হেমন্তের শীতের পিঠা। ভাপা পিঠা, দুধ পুলি, দুধ চিতই

[su_heading size=”20″ margin=”30″]পিঠাপুলি বাংলাদেশের মানুষের হাজার বছরের ঐতিহ্য। হেমন্তে কৃষকের ঘরে আসে নতুন ফসল। গ্রামে প্রতিটি বাড়িতে তখন শুরু হয় পিঠা উৎসব। নতুন জামাই কে বরণ করা হয় হরেক রকম পিঠা দিয়ে। নতুন বউয়ের বাড়ি থেকে পাঠানো হয় নানা স্বাদের রকমারি পিঠা।[/su_heading] কৃষি থেকে শিল্পের উপর নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে দিন দিন। নগরে বাড়িতে বাড়িতে পিঠা নিয়ে নানা আয়োজন না থাকলেও, গ্রামে এখনো পিঠাপুলির ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। তায় বলে নগরের মানুষ পিঠার স্বাদ ভূলে যাবে তা কী করে হয়! শীত আসলেই শুরু হয় পিঠা উৎসব। পিঠা পাগল নগরের বাসিন্দারা এক সাথে পালন করে এই সব উৎসব। ভাল ভাল রেস্তরা গুলোতেও থাকে পিঠা নিয়ে নানা আয়োজন। আজকে জানবেন শীতকালীন পিঠার নানা পদ।

bhapa pitha

পিঠা ও বাঙালি ঐতিহ্য:

‘পৌষ পার্বণে পিঠা খেতে বসি খুশীতে বিষম খেয়ে/আরও উল্লাস বাড়িয়াছে মনে মায়ের বকুনি পেয়ে’  ‘পল্লী মায়ের কোল’  কবিতায় সুফিয়া কামাল পিঠার স্মৃতি চারণ করেন। তার মত অনেক কবি সাহিত্যিক তাদের লেখায় পিঠা পুলির বর্ণানা দিয়েছেন। আল মাহমুদ লিখেন- ঝালের পিঠা/ ঝালের পিঠা/কে রেঁধেছে,কে?/এক কামুড়ে একটুখানি/আমায় এনে দে’। শুধুই কি সাহিত্যে পিঠার স্থান হয়েছে? দাদীর কোলে বসে আমরা সবাই শুনেছি টুনি ও টুনার গল্প, শিয়াল মামার পিঠা ভাগাভাগির গল্প। পিঠা নিয়ে লোক সংগীতের সাধকরা বেঁধেছেন নানা গান। ভাওয়াইয়া গানে বেশ জনপ্রিয় একটি গান ‘ মনটাই মোর পিঠা খাবার চাই’ ।

পিঠা বাংলার লোক ঐতিহ্যের একটি অংশ। বাংলাদেশের নারীরা শিক্ষা দীক্ষা থেকে দূরে থাকলেও শিল্পকর্মে তাদের কাজ হাজার বছর ধরে প্রশংসিত হয়ে আসছে। শুধু দেশে নয় দেশির বাইরেও রয়েছে তার গুণগ্রাহী। নকশিকাঁথা, মসলিন, বাঁশবেত শিল্প, মৃৎশিল্পসহ নানারকম কুটির শিল্পের প্রধান কারিগর আমার দেশের প্রকৃতি শিক্ষায় শিক্ষিত নারীরা। পিঠাও নারীদের তৈরি ঐতিহ্যবাহী একটি শিল্প। হরেক রকম ঝাল, মিষ্টি পিঠাই দেখা যায় নানা ধরণের শিল্প কর্মের প্রভাব। এলাকাভেদে পিঠার ধরণ এবং নাম ভিন্ন হলেও  ফুল, পাখি, নকশা দিয়ে তৈরি করা হয় পিঠা। নানা সাইজের এই সব পিঠাই মায়ের দোয়া, মেহেদী রাত, শুভ জন্মদিন, স্বাগতম ইত্যাদি লেখাও দেখা যায়।

