কবিতায় কঠোর পরীক্ষা ও নিরীক্ষার চেষ্টা ছিল, নিজেকে নিরন্তর ভেঙেছি–ইয়ার ইগনিয়াস

এবারের বইমেলায় যাদের প্রথম বই বের হচ্ছে বা হয়েছে তাদের নিয়ে সন্দেশের এ-আয়োজন। কবি ইয়ার ইগনিয়াসের কাব্যগ্রন্থ–হারমিসের বাঁশি। এ বই নিয়ে জানাচ্ছেন কবি নিজেই সেইসঙ্গে তাঁর কাব্যভাবনাও। পাঠকদের জন্য দেওয়া হল পাণ্ডুলিপি থেকে দুইটি কবিতাও। ইয়ার ইগনিয়াসের সঙ্গে কথা বলেছেন–রাফসান গালিব।

কতদিন ধরে লিখছেন? কখন এসে মনে হল এবার বই বের করা যায়?

সিরিয়াসলি লিখছি দুহাজার নয় থেকে, হাতেখড়ি তারও বছর দুয়েক আগে, সেক্ষেত্রে প্রায়ই একযুগ পর প্রথম বই বেরুলো। একই সময়ে লিখতে আসা কবিদের মধ্যে অনেকের তিন/চারটা বই বেরিয়ে গেছে ইতোমধ্যে। বছর তিনেক আগে থেকে বই করার জন্য জোরাজুরি করছে কবিবন্ধুরা। আমি বরাবরই নির্লিপ্ত থেকেছি। এবছর বিদেশে না আসতে হলে বইটা আগামী বছরই করতাম। প্রথম বইকে দূরতিক্রম্য মাইলফলক হিসেবে তৈরি করতে চেষ্টা করেছি, যেন পরে গিয়ে অস্বীকার না করতে হয়। ইদানিং এই প্রবণতাটা অনেকের প্রবল। তাই এই বইয়ের মান অক্ষুণ্ণ রাখতে সদা সচেষ্ট ছিলাম এবং মান নিয়ে আমি সন্তুষ্টও। বাকিটা পাঠকের হাতে…

হারমিশের বাঁশিএই নাম কেন? এতে কয়টি কবিতা আছে?

এই নামে কোন বিশেষত্ব নেই, নাম একটা দিতে হয় তাই দেয়া। এ নামে একটি কবিতা আছে বইতে। কবিতাটার প্রতি দূর্বলতা হেতু এই কবিতার নাম দিয়েই বইয়ের নামকরণ করেছি।  এতে সত্তুরটা কবিতা আছে।

কবিতা লেখার ব্যঞ্জনা কিভাবে তৈরি হয় আপনার মধ্যে?

চিত্তে খায়েশ জাগলেই কবিতা লেখা যায় না। কখনো কখনো কাঁসা বাজানোর তালে তালে দেয়ালে মাথাকূটে মরলেও তিলসম ঝলসে না কবিতার মুখোশ। কখনো আবার কতিপয় বিচ্ছিন্ন পঙক্তি নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করে, নর্তকীর মতো নৃত্য করে  কবিতার খেরোখাতায়। এ শব্দমালাই শেষে কবিতা হয়ে ওঠে।

হারমিশের বাঁশি

সাম্প্রতিক সময়ের কবিতাকে কিভাবে বিচার করবেন?

সাম্প্রতিক সময়ের কবিতা নিয়ে জাজমেন্ট করার সময় এখনো হয় নাই মনে হয়। এখনো সবার প্রস্তুতি পর্ব চলছে। আরও অন্তত অর্ধযুগ বাদে এ সময়ের কবিতা নিয়ে ঠিকটাক কথা বলা যাবে।

রাজনৈতিক পরিস্থিতি সেইসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এ-সময়ে এসে কবিতার নতুন কোন ভাষা তৈরি হয়েছে কিনা?

