ট্রেড সিক্রেট’র বিকাশে ট্রিপস এগ্রিমেন্ট’র ভূমিকা

ট্রেড সিক্রেট ও ট্রিপস এগ্রিমেন্ট
ট্রেড সিক্রেট ও ট্রিপস এগ্রিমেন্ট

ট্রেড সিক্রেট মূলত ইনটেলেকচুয়াল সম্পদের অংশ। মূলত যে সাত ধরনের ইনটেলেকচুয়াল ধারণাকে (কপিরাইট, প্যাটেন্ট, ট্রেডমার্ক, ইন্ড্রাসট্রিয়াল ডিজাইন, ভৌগলিক নির্দেশনা সংক্রান্ত পণ্য, লে আউট এবং ট্রেড সিক্রেট) গণ্য করা হয় সম্পদ হিসেবে তার মধ্যে ট্রেড সিক্রেট ঝামেলাবিহীন, সাশ্রয়ী, মেয়াদের ঝক্কি-ঝামেলাবিহীন।

আদতে এ ট্রেড সিক্রেট কী? বিষয়টা খুবই সোজা। প্রত্যেক ব্যবসা-বাণিজ্যে কিছু গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়, এ গোপনীয়তা অনেক সময় হয়ে থাকে সাফল্যের অন্যতম রহস্য। ব্যবসার গোপনীয় তথ্যটিকে বলা হচ্ছে ট্রেড সিক্রেট। যেমন: কোকা কোলার তৈরি ফর্মুলা। আরেকটু ভিন্নভাবে বলতে গেলে, ব্যবসায়ের যে কোন ধরনের গোপনীয় তথ্য যেটি প্রতিযোগিতামূলক বাজারে অর্থনৈতিক ও নানান প্রতিযোগিতাপূর্ণ সুবিধা প্রদান করে থাকে, তাকে ট্রেড সিক্রেট বলে।

আর এ ট্রেড সিক্রেটে অন্তর্ভূক্ত ব্যবসায়ের: কারিগরি তথ্য-উপাত্ত, কাজের ধরন ফর্মুলা, রেসিপি, যে কোন ধরনের নতুন আবিষ্কার যা এখনো প্যাটেন্ট স্বত্ব পায়নি, উৎপাদন প্রক্রিয়া, কর্ম প্রক্রিয়ার ডায়াগ্রাম প্রভৃতি। আর এই গোপনীয় তথ্যগুলোর সুরক্ষার জন্য মূল ধারণা দেয় ট্রেড সিক্রেট আইন। যদিও এ ধরনের আইন পৃথিবীর অনেক রাষ্ট্রে এখনো এতোটা বিকাশ লাভ করেনি। তবুও যুক্তরাষ্ট্র, কোরিয়া, জাপান অনেকেই এ সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকে সুরক্ষার মাধ্যমে দেশীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে। বাংলাদেশের বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট এবং সকল ব্যবসায়ের উন্নতি সাধনে ট্রেড সিক্রেট সুরক্ষা আইন ভালো ভূমিকা রাখতে পারে। আমাদের পাশ্ববর্তী দেশ ভারতেও এ ধরনের আইন না থাকায় বারবার তাগাদা দিচ্ছে ইন্টেল’র মতো প্রতিষ্ঠান।

এখন আলোচনায় আসবো, ট্রিপস এগ্রিমেন্টকে কেন পৃথিকিৎ বলা হচ্ছে এ ট্রেড সিক্রেট বিষয়ে। ট্রিপস এগ্রিমেন্টের আগে ট্রেড সিক্রেটও অপ্রকাশযোগ্য তথ্যের বিষয়ে প্রথম সুরক্ষা প্রদান করে ‘প্যারিস কনভেনশন’র আর্টিকেল 10bis, এটি এখনো প্রচলিত আছে। তবে ঐ কনভেনশন শুধু ধারণা দিয়েছিল ট্রেড সিক্রেটের ব্যাপারে, যা ছিল অপ্রতুল। তাই দরকার ছিলো এমন এক কার্যকরী ব্যবস্থার যা ট্রেড সিক্রেটকে একটি কাঠামোগত অবস্থান দিবে, আওতা বা মাত্রা নির্ধারণ করবে, প্রয়োগ সংক্রান্ত ধারণা দিবে, এবং সমস্যা দেখা দিলে সমাধানের পথ নির্বাচনে সহায়তা করবে।

১ জানুয়ারি, ১৯৯৫ থেকে কার্যকর হওয়া ‘Trade Related Aspects of Intellectual Property Rights (TRIPS)’ আসে। এটি অন্যান্য ইনটেলেকচুয়াল সম্পদের পাশাপাশি ট্রেড সিক্রেটকেও কাঠামোগত রূপদানে সহায়তা করে। ট্রিপস এগ্রিমেন্টের আর্টিকেল ৩৯.২, ট্রেড সিক্রেট সম্পর্কে তিনটি বিষয় বেঁধে দেয়:

১. এ সুরক্ষা তখনি প্রযোজ্য হয় যখন বিষয়টি গোপন থাকে। (উদাহরণ: ম্যাগি নুডলস’র মসলার ফর্মুলা। এটি এতো বছর ব্যবসার পরেও তারা তাদের উপাদান মিশ্রণ প্রক্রিয়া পরিবর্তন ঘটায়নি এবং এটি গোপনীয় রাখা হয় তাদের নিজস্ব স্বাদ ও গন্ধ অটুট রাখার জন্য।)

