সোশ্যাল মিডিয়া পরজীবী কবি তৈরি করতেছে, এরা অন্যের ভাষা, ম্যাকানিজমের উপর ভর দিয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে—শুভ্র সরকার

এবারের বইমেলায় যাদের প্রথম বই বের হচ্ছে বা হয়েছে তাদের নিয়ে সন্দেশের এ-আয়োজন। কবি শুভ্র সরকারের কাব্যগ্রন্থ–ঈর্ষার পাশে তুমিও জুঁইফুল। এ বই নিয়ে জানাচ্ছেন কবি নিজেই, সেইসঙ্গে তাঁর কাব্যভাবনাও। পাঠকদের জন্য দেওয়া হল পাণ্ডুলিপি থেকে দুইটি কবিতাও। শুভ্র সরকারের সঙ্গে কথা বলেছেন–রাফসান গালিব।

কতদিন ধরে লিখছেন? কখন এসে মনে হল এবার বই বের করা যায়?

২০১৩ সালে কলকাতা যাই। লেখালিখির শুরুটা সচেতনভাবে তখনই। ওই সময়টাতে আমি প্রায় বছর দেড়েক বাইরের জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলাম। আমার বর্তমানকার অনেক অভ্যাস ওই সময়টাতেই তৈরি। এখনও তার প্রভাব কাটায় উঠতে পারি নাই।বেশ কয়েকবছর ধরেই ভেবেছি বই করবো। তারপর কোন-না-কোন কারণে পিছিয়ে গেছি। তবে নিজের টেক্সট নিয়ে আমার মধ্যে এক প্রকার অস্বস্তি কাজ করে সবসময়। একটা সময় পর নিজের লেখাগুলোরে আমার অপ্রয়োজনীয় মনে হয়। মানে এইগুলোরে লিখতেই হতো, এর কোন ডেফিনিট রিজন আমি খুঁজে পাই না। ২০১৮ কলকাতা বইমেলায় ওখানকার একটা লিটলম্যাগ ‘ছাড়পত্র’ আমার বই করতে চেয়েছিল। তো সেসময় আমার মনে হয়েছিল প্রথম বইটা বাংলাদেশ থেকেই করবো বা করা উচিত। এরপর ২০১৮ এর মাঝামাঝি দেশে ফিরি। তারপর ‘চন্দ্রবিন্দু’ আগ্রহ দেখাল। হয়ে গেল ‘ঈর্ষার পাশে তুমিও জুঁইফুল’।

ঈর্ষার পাশে তুমিও জুঁইফুলএই নাম কেন? এতে কয়টি কবিতা আছে?

কিছু ভেবে নাম ঠিক করিনি। তবে নামটা ঠিক করতে অনেক ভেবেছি। কয়টা কবিতা আছে তা এক্স্যাক্ট মনে নাই। ৫০টার কাছাকাছি সংখ্যক কবিতা আছে হয়তো।

কবিতা লেখার ব্যঞ্জনা কিভাবে তৈরি হয় আপনার মধ্যে?

এইটা নিয়ে আগে কখনও ভাবিনি। মানে সচেতনভাবে কিভাবে লিখছি, এটা নিয়ে চিন্তাভাবনা করিনি। লিখছি এটাই ইম্পর্টেন্ট। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমি উৎসের কাছে ফিরতে পারি না। মানে যে ভাবনাটাকে ঘিরে একটা লেখা দাঁড়িয়ে আছে, হঠাৎ খেয়াল করলাম ওই ভাবনাটা পুরো লেখাটার কোথায় নেই। আমার সবসময় মনে হয় দেখার জন্য পর্যাপ্ত চোখ আমাদের নাই। কিংবা দেখার অন্য পাশেও দেখার অনেক কিছু আছে। যেমন ধরেন, ইদানিং ‘রোদ’ ব্যাপারটাকে আমার বার্ন ইউনিট থেকে সদ্য ঘরে ফেরা গৃহবধূর মুখ বলে মনে হচ্ছে। আবার আধখোলা জানলার কাছে বসে থাকা হালকা হাওয়ার কি জানা আছে, গৃহে প্রবেশের জন্য একটা দরজাও থাকে, এই ধরনে দেখার ব্যাপারগুলো নিয়েই আমার কবিতার আবহ তৈরি হয়।

সাম্প্রতিক সময়ের কবিতাকে কিভাবে বিচার করবেন?