বলতে গেলে এখনতো কবিতায় রাজনৈতিক বিষয়টা আসেই না বলতে গেলে। সবাই ভয়ে বা ইচ্ছাকৃতভাবে হাত গুটিয়ে আছে। আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মত প্রকাশে সেন্সরহীন হওয়াই সোজাসুজি বলার প্লাটফর্ম হলেও কবিতার ভাষায় কোন চেঞ্জ আনতে পেরেছে বলে আমার মনে হয় না। এ সময়ের কবিতায় যতটুকু পরিবর্তন চোখে পড়ে, তা স্বাভাবিক বিবর্তন। নির্দিষ্ট সময়ে ভাষা তার বাঁকবদল করে। চর্যাপদ থেকে হালের দ্বিতীয় দশক পর্যন্ত চোখ বুলালে বিষয়টা স্পষ্ট হয়।

কবিতা বিষয়টাই তারুণ্যনির্ভর–কী মনে হয় আপনার?

কবিতা অবশ্যই তারুণ্যনির্ভর কিন্তু তা মনের সাপেক্ষে বয়স সাপেক্ষে নয়। মনের তারুণ্য হারিয়ে গেলে কবিতাও ঔজ্জ্বলতা হারায়।

কবিরাই কবিতা পাঠক–এ-ধরনের কথা আমরা জানি। সাধারণ পাঠকের কাছে কবিদের দূরত্বটা কোথায়?

কবিরাও কবিতার পাঠক নয়। আমার মনে হয় কবি যশোপ্রার্থীরাই কবিতার পাঠক। কারণ সিনিয়রেরা বই কেনে না। অনুজ অনুরাগীরাই কেনে, পড়ে। তা ভালো লাগা থেকে হোক আর উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যই হোক। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে তবে অধিকাংশ চিত্র এরকমই। অহেতুক অবোধ্য করে কবিতাকে ঘরকোণো করে রাখার দায় একমাত্র কবিদেরই। অনেকেই দূ্র্বোধ্যের নাম করে অবোধ্য লিখছে। পাঠক কবিতায় অবগাহন করতে ভালোবাসে, ভাষাকে পাঠক রিলেট করতে না পারলে পাঠক ক্রমে আগ্রহ হারাবে, হারাচ্ছে…

কার কার কবিতা সবসময়ই ভাল লাগে? সমসাময়িক কোন কোন কবিকে সম্ভাবনাময়ী মনে হয়?

কবি বিশেষে কারও কবিতা সবসময় ভালো লাগে না। কারণ কারও সবকটা কবিতা ভালো হতে পারে না, একজন কবি সবসময় ভালো লিখতে পারেন না। তবে অধিকাংশ কবিতা ভালো লাগে এমন অনেক কবি আছেন। সমসাময়িক অনেকেই তো ভালো লিখছেন, স্পেসিফিক নাম বলাটা মুশকিল। তবে হাসনাত শোয়েবঈফতেখার ঈশপ এ দুজনের কাব্যভাষা সবার থেকে আলাদা। সম্ভাবনাও প্রবল।

আরও এমন সাক্ষাৎকার : বিষয়বস্তুর দিক থেকে সাম্প্রতিক কবিতা এগিয়ে–দুর্জয় আশরাফুল ইসলাম

‘সমসাময়িক কবিদের মধ্যে দু’একজনই থাকেন সম্ভাবনাময়, বাকিসব হাবুডুবু খায়’ : নৈরিৎ ইমু

হারমিশের বাঁশি–কেন কিনবে বা পড়বে পাঠক?

কিনতে হবে বা পড়তে হবে এমন আবশ্যকতা কিন্তু নেই। যেহেতু বিশ্বসাহিত্য তো বটেই বাংলা সাহিত্যের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বইও অনেকের পড়া হয়নি। এমনকি সমসাময়িক অনেক কবিরও পড়া নেই। কবিতায় আমি কঠোর পরীক্ষা ও নিরীক্ষার মাধ্যমে  এগিয়ে গেছি, নিজেকে নিরন্তর ভেঙেছি। এমনকি পূর্ব প্রকাশিত কবিতাও অনেকবার পরিমার্জন করেছি। আমার নিয়মিত পাঠক এটা খেয়াল করবে অবশ্যই। বইয়ের সব কবিতা তাই সম্পূর্ণতই নতুন। বইটাতে মিথ ও ইতিহাস মিথস্ক্রিয়া সহজিয়া জীবনদর্শন এবং অনুপ্রাসের অননুমেয় সমুদ্রের সন্ধান মিলবে।

বইটা কিনলে সম্পূর্ণ নতুন একটা টেক্সট পাঠকের কাছে পৌঁছাবে। পাশাপাশি প্রকাশকের টাকাটাও ওঠে আসবে।

কারা কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশ করেছে? প্রচ্ছদ কার করা? মেলায় কোথায় এবং আর কোন কোন জায়গায় পাওয়া যাবে?