  • ভাপা পিঠা

    ভাপা পিঠা ছাড়া শীতকাল কল্পনায় করা যায় না। বাংলাদেশের সব অঞ্চলের মানুষের কাছে ভাপা পিঠা বেশ জনপ্রিয় পিঠা। ঐতিহ্যগতভাবে এটি একটি গ্রামীণ নাশতা হলেও বিংশ শতকের শেষভাগে প্রধানত শহরে আসা গ্রামীন মানুষদের খাদ্য হিসাবে এটি শহরে বহুল প্রচলিত হয়েছে। রাস্তাঘাটে এমনকী রেস্তরাঁতে আজকাল ভাঁপা পিঠা পাওয়া যায়। চট্টগ্রাম অঞ্চলে ভাপা পিঠা ঢুঁ’পিঠা হিসেবে পরিচিত।

    যা লাগবেঃ

    ২ কাপ চালের গুঁড়ো, ১ কাপ খেজুর গুঁড়ো, ১ কাপ নারিকেল গুড়া, স্বাদ মতো লবন, পিঠা বানানোর বাঁটি, একটি পাতিল, একটি ছিদ্রযুক্ত ঢাকুনি।

    প্রণালীঃ

    প্রথমে চালের গুড়া চালুনিতে করে চেলে নিতে হবে। এরপর চালের গুঁড়ার সাথে হালকা গরম পানি ছিটিয়ে, লবণ দিয়ে হালকা ভাবে মেখেনিন। দুধ দিয়েও চাউলের গুড়া মেখে নিতে পারেন। খেয়াল রাখবেন যেন দলা না বাঁধে। এখন হাঁড়িতে পানি দিন, হাঁড়ি উপর ছিদ্রযুক্ত ঢাকনিটি রেখে চুলায় বসিয়ে দিন, চুলাটি খুব অল্প আঁচে রাখুন, ঢাকনির পাশে ছিদ্র থাকলে তা আটা বা মাটি দিয়ে বন্ধ করে দিন। পাত্রের ৩ ভাগের ২ অংশ পানি দিবেন। মাখানো চাউলের গুড়া ঢাকনা দিয়ে ১৫-২০ মিনিট ঢেকে রাখুন। ১৫-২০ মিনিট পর মাখানো চাউলের গুড়া মাঝারি ছিদ্রের চালনা দিয়ে চেলে নেন।ছোট বাটিতে মাখানো চালের গুঁড়া নিয়ে তার মাঝখানে পরিমাণমতো গুড় দিন।এরপর ওপরে অল্প চালের গুঁড়া দিয়ে পাতলা কাপড়ে দিয়ে বাটির মুখ ঢেকে ছিদ্রযুক্ত ঢাকনির ওপর বাটি উল্টে তা সরিয়ে নিন। ২ থেকে ৩ মিনিট অপেক্ষা করুন। তারপর পিঠাটিতে নারিকেলের গুঁড়া ছড়িয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন।

  • দুধ পুলি পিঠা

    পুলি পিঠা বাংলাদেশের কমন একটি পিঠা। সারা বছরই পুলি পিঠার কদর থাকে। তবে শীতকালে পুলির বিশেষ কদর রয়েছে। নানা অঞ্চলে হরেক রকম পুলি পিঠা তৈরি হয়। আজকে যানবেন দুধ পুলি সম্পর্কে।

    যা লাগবেঃ  চালের গুঁড়া – আড়াই কাপ, ময়দা – আধা কাপ, পানি – দেড় কাপ, লবণ – আধা চা চামচ, ঘি – আধা চা চামচ, দুধ – দেড় কেজি, চিনি – স্বাদ মতো ; নূন্যতম এক কাপ, গুঁড়ো দুধ – প্রয়োজনীয়তা অনুসারে, কনডেন্সড মিল্ক – প্রয়োজনমত, নারিকেল কুড়ানো – দেড় কাপ, এলাচ – ২,৩টি।

    প্রণালীঃ

    পিঠার ভেতরে থাকা পুরের জন্য দেড় কাপ নারিকেল কুড়ানো আলাদা করে রেখে দিন। এখন বাকি নারিকেল কুরার সাথে পাঁচ থেকে ছয় চামচ চিনি দিয়ে ফ্রাইপ্যানে সাত থেকে আট মিনিট ভেজে উঠিয়ে নিন (মূলত নারিকেলের পানি শুকাতে যতক্ষণ লাগে আরকি) এই সদ্য প্রস্তুতকৃত পুর পিঠার ভেতরে দিতে হবে। ঘি দিয়ে ভাজলে স্বাদ ভাল পাবেন।

