“ফিরে যাচ্ছে ফুল এক অন্তিম মাধবীলতার ঘ্রাণ”

কবিতা পড়ে বোধের গভীরে হারিয়ে যেতে না পারলে সে কবিতা শুধু পাঠে আরাম নেই। চিত্তের আরামের জন্যই হয়তো-বা মানুষ কবিতা পড়ে। মনের অব্যক্ত কথার সান্নিধ্য কবিতা ছাড়া শিল্পের আর অন্য কোন মাধ্যম কি দিতে পারে, তেমন করে? যে কথা, কবিতায় আমার বলার ছিল সে গাঁথা যখন অন্যের লেখায় বা ভাবনায় ধরা দেয় তখন পাঠক নড়ে চড়ে বসেন। সেরকম লেখা ভাবের আরো গভীরে নিয়ে যান পাঠককে— নিয়ে গিয়ে তারপর একা— মাঝ-সমুদ্রে ছেড়ে দিয়ে আসেন। ভাবনার পরিসর তখন জলের স্রোতের মতন বাড়তে থাকে। ভাবনার বিস্তারে তখন নিজের মতন করে ভাববার অবসর মেলে। এই যে পাঠককে ভাবের বাজারে ছেড়ে দেয়া এখানেই বোধ করি একজন কবির যথার্থ স্বার্থসাধন ঘটে, সিদ্ধি ঘটে।

কথাগুলো বলছিলাম—কবি শ্বেতা শতাব্দী এষ’র কবিতার বই ‘ফিরে যাচ্ছে ফুল’ কে সামনে রেখে। একটানা একটা ঘোরের মধ্যে তার কবিতাগুলো পড়া গেল বটে কিন্তু নিস্তার পাওয়া গেল না। কিসের নিস্তার চায় পাঠক? ভাবনার নিস্তার। ঘোরের, ঘোর থেকে বের হয়ে আরেক ঘোরের দিকে যেন নিয়ে যেতে চাইছে তার কবিতা। যেন নিস্তার নেই কোনো—আসুন ‘মোহ’ নামের কবিতা থেকে পড়ি,

‘তবু একটি অন্তিম মাধবীলতার ঘ্রাণে
পৃথিবীতে ঘোর নেমে আসে—’

সামান্য মাধবীলতার ঘ্রাণ থেকেও যে ঘোর নেমে আসতে পারে কবিতাটি পাঠের আগে হয়তো আমরা এভাবে ভাবিনি। তারপর এ ঘোর আমাদের শেষপর্যন্ত নিয়ে যেতে চায় মৃত্যু অবধি, কেন? ঐ একই কবিতার শেষ লাইনে কবি বলছেন, ‘মৃত্যুর আঙুল ধরে উচ্চারণ করে—জীবন সুন্দর!’ ‘ঘোর’ নামের আরেকটি কবিতায় আমরা দেখি—

‘চারদিকে যে দেয়াল, তার নাম ঘোর!
…..
তারপর একদিন ঘোর ভেঙে যায়।’

‘রোদকুয়াশা’ নামক আরেকটি কবিতায় ঘোর এসেছে অন্যভাবে।

‘হৃদয়ের একরোখা ঘোরে যে অহং লুকানো থাকে
তার থেকে দূরে—গুল্মবনে
একদিন খুব কাছে বসেছিল রোদ;’

ফিরে যাচ্ছে ফুল | শ্বেতা শতাব্দী এষ | প্রকাশনি ঐহিক | বইটির নির্ধারিত মূল্য ৮০ টাকা

যেন হৃদয়ের পাশে বসে রোদ পোহাতে চাইছে ঘোর। তার কবিতায় মৃত্যু চেতনা ফিরে ফিরে এসেছে। মৃত্যু চিন্তার চেয়েও যে বিষয়টি বারবার এসেছে তা হলো অসুখ। এই অসুখ যতটা না সুখহীনতার ততটা বেঁচে থাকার আকুল ইচ্ছার। এই গ্রন্থের যে কবিতাটি সবচে’ বেশি মনোযোগ আকর্ষণ করেছে সে কবিতাটির শিরোনামও এই ‘অসুখ’। কবিতাটির কিছু অংশ পড়া যাক—