২. গোপনীয়তার সাথে আর্থিক সম্পর্ক বিদ্যমান বা এটি স্বত্বাধিকারী ব্যতীত অন্য কারো ব্যবহারের ফলে আর্থিক ক্ষতি সাধন হতে পারে। (উদাহরণ: কেএফসি তারা তাদের নিজস্ব উপায়ে মুরগি রান্না করে ভোক্তাদের সরবরাহ করে। তবে তাদের এ রেসিপি যদি অন্য কেউ জেনে একই পদ্ধতিতে নকল খাবার তৈরি করে সরবরাহ করে সেক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে কেএফসি।)

৩. প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যাতে গোপনীয়তা বজায় থাকে। (ব্যাখা: কোন তথ্য যদি সহজলভ্য হয়, এ নীতির আওতায় সেটি ট্রেড সিক্রেট হবে না। তাছাড়া স্বত্বাধিকারী যদি তার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংরক্ষণে খাম খেয়ালি ঘটান ও সচেতন পদক্ষেপ না নেন সে ক্ষেত্রেও এটি ট্রেড সিক্রেটের আওতায় আসবে না।)

এছাড়া ‘manner contrary to honest commercial practices’ এর উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর আওতায় চুক্তিভঙ্গ, সদ্‌ বিশ্বাস ভঙ্গ, তৃতীয় পক্ষের ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃত ভাবে তথ্য প্রকাশ, অবহেলার কারণে ক্ষতিসাধন নানান বিষয়ের গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ট্রিপস এগ্রিমেন্টের স্বাক্ষরকারী সদস্য। স্বাক্ষরকারী সদস্য রাষ্ট্ররা ট্রিপস এগ্রিমেন্টের ছায়া অনুসরণ করে নতুন আইন প্রনয়ণ করতে পারে, তবে তাতে কোনোভাবে ট্রিপস এগ্রিমেন্টের মূলনীতি লঙন করা যায় না। ঠিক এ কারণেই একটি ছাতার নিচে যেন বিশ্বের অনেক রাষ্ট্রের সমন্বয় হচ্ছে।

এছাড়া, ট্রিপস এগ্রিমেন্ট’র আর্টিকেল ৪২-৪৯ এ আলোচনা করা হয়েছে দেওয়ানি ও কাঠামোগত অবস্থান, কার্যবিধির নিয়মাবলি, সুরক্ষা প্রদানের মৌলিক নিয়মাবলী। তবে এ ট্রিপস এগ্রিমেন্টের মাধ্যমে সুরক্ষাকে আরো জোরদার করতে প্রয়োজন রাষ্ট্রের নিজস্ব আইন ও নীতিমালা। অনেক রাষ্ট্রে এ ধরনের তথ্য ফাঁসকে ফৌজদারী আইনের লঙন হিসিবে দেখা হয়। যেমন তুরস্ক’ এ ধরনের চুক্তিভঙ্গের ফলে: বিকল্প পদ্ধতিতে বিরোধ মীমাংসা দায়, দেওয়ানি দায় বা ফৌজাদারী দায় জন্মায়।

বাংলাদেশে এ ধরনের আইন না থাকার ফলে এটি আমাদের অন্যান্য আইনের (যেমন: চুক্তি আইন, প্যাটেন্ট এন্ড ডিজাইন আইন, পেনাল কোড ইত্যাদি) কয়েকটি ধারা দ্বারা আশ্রিত হয়ে চলছে। যা দিয়ে কখনো পরিপূর্ণ সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব নয়।

তবে ট্রেড সিক্রেট ধারণা উন্নয়ন ও ক্রমবিকাশে ট্রিপস এগ্রিমেন্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশেষত পুরো বিশ্বের জন্য গ্রহণযোগ্য ও কার্যকর মডেল তৈরি করা সহজসাধ্য কাজ ছিল না। আর এসব সৃজনকর্ম সুরক্ষা প্রদানে যুগোপযোগী ধারণা আর পরিবর্তিত বিশ্বের সাথে খাপ খাইয়ে মূলনীতি ও সাম্যবস্থা রক্ষা করে মৌলিক পথ প্রদর্শক করেছে এ ট্রিপস এগ্রিমেন্ট। তবে এটাও সত্য এটি একটি মৌলিক কাঠামো, এর সুফল পেতে হলে এটিকে অনুসরণ করে সহায়ক আইন বানানো প্রয়োজন যেটি অনেক সমৃদ্ধশালী দেশ ইতিমধ্যে করে ফেলেছে।

তথ্যসূত্র:

১. Arif, A. 2016. Enforcement of intellectual property rights in Bangladesh: an appraisal. IOSR Journal of Humanities and Social Science, 21(4)(III):37-46

২. Khondker, B. H. and Nowshin, S. 2013. Developing national intellectual property policy for Bangladesh. World Intellectual Property Organization WIPO project, pp.26-2

৩. World Trade Organization’র ওয়েবসাইট প্রভৃতি।

পাদটীকা:

ট্রেড সিক্রেট সংক্রান্ত আরো বিস্তারিত আলোচনা এবং বিভিন্ন স্বাক্ষরকারী সদস্য দেশরা এ ট্রিপস এগ্রিমেন্টের মাধ্যমে কতোটা সফলতার সাথে ব্যবহার করছে তা নিয়ে ধীরে ধীরে আরো কয়েকটি পর্ব সংযুক্ত হবে।