথাবলি। এসবও থাক
আপাতত ধরে আসছে হাত, ফুল ছড়ানো আঙুলেরা সব
উড়ে আসছে শীতঘুম, দ্রুতলয়ে কাটতে থাকা স্বপ্ন নিয়ে

বাবার কবর

‘I have not ever seen my fathers grave.’
–Audre Lorde

কবরের পাশে দাঁড়ালে জীবনের ওপার সন্নিকট মনে হয়।
রোজ করে কদিন দাঁড়াতাম।
সমাজ সংস্কার মেনে
যেমন করে পিতৃহারা কিশোরকে সন্ধ্যা-সাঁজে বেরোতে নেই।
তেমন করে দাঁড়াতে গিয়ে মনে হতো
অন্ধকার কে ভয় পাওয়া বাবা কি আঁতকে উঠছেন এই বেলায়
সূর্যরশ্মি যাওয়ার পথ চিরকালীন বন্ধ দেখে
বড্ড দুশ্চিন্তা নিয়ে উঠে বসেছেন কি তার মাদুলিতে।
তার পর উপলক্ষ সাঁজে, মৃত্যুদিন ও তো এক উপলক্ষ
দিনক্ষণ ধরে স্মরণ করবার,
প্রতিবার নতুন দুর্বাঘাসে সবুজ ভূমির শরীরে হঠাৎ বেনামী ফুল
দেখে মনে হত এর শিকড় বাবার হাতে, চমকে দেবার জন্য
নেড়ে দিচ্ছেন এই পড়ন্ত বেলায়, ওই সন্ধ্যা আসে ধীর!
তারপর জীবনের বিবিধ পর্যায়
মৃত্যু যখন ঘেরাটোপের ভেতর দেখছে অবিরাম আমাকে
চিরকালীন উপলব্ধি ফিরে আসে বারংবার
এই যে চলে যাওয়া, অনিবার্য পথ ধরে অনিঃশেষ গন্তব্যে
বাবা যেন সন্তানকে শিখিয়ে দিচ্ছেন দৌড়ে যাবার কৌশল
আর নিজে ছুটে চলছেন সম্মুখ, দৃষ্টান্তে।
বাবা যেন খেলাচ্ছলে হঠাৎ পেরিয়ে গেছেন সীমানা, আর
ওপার থেকে বলছেন, দৌড়ে আয়, এভাবেই আসতে হয়।

সন্দেশ২৪ (www.sondesh24.com) আপনাদের পত্রিকা। আপনার যেকোনো লেখা পাঠিয়ে দিন আমাদের ঠিকানায়। ই-মেইল : [email protected] । আর হ্যাঁ, Like, Comment, Share করতে ভুলবেন না। ধন্যবাদ জানবেন।

Comments are closed.