পাকিস্তানকে কাঁপিয়ে দিয়েছে ১১ বছরের হাম্মাদ সাফি

আকার-আকৃতি, অবয়ব ও মানবিক বৈশিষ্ট্যে দুনিয়ার সব মানুষ একই রকম। আনন্দ-বেদনা, ক্ষুধা-তৃষ্ণা, অনুভব আর মনোবৃত্তিতেও বড় কোনো তফাত নেই।

লাখো-কোটি সাধারণ মানুষের ভিড়ে কখনো এমন অসাধারণ কিছু মানবসন্তানের দেখা মেলে, যারা শুধু বৈশিষ্ট্য, চরিত্র ও মেধা-প্রতিভায় নয়, যোগ্যতা, দক্ষতা, কীর্তি ও অবদানে গোটা পৃথিবীকে চমকে দেন, ঋণী করে নেন নিজের সমাজ, দেশ, জাতিকে, কখনো বা পুরো বিশ্বকেও।

ইতিহাসের পাতায় পাতায় তাঁদের দাস্তান ও কৃতিত্বের উদ্ভাস ছড়িয়ে আছে। মহান আল্লাহর প্রেরিত পুরুষদের বিষয়টি একেবারেই স্বতন্ত্র। তাঁদের পর মানবেতিহাসের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের জন্ম ও আবির্ভাব প্রাচ্য-প্রতীচ্যে শুধু নতুন ইতিহাসই সৃষ্টি করেনি; ধরাপৃষ্ঠে আল্লাহ তাআলার কুদরতের নিদর্শন ও অপার নৈপুণ্যের বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

এমন কীর্তিমানদের নাতিদীর্ঘ তালিকায় দার্শনিক, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, গাণিতিক, কবি, সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, প্রকৌশলী, গবেষক, ভূতাত্ত্বিক, হাদিসবিশারদ, ধর্মতত্ত্ববিদ, আইনজ্ঞ, দাঈ—সবাই আছেন। ধর্ম, মতাদর্শ, চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি, রুচি, ঘরানা ও শ্রেণিভেদে সমাজের সব মানুষের কাছে মনীষী ও মহামানবদের মূল্যায়ন একই রকম নয়।

অ্যারিস্টটল, সক্রেটিস, আইনস্টাইন, আল খাওয়ারেজমি, ইবনে খালদুন, গাজ্জালি, শেকসপিয়ার, চার্লস ব্যাবেইজ, হাওয়ার্ড এইকিন, ইমাম আবু হানিফা, ইমাম বুখারি, শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া, নেপোলিয়ন, আলেকজান্ডার, সালাহউদ্দিন আইয়ুবী, শাহ ওয়ালিউল্লাহ, সাইয়েদ কুতুব, টিপু সুলতান, আনওয়ার শাহ কাশ্মীরি, আবু গুদ্দাহ আবদুল ফাত্তাহ, ড. ইকবাল, কাজী নজরুল ইসলাম—তাঁরা প্রত্যেকেই তারকাব্যক্তিত্ব ও মানবসভ্যতার অহংকার। তবু কেউ এমন নন বা হতে পারেন না যে মানুষ তাঁদের সব কিছুই গ্রহণ ও অনুসরণ করবে। এটা শুধু নবী-রাসুলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

যার যে দিকটি মানুষের জন্য, সমাজের জন্য, ধর্ম ও সভ্যতার জন্য কল্যাণকর ততটুকু গ্রহণীয়, অনুসরণীয় আদর্শ এবং এ জন্য তাঁদের কাছে আমরা ঋণী। তাঁদের কারিশম্যাটিক ব্যক্তিত্বের কতটুকু আল্লাহপ্রদত্ত আর কতটা স্বোপার্জিত, সেই বিতর্ক আজকের লেখার বিষয় নয়। আজকে আমাদের আলোচনা একজন আলোড়ন সৃষ্টিকারী খুদে বক্তার বিখ্যাত হয়ে ওঠা প্রসঙ্গে। তিনি আর কেউ নন, ছোট্ট বালক হাম্মাদ সাফি। আমরা এখানে তাঁর জন্য সম্মানসূচক ভাষারীতি ব্যবহার করব।

ইউটিউবে হাম্মাদ সাফির ‘মোটিভেশনাল স্পিচ’ বা উদ্বুদ্ধকরণ বক্তৃতার অনেক ক্লিপ পাওয়া যায়। আমি তাঁর কয়েকটি লেকচার ও দুটি সাক্ষাৎকার শুনেছি। পাকিস্তানের বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল তাঁকে টক শোতেও আমন্ত্রণ জানায়।

