রাজসাক্ষীর ক্ষমা প্রত্যাহার করে কৃত অপরাধের বিচার করা যায় কি?

রাজসাক্ষীর ক্ষমা প্রত্যাহার করে কৃত অপরাধের বিচার করা যায় কি?
রাজসাক্ষীর ক্ষমা প্রত্যাহার করে কৃত অপরাধের বিচার করা যায় কি?
ঘটনার বিবরণ:

১৯৭৭ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর, বেলা ১২ টা ৩০ মিনিট। ভৈরব থেকে যাত্রা শুরু করল এম.এল. মামুন নামক লঞ্চ। বেলা ৩:৩০। লঞ্চটি ঘোড়াউটরা নদী দিয়ে হাসিমপুর গ্রামের উত্তর প্রান্তে পৌঁছাল। উল্লেখ্য, হাসিমপুর হচ্ছে কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর থানার অধীনস্থ। ঠিক ঐ সময় লঞ্চটিতে ডাকাত পড়ল। ডাকাত সংখ্যা আনুমানিক ৯/১০। ডাকাতদের হাতে ছিল কাটা রাইফেল, সঙ্গে অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্র। ডাকাতদল আক্রমণ করল যাত্রীদের উপর। মালামাল লুট করা হলো। নিয়ে নেওয়া হলো সর্বস্ব। ঐ সময় অগ্রণী ব্যাংক নিকলি শাখার দুই জন প্রহরী থেকে লুট করা হলো দুটি ম্যাগজিন, এবং ৫৫ টি গুলিসহ একটি স্টেনগান। সারেং থেকে নিয়ে নেওয়া হলো প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও নগদ ৬০০.০০ টাকা। শুধু সেটা না, ডাকাতির সময় ডাকাতরা লঞ্চ থামাতে বাধ্য করেছিল। এবং এতে করে আরও ৪/৫ জন ডাকাত যোগ দিয়েছিল। সব লুটপাত ও ডাকাতি শেষে ডাকাতরা নৌকা যোগে পালিয়ে যায়।

উক্ত ঘটনার দিন রাত আনুমানিক ৯ টার দিকে আক্কাস মিয়া বাজিতপুর থানায় এজাহার বা এফআইআর (FIR) দায়ের করে। উল্লেখ্য, আক্কাস মিয়া উক্ত লঞ্চের একজন কর্মচারী ছিল। পুলিশ উক্ত ঘটনার তদন্ত করে। তদন্তে ৩ জনকে অভিযুক্ত করে দণ্ডবিধির ৩৯৫ ও ৩৯৭ ধারার অপরাধে চার্জশীট প্রদান করে। অভিযুক্ত ৩ জনের একজন হলো আঙ্গুর মিয়া। আবার, এইদিকে আঙ্গুর মিয়া আদালতে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে অপরাধ স্বীকার করে স্বীকারোক্তি [Confession] প্রদান করে। এবং বাকি দুইজন আসামীদের বিরুদ্ধে আঙ্গুর মিয়া রাজসাক্ষী হয়। কিন্তু বাকি দুইজন আসামী নিজেদের নির্দোষ বলে দাবী করে আসছিল।

এই অবস্থায় ফরিয়াদী পক্ষের ৭ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। কিন্তু, মামলার রাজসাক্ষী আঙ্গুর মিয়া পল্টি মেরে আসামীদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দান থেকে বিরত থাকে। মানে রাজসাক্ষ্য দেয়নি আঙ্গুর মিয়া। ফলশ্রুতিতে আঙ্গুর মিয়াকে বৈরী সাক্ষী ঘোষণা করে জেরা করা হয়। বিচারকালে বাকি দুইজন আসামীকে নির্দোষ ঘোষণা করে খালাস প্রদান করা হয়। কিন্তু আঙ্গুর মিয়া রাজসাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য না-দেওয়ায়, ক্ষমা প্রদর্শনের শর্ত ভঙ্গ করায়; তার উপর ক্ষমা প্রদর্শন প্রত্যাহার করে দণ্ডবিধি ৩৯৫ ও ৩৯৭ ধারায় অপরাধে দোষী সাব্যস্থ করে ৭ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। উল্লেখ্য, উক্ত মামলায় আঙ্গুর মিয়া আইনজীবী নিযুক্ত না করায়, ফরিয়াদী পক্ষের সাক্ষ্য দেওয়া ৭ জনকে কেউ জেরা করেনি। উক্ত রায় ঘোষণার পরে আঙ্গুর মিয়া হাইকোর্টে আপীল করেন। হাইকোর্ট বিভাগ আঙ্গুর মিয়ার আপীলের আবেদন মঞ্জুর করেন।

হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত:

হাইকোর্ট আপীলকারী আঙ্গুর মিয়ার আপীলের শুনানী শেষে তাকে অভিযোগ থেকে মুক্তি দিয়ে খালাস প্রদান করেন।

মামলার সিদ্ধান্তের ভাষ্য:

আপীলকারী [আঙ্গুর মিয়া] ক্ষমা প্রদর্শনের শর্ত ভঙ্গ করে ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু গোপন করেছিল অথবা মিথ্যে সাক্ষ্য দিয়েছিল বিষয়ে সরকারি অভিসংশক  কোনো প্রত্যায়ন পত্র প্রদান না করায়; সে [আঙ্গুর মিয়া] ক্ষমা প্রদর্শনের শর্ত ভঙ্গ করায় তা বাজেয়াপ্ত হয়েছিল তা যেমন বলা যায় না, তেমনি যে আদালতে সে [আঙ্গুর মিয়া] রাজসাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দিয়েছিল সে আদালত সে [আঙ্গুর মিয়া] ক্ষমা প্রদর্শনের শর্ত ভঙ্গ করেছিল মর্মে  সিদ্ধান্ত প্রদান না করায় ফৌজদারী কার্যবিধি ৩৩৯ ধারার (১) উপধারা অনুসারে তাকে কোনো অপরাধের জন্য অভিযুক্ত করা যায় না।

[আঙ্গুর মিয়া বনাম রাষ্ট্র, ৪১ ডিএলআর, পৃ. ৬৬]

কুইজ ক্যাপ্সুল:
  • যদি সরকারি অভিসংশক প্রত্যায়ন পত্র প্রদান করত, যদি রায় ঘোষণাকারী আদালত ক্ষমা প্রদর্শনের শর্ত ভঙ্গ করেছিল মর্মে সিদ্ধান্ত প্রচার করত তাহলে আপীলের রায় কী হতো?
  • দণ্ডবিধির ৩৯৫ ও ৩৯৭ ধারার অপরাধ কী?

সূত্র:

  • 41 DLR (Dhaka Law Report), P. 66
  • নজির আইন সংহিতা [দ্বিতীয় খণ্ড]: কাজী এবাদুল হক, পৃষ্ঠা ১৪~১৫