এটা নিয়ে ভাবার প্রয়োজন এখনও বোধ করছি না। উচিতও না। আরও অনেক পরে সেইটা নিয়ে বিচার বিবেচনা করা যাবে। তবে কিছুদিন আগে একবার বলেছিলাম, দ্বিতীয় দশকে কবিতার ক্ষেত্রে অপচয় বেশি হইছে। আমিও প্রচুর অপচয় করছি।

রাজনৈতিক পরিস্থিতি সেইসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এ সময়ে এসে কবিতার নতুন কোন ভাষা তৈরি হয়েছে কিনা?

রাজনৈতিক পরিস্থিতি তো নতুন না। ষাটের দশক থেকে আছে৷ যদিও রিসেন্টলি কিছু কাজ হইছে বা হচ্ছে যেটা কবিতায় পলিটিক্যাল যে চিরপরিচিত এপ্রোচ তা ভেঙে দিচ্ছে। তারপরেও অধিকাংশই আমার কাছে বুলশিট মনে হয়। আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নতুন ভাষা কোনভাবে তৈরি করাতে পারে না। বরং এইটা পরজীবী কবি তৈরি করতেছে। যারা অন্যের ভাষা, ম্যাকানিজমের উপর ভর দিয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে।

ঈর্ষার পাশে তুমিও জুঁইফুল

কবিতা বিষয়টাই তারুণ্যনির্ভর—কি মনে হয় আপনার?

অবশ্যই তারুণ্যনির্ভর। তবে সেটা বয়স দ্বারা নির্ধারিত হয় না।

কবিরাই কবিতা পাঠক—এধরনের কথা আমরা জানি। সাধারণ পাঠকের কাছে কবিদের দূরত্বটা কোথায়?

আমি ব্যাপারটারে অন্যভাবে দেখছি। পাঠকের কবিতার কাছে আসা উচিত। কবিতার কোন জায়গায় যাওয়ার দরকার নাই। দূরত্ব একটা দুরভিসন্ধি। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়, অনলাইনে কবিদের কাছ থেকে কবিতাভাবনা নেয়া হয়। জানা হয়, কবিরা মূলত কবিতা নিয়ে কী ভাবতেছেন। কিন্তু পাঠকরা কী ভাবতেছে সেইটাও যে জানা উচিত, এইটা কেউ ভাবতেছে না। দূরত্ব তৈরি হওয়ায় পাঠকের অবদান অনেক। তাদের যে কাজ, কবিতা পড়া সেইটাই তো তারা করে না। তারা তো কবিরে পড়ে। প্রতিষ্ঠানরে পড়ে। কবিতা পড়ার টাইমই তো নাই তাদের।

পড়ুন আরও সাক্ষাৎকার : ১) কবিতায় কঠোর পরীক্ষা ও নিরীক্ষার চেষ্টা ছিল, নিজেকে নিরন্তর ভেঙেছি–ইয়ার ইগনিয়াস

২) আমি নদী দেখতে দেখতে নদী হয়ে ডুবতে চাইতাম, এখনও চাই–সানজিদা আমীর ইনিসী

৩) আধুনিক কবিতার বুঝাপড়ায় পাঠকদের মাঝে একটা শূন্যতা তৈরি হয়েছে–হুজাইফা মাহমুদ

কার কার কবিতা সবসময়ই ভাল লাগে? সমসাময়িক কোন কোন কবিকে সম্ভাবনাময়ী মনে হয়?

