সফল নারীর গল্প: মানুষের বন্ধু বুলবুলি বেগম

[su_heading size=”22″]দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার চোরগাছা ইউনিয়িনের এক গৃহবধূ বুলবুলি বেগম। কৃষকের সন্তান বুলবুলির স্বামী মোঃ লোকমানও একজন কৃষক। বুলবুলি অল্প শিক্ষিত হলেও তার এলাকার নারী নির্যাতন বন্ধে কাজ করে যাচ্ছে । [/su_heading]

নিজের ক্ষেতে কাজ করছেন বুলবুলি বেগম

নিজ পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করছেন কৃষি ক্ষেত্রে। ঘোড়াঘাট এলাকার কোথাও নারী নির্যাতন হলে ছুটে যান বুলবুলি বেগম। তাদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। না পারলে মেম্বার চেয়ারম্যানের সাহায্য নেন।

বুলবুলির তিন সন্তান পড়া-লেখা করছে। বড় ছেলে অষ্টম শ্রেণী, মেঝ ছেলে নবম শ্রেণী এবং ছোট ছেলে ৪র্থ শ্রেণীতে। তাদের ঘিরেই আবর্তিত বুলবুলির স্বপ্ন। তাদের জন্যেই এত কষ্ট করা। ছেলেরা মানুষ হলে কথিত সংসারের ঘেরাটোপ থেকে মুক্তি পাবেন তিনি। নির্মাণ করবে নিজের স্বপ্নের কুঁড়েঘর। বুলবুলির স্বপ্নের সারথি বুলবুলি নিজেই।

সংগঠনের জন্যে তৈরি করা বুলবুলি পরিকল্পনা।

বুলবুলির সংসারে স্বামী আছেন কিন্তু জাতীয় পরিচয় পত্রে নিজের নামের পাশেই কেবল স্বামী লোকমানকে পেয়েছেন তিনি। স্বামীর ক্ষেত-খামার থেকে যা হয় তা দিয়ে সংসার ভাল মতোই চলে যাওয়ার কথা। কিন্তু পরিবারের পরিবর্তে টাকা খরচ করে নেশা করে। ক্ষেতে কাজ না করলে ভাত জুটে না সন্তানদের। সন্তানদের মানুষ করা যেখানে বাবার চিন্তা হওয়ার কথা ছিল সে বাবা জানেই না কোন ছেলে কোন ক্লাসে পড়ে। মা পড়ার খরচ দিতে না পারলে অন্যের ক্ষেতে কাজ করতে হয় তাদের।

স্বামীর বিষয় ছাড়া বুলবুলি বেগম সব দিক থেকে সুখে আছেন। সংসারে তার কোন অধিকার না থাকলেও বাইরে তিনি নির্যাতিত নারীদের বন্ধু। ঘরে অশান্তি তাকে কুরে কুরে খেলেও বাইরের মানুষের কাছে তিনি পরম বন্ধু। ঘরে নিজের কষ্ট কাউকে বলতে না পারলেও অন্যের কষ্ট সহ্য করতে পারেন না। মানুষের দুঃখ, দুর্দশায় ছুটে যায় বুলবুলি।

কল্পনাকে এলাকার বখাটে এক দল ছেলে রাস্তায় হেনস্ত করলে তার বাবা মা ছুটে আসে বুলবুলি বেগমের কাছে। চেয়ারম্যান, মেম্বার নানা অজুহাত দেখিয়ে বিচার এড়িয়ে যেতে চাইলেও বুলবুলি দমে যাওয়ার পাত্র নন। ইউএনওর কাছেও ছুটে যান। ইউএনও চেয়ারম্যানকে দায়িত্ব দেন। চেয়ারম্যান সবার সামনে ছেলেকে জুতা পিঠা করে এবং কানধরে উঠবস করায়।

এমনিভাবে গ্রামে নারী নির্যাতন, বাল্যবিয়ে, বহুবিয়েসহ সামাজিক নানা সমস্যায় ছুটে যান বুলবুলি বেগম। সমস্যায় পড়লে গ্রামের নারীদের শেষ ভরসাও বুলবুলি বেগম।

এলাকার ক্ষমতায়নের জন্যে যেমন কাজ করে যাচ্ছেন তেমনি নিজের ভাগ্য পরিবর্তনে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন বুলবুলি বেগম। স্বামীর উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে স্বাধীন হওয়ার সংগ্রাম করছেন তিনি। বুলবুলি বেগম দর্জি কাজ করেন পাশাপাশি বাণিজ্যিক ভাবে কেঁচোসার তৈরি করে বিক্রি করেন। লাউ, কুমড়া, মরিচ, পালং শাকসহ নানা জাতের সবজি চাষ করেছেন বাড়ির আঙ্গিনায়।

ইতিমধ্যে সামাজিক একটি শক্ত ভিত তৈরি হয়েছে বুলবুলি বেগম। তিনি সারা বাংলাদেশের সব চেয়ে বড় কৃষকদের সংগঠন বাংলাদেশ কৃষক মৈত্রীর ঘোড়াঘাট উপজেলার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি ‘সবুজ নারী কৃষক দলের’ হিসাবরক্ষকের দায়িত্ব সফলতার সাথে পালন করছেন। ঘোড়াঘাটের অনেক নারীদের মত বুলবুলি বেগমের সামাজিক ও আর্থিক মুক্তির নেপথ্যে কাজ করে যাচ্ছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা একশনএইড।

বুলবুলি বেগম বিশ্বাস করেন এলাকার নারীরা যে বৈষম্যের মধ্যে আছে তা থেকে একদিন মুক্তি পাবে। তিনি নিজেও একদিন স্বনির্ভর হবেন।  নিজের একটি ঘরে সন্তানদের নিয়ে বসবাস করবেন। বুলবুলির স্বপ্নের রথ একদিন ঠিকানা খুঁজে পাবে।