প্রেমে পড়ার পরই আমি পয়লা কবিতা লিখতে শুরু করি—বায়েজিদ বোস্তামী

প্রথমবারের মতো যাদের বই এবারের একুশে বইমেলায় প্রকাশ পাচ্ছে বা পেয়েছে তাদের নিয়ে সন্দেশের এ-আয়োজন। কবি বায়েজিদ বোস্তামীর প্রকাশ পেলো কাব্যগ্রন্থ ‘পাপের পুরাণ’। সন্দেশকে এ-বই নিয়ে জানাচ্ছেন তিনি নিজেই সেইসঙ্গে তার কাব্যভাবনাও। পাঠকদের জন্য দেওয়া হল পাণ্ডুলিপি থেকে দুইটি কবিতাও। বায়েজিদ বোস্তামী’র সঙ্গে কথা বলেছেন—রাফসান গালিব।

কতদিন ধরে লিখছেন? কখন এসে মনে হল এবার বই বের করা যায়?

বলতে দ্বিধা নাই যে প্রেমে পড়ার পরই আমি পয়লা কবিতা লিখতে শুরু করি। তা সেইটা ধরেন ২০০১ এর দিকের ঘটনা। ইশকুলের শেষদিকে পড়ি। চিকেন পক্স হইলো। টানা শুইয়া থাকতে হয়। প্রেমিকারে দেখিটেখি না। তারে নিয়া লিখি ফেলি। সেগুলিরে হয়তো আজকে আসি কবিতা ভাবতে শরম করবে আমার। যদিও কৈশোরের সেই ছেলেমানুষি এখনো চলে, চলবে আমরণ। প্রেম নিয়াই তো লিখি আমি মূলত। অল্প কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া। তো নিজের কবিতারে কবিতা ভাবতে শুরু করি অন্তত দুই হাজার দশের দিকে আসি। মোটামুটি অইটাইমে বুঝতে পারি যে যা কইতে চাইতেছি, যেভাবে কইতে চাইতেছি সেইটা পারতেছি আর কি! দীর্ঘদিন আমার কবিতার একমাত্র লক্ষ্য এবং পাঠক আছিলেন আমার তৎকালীন প্রেমিকা—যিনারে বইটি উৎসর্গ করা হইছে। এরপর ধরেন উনার প্রস্থানের পর বন্ধুবান্ধব মদ্দে এগুলি নিয়া আলাপসালাপ হইতে থাকে। পরিচয় ঘটে কবি ও শিশুসাহিত্যিক এহসান হায়দারের লগে। উনিই আমারে বই করার তাগাদা দেন পয়লা। বই করি না ফেললে যে আগের লেখাগুলিরে ট্র্যাশ সাব্যস্ত করি ছুঁড়ি ফেলতে হয়, আমিও তীব্রভাবে ফিল করি ইদানিং বিষয়টা, এইটি বোঝান। বই করার তাগিদ তৈয়ার হয়। এবং সেই লক্ষ্যে ঝাড়াইবাছাই ইত্যাদি শুরু করি।
এই বইয়ের কবিতাগুলি মোটামুটি দশ থাকি আঠারোর ভিতরে লেখা। কিছু ঘষামাজা করা হইছে পাণ্ডুলিপি তৈয়ার কালে।

পাপের পুরাণ—এই নাম কেন? কয়টি কবিতা আছে এতে?

প্রেম ব্যতীত মানুষের যা কিছু অর্জন, চর্চা ও বমনের আছে, সেইসবে ন্যূনতম আস্থা নাই। আদিপাপের মিথে বিশ্বাস করি। সেই সাথে এও বিশ্বাস করি যে, মানুষের পক্ষে দেহের ভেতর দিয়েই কেবল দেহাতীতে যাওয়া সম্ভব। পাপের পুরাণ প্রেম, এবং কামেরও, বই। এই ভাবনা থাকি-ই পাপের পুরাণ নাম রাখা। চাইর ফর্মার পেপারব্যাকটিতে মোট তিপ্পান্নটি কবিতা আছে।

কবিতা লেখার ব্যঞ্জনা কিভাবে তৈরি হয় আপনার মধ্যে?

