শ্যামল আমাদের শৈশবের মিহিদানা, লাড্ডু কিংবা লটারির আইসক্রিম

প্রিয় সৈকত দে,

আজ শ্যামলের জন্মদিন। ইচ্ছে করেই গঙ্গোপাধ্যায় বাদ দিলাম। খুলনা খালিসপুরের লোক। স্কুলের ফোতো। অথচ বিশ্বসাহিত্যে মাথা উঁচু করে রাখা একটা গল্প লিখেছিল শ্যামল সেই স্কুলের ফোতোগিরি নিয়ে। গল্পের নাম— ‘সেই মাছটা’।

তারপর তো সেই অনেক আগে, আমি যখন খানিকটা বিষাদ, প্রচন্ড অভিমান আর অনেক ব্যর্থতা নিয়ে হাবুডুবু খাচ্ছিলাম, সবার করুনা নিজের ভেতর আগুন ধরিয়ে দিচ্ছিলো, আর কি বলবো অনেক সত্য হুটহাট জেনে সেধে যাচ্ছিলাম নিজের ভেতর আর সুনীলের ‘পলাতক ও অনুসরনকারীরা’র মত ছুটে ছুটে আশ্রয় ভিক্ষে করছিলাম বিভাদের কাছে, ঠিক তখনই তুমি জানালে, হ্যাঁ দাদা, একজন লেখক আছেন। শ্যামল তার নাম। তুমি কি বিশ্বাস করবে যদি বলি ‘চন্দনেশ্বরের মাচানতলায়’ পড়ে বহুদিন আমি নিজের ভেতর হু হু করে কেঁদেছি; তুমি কি বিশ্বাস করবে সৈকত? আজকাল ভাই, লোকে অবিশ্বাসটাই যে আগে করে! কিংবা আগ বাড়িয়ে অপমান! তা যা বলছিলাম, তুমি হয়তো ভুলে গেছো, চর্চাপীঠের কোন এক অনুষ্ঠানে, আমার সেইসব রুপালি সৈকত জুড়ে চাঁদের রুপালি স্নানে, আবারও তুমি হাতে ধরিয়ে দিলে ‘পারুল ডাঙার লাল রাখাল।’

এখনও তাজা স্মৃতি সেই রাতের। সারা রাত ধরে পড়েছিলাম। কেঁদেছিও। আহা! জীবন কত দুঃখের। আর, দুঃখ কত খাঁটি। এখন বুঝি, সৈকত, দুঃখই ভাল। পুড়িয়ে খাঁটি সোনা করে। অতি সুখ চাপা দিয়ে রাখে আত্মা আর তার আলোকে। খানিকটা অসুস্থও কি করে দেয়না? হয়তোবা। তারপর তোমার কথামত অমর থেকে দশ দিগন্ত। একে একে সওদাগর, সরমা ও নীলকান্ত, জলপাত্র, স্বর্গে তিন পাপীসহ আরও কত কি! সব কি আর মনে থাকে। এবং অতঃপর তোমার সেই প্রথমা দিন সাধু কালাচাঁদ। আমরা বোধহয় সেই গো মুর্খ চ্যাপলিন নয়তো সেই পাগলা দাশু। খুঁজে পেতে সব সময় এমন সব জিনিস খুঁজি, বই পড়ি যা কিনা অনায়াসে মন খারাপ করে দ্যায়! আহা! সাতকানিয়া থাকতে আমাদের শাহরিয়ার ভাইয়ের বদৌলতে কি যে খনি পেয়েছিলাম! হাঁ করে যাকে কিনা বলা যায় তীর্থের কাক চেয়ে থাকতাম, কখন ফ্রাইডে আসবে। কখন যুগান্তরে সাহিত্য পাতা জুড়ে খুঁজে পাবো আমাদেরই এই জীবনের মধুর যত ভুল।

এই তিরিশে এসেও কি সটান চলে যেতে পারি সেই কুড়িতে। সেই নিউজপ্রিন্টের গন্ধ সমেত। তারপর তো কেবল কুবের সাধুখাঁ। কত কত দিন, কত কত রাত, দুপুর, সন্ধ্যা— সেই জামালখাঁন, চকবাজার, আন্দরকিল্লা, পতেঙ্গা, সিআরবি, কিংবা কর্ণফুলি কত কি ভেবে ভেবে পার করা! কুবেরকে মনে হোত চিনি। আমার পিতার সাথে বেশ মিলে যায়। কিংবা আমার বড় মামা। ওহ! বলতে ভুলে গেছি, সঞ্জীবকুমারকে ভালো লাগার আরও একটা কারন হলো, সঞ্জীবও তো এক কুবের সাধুখাঁ। আহা! কি চরিত্র কুবেরের ওস্তাদের যে কিনা আভা বৌদির জামাই, যে কিনা তার পিতার জীবনী লিখতে চায়, যে কিনা পাথরকে সাজিয়ে মন্দির গড়ে তোলো। শ্যামলকে ভাবলেই ফাগুন সিনেমার কথা মনে আসে। শ্যামল আমাদের শৈশবের মিহিদানা, লাড্ডু কিংবা লটারির আইসক্রিম। শ্যামলকে পড়লে বিভূতিকে পড়া হয়। আহা বিভূতি। আদর্শ হিন্দু হোটেল আর কেদার রাজা পড়ে হাউমাউ করে কাঁদতে হয়েছে কতবার! জীবনটা এত ছোট! অথচ এত মনি মাণিক্য ছড়ানো ছিটানো! কবে যে পড়ে শেষ করতে পারবো এইসব। আছেন ভালো নিজাম ভাই। কেনো আর পড়ো। তুমিও বেশ আছো। পড়ো আর দেখো। আমিই কেবল ক্রমাগত সব ছাড়তে ছাড়তে নিজের মটরদানার ভেতর সেঁধে যাচ্ছি। কিছুতেই যেন আর কিছু যায় আসেনা আমার! ভাবছি কি লিখবো? কেনইবা লিখবো? কিংবা লিখে কি হয়? শ্যামল থাকলে তাকে জিজ্ঞেস করা যেতো। তুমি এক প্রেমিক। খুব বড় দরের প্রেমিক তুমি। অত হয়তো আমি নই। আগে ভাবতাম আমার পথ বিপুল আর নানা।

এখন বুঝে গেছি ছোট্ট একটা উঠোন আর একটা গাব ভেরেন্ডার উঠোন ছাড়া আমার আর কোন পথ নেই। তোমার সন্দীপন আর শ্যামল প্রেম তুলনারহিত। কত কত দিন, রাত আমরা দু’জন এ দু’জনকে নিয়ে কথা বলে পার করেছি। চিঠি আজকাল লিখিনা। তোমাকে তবু লিখলাম। পারলে ভালো থেকো।