    এবার দুধের সঙ্গে গুঁড়াদুধ, চিনি, কনডেন্সড মিল্ক আর এলাচ মিশিয়ে জ্বাল দিন। পিঠা বানানো হতে হতে দুধ খুব সুন্দর জ্বাল হয়ে হালকা রং হবে। এখন অন্য পাতিলে পানির সঙ্গে লবণ এবং ঘি একসাথে দিয়ে গরম করুন। ফুটানো পানির সঙ্গে চালের গুঁড়া ও ময়দা একসাথে দিয়ে খুব ভালো করে মিশিয়ে নিয়ে চুলা বন্ধ করে দিয়ে খামির প্রস্তুত করে ফেলুন। রুটি বানানোর পিঁড়িতে গরম গরম খামির খুব ভালো করে মথে নিন।

    এখন খামিরটা ১০ ভাগ করুন। এক একটি ভাগ দিয়ে ছোট ছোট রুটি বেলে অথবা হাত দিয়ে চেপে পাতলা করে ভিতরে নারিকেলর পুর দিয়ে পুলিপিঠা প্রস্তুত করুন। এভাবে সব পিঠাগুলো তৈরি করে নিন। এখন বানানো পুলিপিঠা, ফুটিয়ে রাখা দুধের মধ্যে দিয়ে চুলার আঁচ কম রেখে ১০ মিনিট রান্না করে ফেলুন।

    হাঁড়ি আস্তে ঝাঁকিয়ে পিঠার সঙ্গে দুধ মিশিয়ে নিন। ১০ মিনিট রান্নার পর কুড়ানো নারিকেল দিয়ে আরও দুই থেকে তিন মিনিট রান্না করে নামিয়ে পাত্রে ঢেলে পরিবেশন করুন মজাদার দুধ পুলি পিঠা। প্রয়োজনে স্বাদবৃদ্ধির জন্য কিছুক্ষণ ফ্রিজেও রাখতে পারেন, একটু ঠান্ডা ঠান্ডা খেতে চাইলে!

  • দুধ চিতই

    যা লাগবে :পোলাও এর চাল বা আতপ চাল ৩ কাপ, লবণ সামান্য, খেজুরের গুড় দেড় কাপ, দুধ ৩ লিটার, মালাই ১ কাপ, দারচিনি ২ টুকরা, এলাচ ২টি, পানি ৩ কাপ।

    প্রণালী: পাত্রে পানি ও গুড় জাল দিন। দুধ মিশিয়ে আরও ৩০ মিনিট আগুনে রাখুন।

    এবার পরিমানমতো পানি চালের গুড়া ও সামান্য লবন মিশিয়ে মাঝারি ঘনত্বের গোলা বানিয়ে নিন।পিঠা গুলো তৈরি করবার জন্য মাটির খোলা বা লোহার কড়াই ব্যবহার করুন।কড়াইটি তেল দিয়ে মুছে মুছে চালের গুড়োর গোলা ঢেলে গোল গোল পিঠা তৈরি করে নিন।এবার আগের তৈরি করা গুড়ের সিরায় পিঠাগুলো দিয়ে একবার বলক এলেই চামচ দিয়ে সাবধানে নেড়ে দিন।চুলা থেকে নামিয়ে সারা রাত এভাবেই ভিজিয়ে রেখে পরদিন সকালে পরিবেশন করুন।


শহরে পিঠা রসিকদের প্রধান বাঁধা চাউলের গুড়া তৈরি করা। একসময় গ্রামে নারীরা ঢেঁকি দিয়ে চাউলের গুড়া তৈরি করত। তবে এখন চাউলের গুড়া তৈরি করার জন্যে আলাদা মেশিন রয়েছে। শহরে এই সুযোগ না থাকায় পিঠা বানানো রীতিমত কষ্টের কারণ। তায় বলে পিঠা না খেয়ে থাকবে তা ত হয় না।

ব্লেন্ডার দিয়ে সহজে চাউলের গুড়া তৈরি করতে পারেন। প্রথমে চাউল ভাল মত ধুয়ে নিন। চাউল থেকে ভাল করে পানি ঝরিয়ে নিন। এরপর ভাল মানের ব্লেন্ডার দিয়ে অল্প অল্প চাউল গুড়া করে নিন। অল্প সময়েই আপনি ঘরে বসে চাউলের গুড়া তৈরি করতে পারেন।