বলি রাখা ভালো যে আমি কখনোই সাহিত্য করতে, বা ফলাইতে, চাই নাই বা চাই না। এবং নিজেও সাহিত্য যখন পড়ি তখনো কিছু খুঁজতে যাই না। কবিতারে আমি একটি পদ্ধতি হিশাবে দেখি—ভার নামানির। এখন সেই ভার নানান কিছুরে কেন্দ্র করিই জমতে পারে। জমি ওঠা ভার বহনে অপারগ হইলেই আমি লিখি। এইটা শুধু কবিতার বেলায়ই করি যে তা না, আমার গদ্যে আগ্রহ প্রচুর, গদ্য লিখবার যে মকশো গত বছর কয়েক ধরি করতেছি তাও একই কারণেই।

সাম্প্রতিক সময়ের কবিতাকে কিভাবে বিচার করবেন?

এই প্রশ্নটার জবাব আমি দেবো না। আমার জীবনে একটা বড়ো ভুল আছিলো, ইউনিতে সাহিত্য পড়তে যাওয়া। (অবশ্য সাহিত্য না পড়ি অন্য কোনও সাবজেক্ট পড়লে হয়তো ড্রপআউট হইবার গৌরব অর্জন করতাম। সেই বিবেচনায়ও লস হইছে।) টানা বছর কয়েক এতো বেশি সাহিত্যের শবব্যবচ্ছেদ প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত থাকতে হইছে যে এখন এগুলি নিয়া কথা কইতে শোনা বা কওয়া দুইটাই বিরক্তিকর লাগে। কবিতা নিজে যা কয় কিংবা কয় না তারে শোনাই যথেষ্ট বোধহয়। এইসব বিচার ইত্যাদি সাম্প্রতিক বা অতীত যে কালের কবিতার-ই হউক, অপ্রয়োজনীয় ভাবি আমি।

কবিতা বিষয়টাই তারুণ্যনির্ভর—কি মনে হয় আপনার?

ধরেন, তারুণ্যেরই তো উল্টায়াপাল্টায়া, ভাঙিখুলি দ্যাখার আগ্রহ থাকে সব কিছুরেই। সেই জায়গা থাকি-ই হয়তো তারুণ্য একটা বড়ো জায়গা দখল করি থাকে কবিতায়। আবার কেউ কেউ বয়সরে কাঁচকলা দ্যাখায়ে তারুণ্য ক্যারি করতে পারেন না যে এমন না। যদিও নিজেরে রিপিট করবার ফাঁদেই পা দ্যান অনেকেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে।

বায়েজিস বোস্তামী

কবিরাই কবিতা পাঠক—এ-ধরনের কথা আমরা জানি। সাধারণ পাঠকের কাছে কবিদের দূরত্বটা কোথায়?

পাঠক কবিতার লগে রিলেট করতে পারলে কবিতা পাঠ করেন। সেইটা কবিবৃত্ত ছাড়ায়া আমেও হইতে পারে। এখন জীবনানন্দদাশের ‘রূপসী বাংলা’র কবিতাগুলির পাঠক নিশ্চয়ই কেবল কবিকুলে সীমাবদ্ধ না। উনার অন্য কবিতার ক্ষেত্রে কিন্তু এই কথাটা কইতে পারবেন না আপনি। আর কবিতা বলতে তো নির্দিষ্ট কোনও কিছুরে বুঝাইতে পারবেন না আপনি। ধরেন লালনের গান কবিতা হইলে তা তো কেবল কবিবৃত্তে নাই, নাকি! যদিও গানের থাকি উদাহরণ দেওয়াটা বোধহয় যুতসই হইলো না। হাহা।
এখন মুশকিল হইলো কবিতার যে নিজস্ব ধোঁয়াশা থাকলে আমের আগ্রহ নেতাইয়া যায়, তার লগে যিনারা রিলেট করতে চান উনারা নিজেরাও কমবেশি এই ধোঁয়াশায় থাকতে চাওয়া মানুষ। ফলেই বোধহয় এই কথাটা চাউর হইছে বেশি। আমপাঠকের ধোঁয়াশার লগে কারবার নাই।

আমি নদী দেখতে দেখতে নদী হয়ে ডুবতে চাইতাম, এখনও চাই–সানজিদা আমীর ইনিসী

কার কার কবিতা সবসময়ই ভাল লাগে? সমসাময়িক কোন কোন কবিকে সম্ভাবনাময়ী মনে হয়?

