নিকানোর পাররা’র কবিতা : ভূমিকা ও অনুবাদ— মুরাদ নীল

নিকানোর পাররা। যাকে বিশ শতকের একজন গুরুত্বপূর্ণ লাতিন আমেরিকান কবি হিসেবে গণ্য করা হয়। জন্ম চিলিতে, ৫ সেপ্টেম্বর, ১৯১৪; মৃত্যু ২৩ জানুয়ারি,২০১৮, চিলি।

সোজাসাপ্টা, প্রতিবাদী, খোলামেলা কিংবা লুসিড স্টাইলের কাব্য ভাষার জন্য বিখ্যাত।যিনি নিজেই এগুলোকে প্রতি-কবিতা/ এন্টিপোয়েট্রি নাম দিয়েছেন।

পাররা মনে করেন, কবিতা মানুষের রোজকার মুখের ভাষা, খোলামেলা, নিয়ম / নৈতিকতার ধার না ধরা একটা ব্যাপার বা শিল্প। তিনি মনে করেন, কবিতায় সবই জায়েয।

পাররা জন্মগ্রহণ করেন চিলির একটা বড়, শিল্পমনা পরিবারে। তাঁর বোন ভায়োলেট্টা পাররা চিলির একজন বিখ্যাত ফোক সংগীত শিল্পী। পাররা প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনায় ছিলেন গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী। পড়াশোনা করেন ইউনিভার্সিটি অব চিলি, ব্রাউন ইউনিভার্সিটি,ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ড এর মতো প্রতিষ্ঠানে।

১৯৩৮ সালে বের হয় প্রথম কবিতার বই, নামহীন গীতিমালা( Cancionereo sin nombre)।

১৯৪৯ সালে বের হয় তুমুল আলোচিত,বিখ্যাত বই কবিতা ও প্রতিকবিতা ( Poemas y antipoemas)। এই কবিতাগুলো দিয়েই মূলত কবিতায় কমন স্পিচের ধারণাটা পাকাপোক্ত হয়।

১৯৫৮ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত আরো চারটি কবিতার বই প্রকাশ করেন।১৯৬৯ সালে পান চিলির জাতীয় সাহিত্য পুরস্কার।

১৯৭২ সালে প্রকাশিত কৃত্রিম সৃষ্টি ( Artefactos) বইটার সচিত্র কবিতাগুলোর জন্য বেয়াদবি, ব্লাসফেমি, নোংরামির অভিযোগে তুমুল সমালোচিত, আলোচিত হন।

১৯৮৫ সালের পর দীর্ঘ নীরবতায় চলে যান।২০০৪ সালে প্রকাশ করেন সেক্সপিয়রের কিং লিয়ার এর অনুবাদ। এই অনুবাদ দিয়ে পাররা নতুন করে তরুণ/ তরুণীদের মাঝে একজন রকস্টারের মতোই জনপ্রিয় হন।

ক্রনোস ( সময়)

চিলির সান্তিয়াগোতে
দিনগুলো বহুত লম্বা।
এক একটা দিন য্যান অনন্ত……..

সাগর সৈকতের ফেরিওয়ালাদের মতো
আমরা ঘুরি খচ্চরের পিঠে চড়ে।

হাই ওঠে আবার…..
যদিও সপ্তাহগুলো খুবই ছোট
মাসগুলো চলে যায় দ্রুত
আর বছরগুলো স্রেফ উড়ে চলে যায়।


যুবক কবিগণ

ল্যাখেন যা খুশি আপনাদের
য্যামনে মন চায় লিখতে।
অনেক রক্ত বয়ে গ্যাছে ব্রীজের তলা দিয়া।
শুধু এই কথা বিশ্বাস করাতে,
একটা মাত্র রাস্তাই সঠিক!

কবিতায় সবই জায়েয,
শর্ত শুধু একটাই–
সাদা পাতা গুলা যেন সাদা না থাকে!


