আমি আসলে এক অস্থির চিত্তের চিঠি লিখিয়ে | ফেলিস বাউয়ারকে ফ্রান্ৎস কাফ্কা

[লেটারহেড : ওয়ার্কার্স অ্যাকসিডেন্ট ইনসিওরেন্স ইন্সটিটিউট]
প্রাগ, ২০ সেপ্টেম্বর, ১৯১২

প্রিয়তমা ,
খুব সম্ভবত আমার কথা আর আপনার মনে নেই। তাই, আমি ফের আমার পরিচয়টুকু দিয়ে রাখছি। আমার নাম ফ্রানৎস কাফকা এবং আমি সেই লােক, প্রাগে ডিরেক্টর ব্রডের  বাড়িতে এক সন্ধ্যায় যার সঙ্গে আপনার প্রথম পরিচয় হয়। আমি সেই লােক, যে টেবিলের বিপরীত প্রান্ত থেকে, হাত বাড়িয়ে, একে একে, আপনাদের সঙ্গে করমর্দন করেছিলাম। আমার ছবি, আপনি পাবেন থালিয়া ভ্রমণের ছবিগুলিতে। আমি সেই লােক, যে এখন, বড় আশা নিয়ে চাবির তােড়া নাড়াচাড়া করছে, আপনার হাত আঁকড়ে ধরতে চাইছে কেননা আগামী বছর আপনি তার সঙ্গে প্যালেস্টাইন বেড়াতে যাওয়ার পাক্কা ওয়াদা করেছেন। আর, সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষার ইচ্ছে যদি আপনার এখনও থাকে—হ্যাঁ, তার আগে বলে নিই, ওই ওয়াদা আপনি যখন করেছিলেন তখন কিন্তু, আদৌ অস্থির চিত্তে আপনি ছিলেন না, অস্থির চিত্তের বিন্দুমাত্র কোনও লক্ষণও আমি আপনার মধ্যে লক্ষ্য করিনি—তাহলে, শুধু যুক্তিযুক্তই নয় বরং এটা আমাদের উভয়ের ক্ষেত্রে জরুরি যে, অতি দ্রুত এ-ব্যাপারে আমাদের সমস্ত আলােচনা সেরে ফেলতে হবে। কেননা, আমাদের ছুটির দিনগুলির প্রতিটি মুহূর্ত, যে কোনও কারণেই হােক না কেন, খুবই সংক্ষিপ্ত বিশেষ করে প্যালেস্টাইন যাত্রার পক্ষে; আর সেই অসুবিধেটুকু আমরা অতিক্রম করে আসতে পারি খুব সহজেই, যদি এ বিষয়ে যতটা সম্ভব বিস্তৃত আলােচনা আমরা আগে থেকে সেরে নিই। এবং অথবা সমস্ত প্রস্তুতির ব্যাপারে আমাদের মধ্যে সহমত গড়ে ওঠে।

শুনতে যত খারাপই লাগুক বা না লাগুক বা এতে আমার অসুস্থ চিত্তের ছবি ফুটে উঠুক না কেন, আমি অবশ্যই স্বীকার করব যে, আমি আসলে এক অস্থির চিত্তের চিঠি লিখিয়ে। হ্যাঁ, আর আমার এই অস্থিরচিত্ততা আরাে মারাত্মক হয়ে ওঠে, যখন আমার হাতের কাছে টাইপরাইটার থাকে না; কেননা চিঠি লেখার ঠিক মেজাজ তৈরি না হলেও, আঙুল আমার সব সময় লেখার জন্য উশখুশ করে। অন্যদিকে, আমি কিন্তু কখনােই একটি চিঠি লেখার পর তার উত্তর না আসা অব্দি ধৈৰ্য্য ধরে শান্তভাবে বসে থাকেত পারি না। আবার, এমনও হয়—হয়ত চিঠি পাওয়ার জন্য দিনের পর দিন আশা নিয়ে বসে আছি অথচ চিঠি এল না। এসময় আমি বিন্দুমাত্র হতাশ হই না। আর শেষ অব্দি চিঠি যদি সত্যিই এসে পৌঁছয়, আকস্মিকতায়, বিস্ময়ে তখন চমকে উঠি। সাদা কাগজ নিয়ে লিখতে বসে বেশ বুঝতে পারি, আমি নিজে যা চাই তা ঠিকভাবে ফুটিয়ে তুলতে না পেরে, নিজেকেই আরও জটিল করে ফেলছি। আর, আজ যদি সে ভুল করে থাকিই, তাহলে আমার উদ্দেশ্য সফলই বলব, কেননা, তা না হলে শুধু শুধু, কেনই বা আমি ছ-ছটি ঘণ্টা একটানা অফিসে কাটিয়ে এই চিঠিটি এখনই, এভাবে লিখতে বসব বলুন? তাতে আবার এমনই একটি টাইপ রাইটারে,
যেটি আমি কখনােই ব্যবহার করি না। এবং তবু; হ্যাঁ, তবু—টাইপ রাইটার ব্যবহারের মূল অসুবিধেটুকু হল, এতে খেইটি বার বার হারিয়ে যায়—যদি সন্দেহ হয়, আমি কিন্তু বাস্তব সন্দেহের কথা বলছি, যে ভ্রমণসঙ্গী হিসেবে, প্রদর্শক হিসেবে, আমি আপনার পছন্দসই হয়ে উঠতে পারব না বা কোনও না কোনওভাবে আমি হয়ত আপনার বােঝা-ই হয়ে উঠব, পীড়াদায়ক বা অন্যকিছু, তাহলেও আশা করি চিঠিতে অন্তত সেটুকুই আগে থেকে জানিয়ে দিতে আপনার আপত্তি থাকবে না—এবং আগামী কিছুদিন সেটাই আমাদের চিঠির বিষয় হয়ে উঠুক।।