এইটি একটু মুশকিলের প্রশ্ন হইছে। আমার পড়তে ভাল্লাগে। তবে পছন্দের কথা কইলে আমি এলিয়টের থাকি ইয়েটসরে বেশি পছন্দ করি। বা ধরেন মাইকেলের মহাকাব্য পড়ি উঠতে পারি নাই এখনো, কিন্তু বৈষ্ণব কবিদের মুগ্ধতা নিয়া পড়ি। বা উইলিয়াম ব্লেইক, ওমর খৈয়ামরেও। ধারে কাছে থাকলে সমর সেন পড়লাম হয়তো। ভালোও লাগলো। কিন্তু জীবনানন্দ দাশের ঘোর কাটে না। ভাল্লাগাটাগা এইরকম আর কি।
সমসাময়িক যিনারা আছেন উনাদের মদ্দে হাসান রোবায়েত, চঞ্চল মাহমুদ, ডাল্টন সৌভাত হীরা, পাপিয়া জেরীন ইনারা পছন্দের আমার। ইনাদের সম্ভাবনাময় বলি বলার কিছু নাই হয়তো আর। মোটামুটি সম্ভব করছেন ইনারা। এহসান হায়দারের কবিতা পছন্দ করি। তারে নিয়া আলাপ নাই কোথাও এইটা আমারে দুঃখিত করে। এর বাইরে আবু তাহের তারেক উনার সিলেটিতে রচিত কবিতায় আমারে মুগ্ধ করেন।
একদম নোতুনদের মদ্দে উবাইদুল্লাহ রাফী, সানজিদা আমীর ইনিসী আর সাদিক সত্যাপনরে বোধহয় সম্ভাবনাময় কইতে পারি, উনাদের আপত্তি না থাকলে। কেবল মুগ্ধতা না যথারীতি ঈর্ষা নিয়া পড়ি আমি এই ত্রয়ীরে।
একদম ব্যক্তিগত জায়গা থাকি বন্ধু মহসীন আলী, মামুন মিজানুর রহমান আর তানভীর গাজীর কবিতা পছন্দ আমার। এবং উনাদের সম্ভাবনা দেখি না। কেবল কবি বলি নিজেদের দাবি করবার যে হিম্মত রইছে উনাদের তাতে পারলে চিল্লাইতে ইচ্ছা করে ভীড়মদ্দে, এই বলি যে, দ্যাখেন, পৃথিবীর অখ্যাত, অগীত, অসম্ভাবনাময় কবিদের দ্যাখেন, ভাইসব!

সোশ্যাল মিডিয়া পরজীবী কবি তৈরি করতেছে, এরা অন্যের ভাষা, ম্যাকানিজমের উপর ভর দিয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে—শুভ্র সরকার

পাপের পুরাণ— কেন কিনবে বা পড়বে পাঠক?
এইটি বোধহয় পাঠকই ভালো বলতে পারবেন। তবে আমার চাওয়া থাকবে উনারা বই কিনবেন এবং শেষ পাতা পর্যন্ত পড়বেন; আর পড়া শেষে নিজেরাই আবিষ্কার করবেন যে ক্যানো মাঝপথে পড়া ছাড়েন নাই। পাঠকের থাকি এই কারণ জানতে আগ্রহী আমি।

কারা কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশ করেছে? প্রচ্ছদ কার করা? মেলায় কোথায় পাওয়া যাচ্ছে?