মুদ্রাস্ফীতি

সবকিছুর দাম বাড়ে,খালি দাম বেড়ে যায়
ভাড়া বাড়ে, খালি ভাড়া বেড়ে যায়

সবকিছুর দাম আর ভাড়া দ্বিগুণ হয়…..

কাপড়ের দাম বাড়ে।

ক্যামন ফেঁসে গেছি আমরা শয়তানি ফাঁদে।

খাচার ভেতর খাবার আছে।
হয়তো বেশি খাবার নাই,কিন্তু আছে।

খাঁচার বাইরে বের হতে না পারলে মুক্তি নাই।


হুঁশিয়ারি

কোন প্রার্থনা চলবে না এখানে।হাঁচি দেয়া,থু থু ফেলা,প্রশংসা করা,হাঁটু গেড়ে বসে থাকা,পুজা দেয়া,গর্জন করা,কাশি দেয়া….. কিছুই চলবে না এখানে।

সব নিষিদ্ধ।

ঘুমানো যাবে না এই তল্লায়।
চিকিৎসা,ফিসফিসানি, বাতিল করা,দলবেঁধে গান,পালিয়ে যাওয়া, ধর-পাকড় সব নিষিদ্ধ এখানে।

দৌড়াদৌড়ি নিষিদ্ধ।

বিড়ি সিগারেট ফোঁকা নিষেধ।
নিষিদ্ধ চোদাচুদি।


দ্য লাস্ট টোস্ট

কেউ মানুক আর না মানুক,
আমাদের তিনটা মাত্র অপশ:
গতকাল, আজ আর আগামিকাল।

আসলে তিনটাও না।
কারণ দার্শনিকগণ বলেন,
গতকালতো গত!
গতকাল থেকে যায় শুধু আমাদের স্মৃতিতে।
যে গোলাপ থেকে খুলে নেয়া হয়েছে পাঁপড়ি, তার আর থাকে কী?

খেলবার মতো আছেও মাত্র দুই তাস!
বর্তমান আর ভবিষ্যৎ।
আসলে দুই তাসও না!

কে না জানে…?
বর্তমানের আসলে কোন অস্তিত্ব নাই।

শুধু যায় যৌবনের মতো তাকে ভোগ করা।

সবশেষে___
আমরা থেকে যাই শুধু আগামিকালের জন্য।

আমি চশমা আঁটি চোখে,
সেই দিন আর আসে না……

যাই হোক,
আমরা আছি তবু আমাদের নিয়ে।


ফিরিয়ে নিচ্ছি, যা কিছু বলেছি

পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবার আগে
আমার একটা শেষ ইচ্ছা,
মহামান্য পাঠক,
আমার বইগুলো পুড়িয়ে ফেলুন।
এই বইগুলো আসলে কিছুই না,
আমি যা কিছু বলতে চেয়েছি।

যদিও এগুলো লেখা হয়েছে রক্ত দিয়ে,তবুও এগুলো কিছু না,যা কিছু আমি বলতে চেয়েছি।

আমার চেয়ে দুঃখী আর কে আছে?
আমিতো আমার ছায়ার কাছে হেরে যাওয়া লোক।

আমার সমস্ত কথা প্রতিশোধ নিয়েছে আমার উপর।

পাঠক,মহামান্য পাঠক,
আমাকে ক্ষমা করবেন।

আমি যদি আপনাকে উষ্ণ অভিনন্দন জানিয়ে চলে যেতে না পারি,আমি চলে যাবো ভারাক্রান্ত মলিন হাসিতে।

এইতো আমি,আর কিছু না।

কিন্তু আমার শেষ কথাটা শোনেন।
আমি ফিরিয়ে নিচ্ছি,যা কিছু বলেছি আমি।
পৃথিবীর সমস্ত তিক্ততা আর অবসাদ নিয়ে বলছি___
আমি ফিরিয়ে নিচ্ছি সমস্ত,যা কিছু বলেছি আমি।


অনুবাদক : মুরাদ নীল

নোট: পাররার কবিতাগুলো এখানে কোনভাবেই আক্ষরিক অনুবাদ নয়। তবে মূল থেকেও সরে আসা হয় নি।