সেই ভালাে, আপনি আমাকে যাচাই করে নিন।

আপনার বিশ্বস্ত,

ডঃ ফ্রাৎস কাফকা
পােরিক ৭, প্রাগ

 

অনুবাদক : সৈয়দ সমিদুল আলম

টীকা-টিপ্পনী

প্রিয়তম বলে এখানে কাফকা ফেলিস বাউয়ারকে সম্বোধন করেছিলেন। ফেলিস ব্রাউয়ার সম্পর্কে কাফকার প্রেমিকা ছিলেন। বাউয়ার এর জন্ম ১৮৮৭ সালের ১৮ ই নভেম্বর, আপার সিলেশিয়ার ন্যুস্তাদ শহরে। কাফকার সঙ্গে প্রেমের বিচ্ছেদের ১৫ মাস পর ফেলিস বাউয়ার ১৯১৯ সালের মার্চ মাসে বার্লিনের এক ব্যবসায়ীকে বিয়ে করেন। ওই ঘরে ফেলিসের এক পুত্র ও এক কন্যা রয়েছে।

২) ম্যাক্স ব্রডের বাবা আ্যাডলফ ব্রড প্রাগের ইউনিয়ন ব্যাঙ্কের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি স্ত্রী এবং দুই সন্তান ম্যাক্স ও অটোকে নিয়ে স্যালেন গ্যাসেতে থাকতেন। এবং কন্যা সােভি-র বিয়ে দেন ব্যবসায়ী ম্যাক্স ফ্রিয়েডমান এর সঙ্গে। ম্যাক্স ফ্রিয়েডমান ফেলিস বাউয়ার এর ভাই।

 

ফ্রান্ৎস কাফ্কা

[su_divider top=”no”]

Franz Kafka
ফ্রান্‌ৎস কাফ্‌কা [জন্ম : ৩ জুলাই ১৮৮৩; মৃত্যু : ৩ জুন ১৯২৪]

ফ্রান্ৎস কাফ্কা ইহুদী পরিবারে জন্মেছিলেন ১৮৮৩ সালের ৩ জুলাই। তাঁর বাবার নাম হেরমান কাফ্‌কা। পেশায় ছিলেন একজন কসাই। তাদের আদিনিবাস ছিল চেক-প্রজাতন্ত্রে। কিন্তু উচ্চবিলাসী হেরমান কাফ্‌কা নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে প্রাগ-এ গিয়ে বসবাস করতে শুরু করেন। ফ্রান্ৎস কাফ্কার মায়ের নাম জুলি কাফ্‌কা। ছয় ভাইবোনের মধ্যে কাফ্‌কা বড় ছিলেন। কাফ্‌কা মাত্র ১৬ বছর বয়সে স্পিনোজা, ডারউইন, নীৎসে পড়ে শেষ করেন বলে জানা যায়। কাফ্‌কা মৃত্যুবরণ করেন ১৯২৪ সালে ৩ জুন ভিয়েনায় যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হয়ে। কাফ্‌কার বই হচ্ছে : মেটাফরমোসিস (১৯১২), ইন দ্যে পেনাল কলোনী (১৯১৪) ট্রায়াল (১৯২৫), দি ক্যাসল (১৯২৬) ও আমেরিকা (১৯২৭)

 

1 COMMENT

Comments are closed.