বইটি প্রকাশ করেছে চন্দ্রবিন্দু প্রকাশন। প্রচ্ছদ করেছেন আল নোমান। বইটি পাওয়া যাবে বাংলা একাডেমি বইমেলায় সোহরাওয়ারর্দী  উদ্যান, সালাম চত্বরে,  চন্দ্রবিন্দুর স্টলেস্টল নং ৪৭১। শীঘ্রই রকমারিতেও পাওয়া যাবে। এছাড়াও কুরিয়ারে পেতে চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনের অফিসিয়াল পেইজে যোগাযোগ করতে হবে।

হারমিসের বাঁশি
হারমিসের বাঁশি, প্রচ্ছদ : আল নোমান

পাণ্ডুলিপির কবিতা

সুর, অসুর ও বেসুরো গান

কখনো কখনো সুরেও অসুর ভর করে। বেসুরো করে দেয় বহুল গীত ললিত লিরিক। বিধি-বিরুদ্ধ স্থাপনার মতন ভেঙে দেয় সম্পর্কের সবুজ হাঁড়। চকিতে চোখের কার্ণিশে গুজে দিলে পরগাছা সর্ষে ফুলের; রেটিনায় রেজু নদী বয়ে যায় ধীরে, ততদূর ভূকম্পন পরবর্তী ধ্বস্ত গ্রাম, বজ্রতুলি দিয়ে আঁকা বৈরী-বৈশাখ।
আসলে কি নিভে যায় আশার আলো সকল?
তুমুল তিমিরও পারে না জাগাতে বিচ্ছেদের বিপন্ন সুর; নাগাসাকি কি ভুলেনি যুদ্ধের স্মৃতি?হিরোশিমায় ফুল হয়ে ফুটছে জয়শ্রী জীবন। মোপালি, এসো আমরাও পুড়াই দূরত্বের খড়
আকাঙ্খার আগুনে, আর প্রহর গুনি সম্ভাব্য সাক্ষাতের। জানোই তো ‘সম্ভাবনা’ শব্দটি বিচ্ছেদে বিদ্রোহী বরং ‘ম্ভ’ এরূপ পাশাপাশি বর্ণের বন্ধনে বিশ্বাসী। আর আত্মার অানন্তর্যে…
মোপালি, এখনি গুটিয়ে নিও না নিজেকে অ্যামিবার অবিকলে। শোনো, পুনর্মিলনের কোনো পূর্বলক্ষণ থাকে না।।

হারমিসের বাঁশি

মাগরিব-মার্গে হেঁটে হেঁটে অবসন্ন দুপুর নিম-নিচে জিরিয়ে নেয়। ক্রমশ ফণা নামিয়ে ধেয়ে যায় সরীসৃপ
সূর্যালোক- অন্ধকারে- অভিসারে।  কৃষ্ণপক্ষেও আলো ছড়ায় কিছু জোনাকপাখি
পোতাশ্রয়ে ক্রমে ক্ষীণ হয়ে আসে ডাহুকের ডাকআমাকে তবুও  জাগিয়ে রাখে যুবতীর ব্রীড়ানত বুক। দুষ্মন্তের
দেশে এটা দুষ্কৃতি নয়; হার্মিসের বাঁশি যাকে প্রলুব্ধ করেছিলো শৈলজ শকুন্তলা’য়।
দিনে সারস ও কচ্ছপের খামারে কাজ করি, রাতে পাহারা দিই মৃত্যুর দরোজা। এন্ট্রিলিস্ট চেক করে জেনেছি
এখানে হারমিস আসেন কদাচিৎ,  আমি তার অপেক্ষায় থাকি। যেন তার কাছে শিখে নিতে পারি বীণা তৈরির
তরিকা। কেননা, আমি ডুকে যেতে চাই, যুবতীর কশেরুকায়।

Comments are closed.