‘ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি’ : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্বাক্ষী

মাছুম কামাল:: [কুমিল্লা জেলার বিভিন্ন ঐতিহ্য ও এর সংকট নিয়ে করা ধারাবাহিক ফিচারের চতুর্থ পর্ব এটি। এই পর্বে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় অবস্থিত ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি’ এর পটভূমি ও বর্তমানের বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হল।]

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহতদের একটি গণসমাধি যেখানে ২৩ জন সৈনিককে সমাধিস্থ করা হয়।

কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত ‘ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি’ যা ইংরেজ কবরস্থান নামেই অধিক প্রচলিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত বিভিন্ন দেশের ৭৩৬ জনের সমাধিস্থল যাদের স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়েছে ‘ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি’। যার মধ্যে ৩ জন নাবিক, ৫৬৭জন সৈনিক ও ১৬৬ জন বৈমানিক রয়েছেন।

নিহতদের মধ্যে রয়েছেন যুক্তরাজ্যের ৩৬৭ জন, কানাডার ১২ জন, অষ্ট্রেলিয়ার ১২ জন, নিউজিল্যান্ডের ৪ জন, দক্ষিণ আফ্রিকার ১ জন, অবিভক্ত ভারত (বর্তমান বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান’কে বুঝানো হয়েছে) এর ১৭৮ জন, রোডেশিয়ার ৩ জন, পূর্ব আফ্রিকার ৫৬ জন, পশ্চিম আফ্রিকার ৮৬ জন, বার্মা (বর্তমান মায়ানমার)এর ১ জন, বেলজিয়ামের ১ জন, পোল্যান্ডের ১ জন, ও জাপানের ২৪ জন সৈনিক।

এই ছবিতে শায়িত সকলেই অবিভক্ত ভারতের নিহত মুসলিম সৈনিক।

১৯৪১-১৯৪৫ সালে সংঘটিত হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ১৯৪১ সালে বার্মার প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত ব্রিটিশ ভারতীয় ও স্থানীয় সৈনিকদের দু’টি দূর্বল ডিভিশনে সংঘটিত করা হয়, যার একটি রেঙ্গুনের দক্ষিণ দিকের প্রবেশ পথ রক্ষার জন্য ও অপরটি (যার সাথে পরে চীনা সেনাবাহিনী যুক্ত হয়) মধ্য বার্মাকে পূর্ব দিকের আক্রমন থেকে রক্ষার জন্য।

কুমিল্লার মাতৃ ভাণ্ডার নাকি মাতৃ ভাণ্ডারের কুমিল্লা | মাছুম কামাল

১৯৪১ সালে জাপানিদের হামলার মধ্যে দিয়ে যুদ্ধের শুরু হয়। এই হামলার মূল উদ্দেশ্য ছিল চীনের অভিমুখে সমরাস্ত্র ও রসদ সরবরাহের পথ বার্মা রোড বন্ধ করা। কিন্তু ১৯৩৭ সাল থেকেই জাপান, চীনে যুদ্ধরত ছিল। এই হামলায় ১৯৪২ সালের ডিসম্বরে কিছু সাফল্যও পায় জাপান। কিন্তু পরবর্তী ছয় মাস এটি প্রতিহতও হয়।

গণকবরের নামফলক।

১৯৪৩ সালে দু’টি আক্রমণাত্মক হামলা হয়। আকিয়াব এলাকা পুনরুদ্ধার এর চেষ্টা চালানো হয়। মূলত ১৯৪৪ সালের মে মাসের দিকে জাপানের প্রধান আক্রমন শুরু হয়। এই হামলার লক্ষ্য ছিল মিত্রবাহিনীর অনুমেয় আক্রমন প্রতিহত করা ও আসামে অনুপ্রবেশ করে লোডো সড়ক এবং চীনে রসদ সরবরাহ করার জন্য ব্যবহৃত বিমানক্ষেত্রগুলি বিধ্বস্ত করা। পরবর্তী তিনমাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়। ১৯৪৫ সালের আগস্ট মাসে আনুষ্ঠানিক ভাবে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।

হুমকির মুখে কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী খাদি শিল্প | মাছুম কামাল

কুমিল্লা ছিল তখনকার সময়ে একটি অত্যন্ত বৃহৎ হাসপাতাল ও সমর সরবরাহ কেন্দ্র এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটি। ১৯৪৪ সালে ইমফলে পরিবর্তিত না হওয়া পর্যন্ত এই অঞ্চলটি ছিল চতুর্দশ সেনাবাহিনীর প্রধান দফতর।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রাণ দিয়েছেন প্রায় ৪৫,০০০ কমনওয়েলথ সৈনিক। যার মধ্যে রয়েছেন ২৭০০০ ভারতীয় সৈনিক। এদের অধিকাংশেরই বয়স ২২-৩০ এর মধ্যে। যাদের স্মৃতি সংরক্ষতি রয়েছে বার্মা, আসাম ও বাংলাদেশের নয়টি রণ সমাধিক্ষেত্রে। তবে, যে সকল নিহতদের শিয়রে নেই কোন স্মৃতিফলক কিংবা প্রস্তরফলক-তাদের মধ্যে রেঙ্গুনে সৈনিকদের ও সিঙ্গাপুরে অবস্থিত স্মৃতিপীঠে বিমানসেনাদের স্মৃতি সংরক্ষিত আছে।

নিহত খ্রিষ্টান সৈনিকদের স্মরণে নির্মিত ক্রুশ।

ভারতীয় ও ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ইতিহাসে দীর্ঘতম (প্রায় ১০০০ মাইল) পশ্চাদপসরণ দিয়ে সূচিত এই সমরাভিজান পরিণতি লাভ করে উত্তরের পথে বার্মা বিজয়ে, যা ইতিহাসের একটি অনন্য সাধারণ ঘটনা। তবে, কোনো যুদ্ধের ফলাফলই শেষ পর্যন্ত যতটা জয় কিংবা পরাজয়ের তারচে’বেশী দুঃখ এবং বেদনার। কেননা, জাতীয়তাবাদের দিক থেকে লাভ হলেও কিংবা নতুন মানচিত্রের ভূ-খণ্ড সৃষ্টি হলেও পৃথিবীর মানচিত্রে আরও বেশী কাঁটাতার কিংবা অসংখ্য মানুষের মৃত্যু মোটেই সুখকর নয়। যুদ্ধের বিবেচনায় নারী, শিশু সকলেই এক।

শালবন বিহারের জানা ও অজানা | মাছুম কামাল

কমনওয়েলথ যুদ্ধ সমাধি কমিশন কর্তৃক ‘ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি’ তৈরী করা হয় এবং বর্তমানে উক্ত সংগঠনটি এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত আছে।