বই ছাপছে মনদুয়ার, পরিবেশক—সংহতি। বইমেলায় সংহতির স্টল নম্বর ১০৩-৪, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। প্রচ্ছদ করছেন আল নোমান। আমার নিজের আঁকা স্কেচরে বেইস করি।

বই ছাপা নিয়া নানান বিচ্ছিরি অভিজ্ঞতা আছে। গতবছর এক পাবলিশার পল্টি নিছেন। এইবছরও দুই/একজনরে এপ্রোচ করি সাড়া না-পাইয়া পাঠকরে কল করি। উনাদের টেকায়ই বই করা। পরে অবশ্য ‘বৈভব’ আগ্রহ দেখাইছিলো। তদ্দিনে এইদিকে কাজকাম অনেক দূর আগাইছিলো বলি বৈভবরে ফিরাইতে হয় আর কি! তানিম কবির সম্পাদক হিশাবে আমার কবিতা পয়লা ছাপেন। পাপিয়া জেরীন বন্ধুলোক। উনাদের ‘বৈভব’ থাকি আমার পয়লা বইটি ছাপা হইলে আমার লাগি প্রভূত আনন্দের ঘটনা হইতো। বই বিপণন ইত্যাদি নিয়া যে চাপে আছি তার থাকিও রেহাই পাইতাম। দুঃখের বিষয় যে সেইটি হয় নাই।

পাপের পুরাণ
পাপের পুরাণ; প্রচ্ছদ : আল নোমান

পাণ্ডুলিপির দুইটি কবিতা

আততায়ী

সঙ্গমসম্পর্ক-রহিত শিশ্নের মতোই অতন্দ্র কাটে ঢের রাত—উত্থিত অথচ উপায়ান্তরহীন। আমার হরেক দোষের ক্লাশে ফি বছর ফেল-করা পুরোনো ছাত্র কাম-বাসনা, তাকে ক্লাশ কামাই করতে দেখিনি কখনো। বর্ষায়, শরতে ও হেমন্তে এবং গ্রীষ্মে, শীতে ও বসন্তে হাজির থেকেছে সুবোধ বালকের মতোন, দিনের পর দিন। প্লেটোনিক প্রেম শব্দ যুগলকে কৈশোর পেরোবার পর ছাপা বইয়ের নিষ্কাম নির্জনতায় খুঁজে পেয়েছি কেবল। জিতেন্দ্রিয় নই, আমি পরাজিত হয়ে খুশি প্রবৃত্তির কাছে। তুমি মানে তাই, শরীরের শিশি-ভরা সুঘ্রাণ; ফিসফিস কথা ও শীৎকার; মধু-রঙা স্তন, তাল-তাল নরোমতা আঙুলের ডগায়; জিভের নিচে জমা ডাবের সরের সুস্বাদ, অফুরান। এই একাকিত্বকে তাই আততায়ী মনে হয়।

সন্ধ্যা

সন্ধ্যা ভয় ও ভালোবাসার পূর্বরাগ পর্ব। বারবার হেরে যাওয়ার ওয়ার্ম আপ সেশন। তার ব্যাকরণ পড়া হয় নাই আমার। হয়তো উষ্ণ ঠোঁটে ছুঁয়েছি তার কানের লতি, ফেলেছি গাঢ় নিঃশ্বাস গ্রীবার মসৃণে—তবু সে হিম ছড়িয়েছে, কুয়াশায় ঢেকেছে মুখ। আর ব্যর্থ হয়েছে সন্ধ্যাকে ঘিরে ছাতিমের তীব্র সুবাসিত আয়োজন। সন্ধ্যাকে কখনোই ঠিকঠাক খেলতে পারি না আমি, রাতকে তো নয়ই। সমূহ আনাড়িপনা নিয়ে তোমার কাছে সেকালের হাবশী খোজার মতোন নতজানু হই।

ফাতেমা তুজ জোহরা’র কবিতা : মা

আন্তোনিও পোর্কিয়ার ‘স্বর’ | ভাষান্তর—মুরাদ নীল

Comments are closed.