‘বুকের ভেতর জমাট বরফের অসুখ
আমি অনেকদিন থেকে চেয়েছি।
মানুষের পুনরাবৃত্তি দেখতে দেখতে
দুচোখ ক্ষয়ে যাবার উপক্রম হয়েছে।
তারপরও সে অসুখ এখনো আসেনি!
বন্ধুরা অনেকেই আমাকে অসুখবিলাসী বলতো;’

হ্যাঁ, এইরকম যেচে কেউ নিজের অসুখ চাইতে পারে তাকে তো অসুখবিলাসী বলাই যায়! আজতক শুনিনি কেউ নিজের অসুখ নিজে চাইতে। কিন্তু মানুষের পুনরাবৃত্তি দেখতে দেখতে অতিষ্ঠ একজন মানুষ নিজেই চাইছে নিজের বুকে জমাটবরফ অসুখ। একজন আত্মকেন্দ্রিক মানুষ কতটা বিষণ্নতায় ভোগলে নিজের অসুখ কামনা করতে পারে কবিতাটি পাঠের আগে জানা হতো না! কিন্তু কবিতাটির শেষ লাইনে এসে যা দেখতে পাচ্ছি—এ অসুখ কী কেবল শারীরিক?

‘এইভাবে বরফ জমাট বাঁধার আগেই ক্রমশ ক্ষয়ে গেছে
আর আমার হৃদয় জেনেছে
মিলনে কোনোদিন সুখ আসেনি।’

তার কবিতায় অসুখ নানাভাবে ধরা দিয়েছে। বইয়ের ‘মূক’ শিরোনামের প্রথম কবিতাটির কথায় ধরা যাক—

‘একদিন মূক হতে হতে
ভাষাহীন হয়ে যাবে সমস্ত রাত।
…..
মানুষ একদিন এইভাবে মরে যাবে
না-বলার অসুখে!

শ্বেতার কবিতা আপাতদৃষ্টিতে সরল মনে হলেও একটা গভীর বোধ বা চিন্তা যেন তাড়া করে বেড়ায়। যেন একটা অসীমের দিকে যাত্রা করে তার কবিতা। আসুন আরেকটি কবিতা পড়ি তার-

‘এই হৃদয়ের কাছে যত সন্ধ্যার
একাকী নিষ্ঠুর চিত্রকল্প জমা আছে
আকাশের মতো তাদের রং মুছে দিতে দিতে
অন্ধকারকে কেবল বলবো
আমাকে জড়িয়ে ধরে রাখুন
পৃথিবীর করুণ বাঁশিওয়ালা যেভাবে বাজিয়ে যায়
কোমল রিষাভ…’

এই কবিতা পড়ে চিত্রকল্প বা আকাশের রং মুছে ফেলার আগে বরং আমরা আরেকটি কবিতা পড়ি।

‘অনেক দূরে সূর্য যেখানে ভ্যানগগের লাল হয়ে
মুছে দেয় এই জনপদের ক্লান্তিকর ঘাম—
আমাদের সংসার ভেসে যেত সেই দিকে
শ্যাওলা আর কচুরিপানার ফুলের গভীরে!’

কবিতাটি পাঠের পর আমাদের মনে হতে থাকে প্রকৃতি যেন ভ্যানগগের লাল চুরি করে নিজেই সাজিয়ে নিচ্ছে অবিকল ভ্যানগগের আঁকা কোন স্থিরদৃশ্য যেন।

কবি শ্বেতা শতাব্দী এষ

কবি শ্বেতা শতাব্দী এষের কবিতাগ্রন্থ ‘ফিরে যাচ্ছে ফুল’ পাঠে এটা আরো জোরালো হয় যে, এর মধ্যেই তার একটি নিজস্ব স্বর বা কাব্যভাষা দাঁড়িয়ে গেছে। শ্বেতার কবিতায় কোন চমক নেই, জোর করে কবিতা করার কোনো এক্সট্রা কারিকুরি নেই। তার কবিতায় ভাবের গভীরে তলিয়ে যাবার একটা উস্কানি আছে যেন। এতে করে আপাত সরল তার কবিতা পাঠে চিত্তের একটা আরাম পাওয়া যাচ্ছে। আশা করি বইটি পাঠক নন্দিত হবে। কবি নির্ঝর নৈঃশব্দ্যের প্রচ্ছদে বইটি করেছেন ওপার বাংলার প্রকাশনি ঐহিক। বইটির নির্ধারিত মূল্য ৮০ টাকা।