আমার নাম ভুলে যাওয়ার একটা বালাই আছে। এছাড়া ভালো লাগা না লাগার লিস্ট প্রকাশ্যে না আনাই ভালো। বিশেষ করে বইমেলার সময়।

সমসাময়িকদের মধ্যে আমার ভালো সম্ভাবনা আছে। আর নিজের সম্ভাবনা কায়েম রাখতে যেহেতু অন্যদের সম্ভাবনা নিয়ে ভাবার সময় নাই, এমন একটা ভাব ধরতে হয়; তাই ধরে নেন ওইরকম একটা ভাবে আছি।

ঈর্ষার পাশে তুমিও জুঁইফুলকেন কিনবে বা পড়বে পাঠক?

‘ঈর্ষার পাশে তুমিও জুঁইফুল’ অনেকটা ওই বাড়ি ফেরার শেষ বাসটা মিস না করার অনুভূতির মতো। আপনি মিস করতে পারবেন না।

কারা কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশ করেছে? প্রচ্ছদ কার করা? মেলায় কোথায় এবং আর কোন কোন জায়গায় পাওয়া যাবে?

‘ঈর্ষার পাশে তুমিও জুঁইফুল’ চন্দ্রবিন্দু প্রকাশ করেছে। প্রচ্ছদ করেছেন সারাজাত সৌম বইমেলায় চন্দ্রবিন্দুর স্টল নং ৪৭১। এছাড়া চট্টগ্রাম বাতিঘরে পাওয়া যাচ্ছে। ঢাকার বাতিঘরে বই ছিল। তবে এখন মনে হয় না এভেইলেবল আছে। প্রকাশক খুলনায় বই পাঠানোর প্রসঙ্গে রিসেন্টলি কথা বলেছিল আমার সাথে। পাঠানো হয়েছে কিনা জানি না।

ঈর্ষার পাশে তুমিও জুঁইফুল; প্রচ্ছদ : সারাজাত সৌম
ঈর্ষার পাশে তুমিও জুঁইফুল; প্রচ্ছদ : সারাজাত সৌম

পাণ্ডুলিপির দু’টি কবিতা

‘একা’

ঢিল ছুঁড়লে জলের গায়ে মেয়েটাও অবাধ স্তন
হাঁসেদের বাড়ি ফেরা খুলে—

সে উড়িয়ে দেয় জ্যামিতি
হারিকেন মুছতে মুছতে আলো হয়ে যাওয়া
কোন সন্ধ্যায়
শিখে নেয়:

শরীর এক ফুলগাছ
যার
গায়ে
ফুটে
থাকে
অসংখ্য ইশারা

এদিকে, ট্রেনের হুইসেলে প্লাটফর্মও—
সঙ্গম শেষে নারীর মতো একা

‘মনোলিথ’

ঘড়ির থেকে উড়িয়ে দেয়া আয়ু
ছায়ার ভাঁজে লুকিয়ে থাকা ভিড়
ভীষণ এক গভীর মনোলিথ—
যেন তোমার আলগা করা মিড়

আয়ুর দিকে ফেরার পথে দেখো
নিহত এক ভিড়ের পাশে একা
ভাড়াটে ফুল কুড়িয়ে রাখে রেণু
পাখির শিসে পথ রয়েছে আঁকা

মেঘ ডিঙিয়ে জল বুনছে পথ
তোমার গায়ে সেলাই করে জ্বর
শস্য দিনের হিম প্রতুল ভাষা
কোথাও যেন শুনি তোমার স্বর

ঘুমের জলে সাঁতার ভোলা মীন
নদীর গালে আঁকছো তুমি টোল
তবুও কেন এড়িয়ে যেতে চাও
ঘড়ির আছে নিজের কোলাহল

সন্দেশ২৪ (www.sondesh24.com) আপনাদের পত্রিকা। আপনার যেকোনো লেখা পাঠিয়ে দিন আমাদে ঠিকানায়। ই-মেইল : [email protected]। আর হ্যাঁ, Like, Comment, Share করতে ভুলবেন না। ধন্যবাদ জানবেন।