১১ বছরের বালক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সামনে অত্যন্ত সাবলীল ও আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে ভাষণ দিচ্ছেন। ছাত্র-ছাত্রীদের ইউটিউবে বারাক ওবামার বক্তৃতা দেখার মাধ্যমে নিজেদের ভাষাগত দক্ষতা আরো উন্নত করার আহ্বান জানাচ্ছেন। তাঁর জাদুকরী বক্তৃতায় মুগ্ধ শিক্ষার্থীরা। পরিপাটি পোশাকের হাম্মাদ সাফি এরই মধ্যে পাকিস্তানের একজন জনপ্রিয় ইন্টারনেট সেনসেশনে পরিণত হয়েছে।  

শিক্ষার্থীদের সামনে ডায়াসে ভাষণ দেওয়ার পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণেও পরিণত হয়েছেন একজন অনলাইন তারকায়। হাম্মাদ সাফির ইংরেজির শিক্ষক সামিউল্লাহ ওয়াকিল বলেন, ‘মানুষ তার কথার জন্যই তাকে ভালোবাসে; সে সব সময়ই সেরা। ’

ইউনিভার্সিটি অব স্পোকেন ইংলিশের ক্লাসে ফুলটাইম সময় দিতে একপর্যায়ে নিজের স্কুল ছাড়েন হাম্মাদ সাফি। ড. দার্শনিক কবি ইকবাল সম্পর্কে হাম্মাদ সাফি বলেন, তাঁর জন্ম না হলে আমাকে কিংবা যে কাউকে কোনো ইংরেজ পরিবারের টয়লেট পরিষ্কার করতে হতো। কোনো কোনো পর্যবেক্ষকের মতে, তিনি শুধুই বিস্ময় বালক নন, হয়তো বা আগামী প্রজন্মের আরেকজন ড. ইকবাল!

হাম্মাদ সাফির বক্তৃতায় ব্যবহৃত দুটি মোটিভেশনাল বাক্য হলো, ‘প্রতিটি সেকেন্ডই একটি চ্যালেঞ্জ’ ও ‘ব্যর্থতাই সফলতার ভিত্তি।’

১১ বছরের হাম্মাদ সাফি পুরো পাকিস্তানকে কাঁপিয়ে তুলেছেন। এ বিস্ময় বালকের কথা বলার ধরন এতটাই প্রাণবন্ত যে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাঁর বক্তব্য শোনেন। পাকিস্তানের ইউনিভার্সিটি অব স্পোকেন ইংলিশ ফ্যাকাল্টি তাঁকে এরই মধ্যে ‘খুদে প্রফেসর’ উপাধি দিয়েছে।

বৈশ্বিক বাস্তবতার চলমান প্রবাহে মুসলমানদের ঘরে হাম্মাদ সাফির মতো বিস্ময়কর ও অতুল প্রতিভার জন্ম ইসলামবিদ্বেষী পরাশক্তি ও সেমি পরাশক্তিগুলোর চক্ষুশূল আর মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠবে—এটা বোঝার জন্য গবেষক হওয়ার দরকার নেই। কাজেই তাঁর জীবনের নিরাপত্তাঝুঁকির বিষয়ে শঙ্কা তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। বিশেষত, তাঁর বক্তৃতার সূচনা ও সমাপ্তি হয় ইসলামী রীতি-নীতি অনুসরণ করে। তিনি নিজের আদর্শ পুরুষ হিসেবে উপস্থাপন করছেন মুসলিম উম্মাহর পুনর্জাগরণবাদী কবি আল্লামা ইকবালকে।

তাঁর পারিবারিক পরিচয় নিতান্তই সাদামাটা। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার ইচ্ছা হলে গুগল, ইউটিউব, উইকিপিডিয়া প্রভৃতি মাধ্যমে খোঁজ নিতে পারেন। মহান আল্লাহ যেন তাঁকে ইসলাম ও মানবতার একজন বড় খাদেম হিসেবে কবুল করেন এবং তাঁর জীবনের সর্বাঙ্গীণ নিরাপত্তা দান করেন। আমিন!


খন্দকার মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ। 

গ্রন্থকার ও অনুবাদক।

[email protected]চম

সূত্র: কালের কণ্ঠ