সুপ্রাচীন ধর্মসাগরপাড়ের পটভূমি ও এর অস্তিত্ব সংকট

মাছুম কামাল:: [কুমিল্লা জেলার বিভিন্ন ঐতিহ্য ও এর সংকট নিয়ে করা ধারাবাহিক ফিচারের ষষ্ঠ পর্ব এটি। এই পর্বে থাকছে কুমিল্লার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র ধর্মসাগরপাড়ের পটভূমি ও এর সংকট নিয়ে আলোচনা।]

ধর্মসাগরপাড়। তরুণ-তরুণীরা সংক্ষেপে বলে থাকেন ডি এস পি। কুমিল্লা শহর যখন ক্রমশ ইট-পাথরের নগরীতে পরিণত হচ্ছে, বিশাল বিশাল অট্টালিকায় ভরে যাচ্ছে শহর, তখন মানুষের একটুখানি প্রকৃতির সংস্পর্শে নিশ্বাস নেওয়ার ফুরসত মেলে এখানে-ধর্মসাগরপাড়ে।

পটভূমি: ধর্মসাগর পাড়ের একটি শিলালিপি হতে জানা যায় ১৪৫৮ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন ত্রিপুরার মহারাজা ধর্মামাণিক্য দীঘিটি খনন করেন। ত্রিপুরার ইতিহাস বা রাজমালা’ গ্রন্থানুসারে মহারাজা ধর্মমাণিক্যের শাসনামল ছিল (১৪৩১-৬২) খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। তৎকালীন সময়ে কুমিল্লা শহর ও এর আশেপাশের অঞ্চল ত্রিপুরা রাজ্যের অধীনস্থ ছিল। প্রজাদের পানীয়জলের সুবিধার্থে মহারাজা ধর্মমাণিক্য দীঘিটি খনন করেন। পরবর্তীতে তার নামানুসারে দীঘিটির নাম হয় ধর্মসাগর। পরবর্তীতে ১৯৬৪ সালে তদানীন্তন জেলা প্রশাসক মহোদয় এর উদ্যোগে দীঘিটির পশ্চিম ও উত্তর পাড় পাকা করা হয়।

আয়তন ও অবস্থান: দীঘিটি কুমিল্লা শহরের কান্দিরপাড়-বাদুরতলা এলাকায় অবস্থিত। বর্তমানে এর আয়তন ২৩.১৮ একর। ধর্মসাগর দীঘির উত্তর পাশে রয়েছে সিটি পার্ক। দীঘিটির পূর্ব পাশে কুমিল্লা স্টেডিয়াম ও কুমিল্লা জিলা স্কুল, পশ্চিম পাশে নগর উদ্যান ও পুলিশ সুপারের কার্যালয় অবস্থিত। দক্ষিণ পাশে একসময় কুমিল্লা মহিলা মহাবিদ্যালয় থাকলেও বর্তমানে এর ক্যাম্পাস অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছে। দীঘিটির উত্তর-পূর্বকোনে রয়েছে রাণীকুঠি এবং পৌরপার্ক/শিশুপার্ক, এবং নজরুল ইন্সটিটিউট।

বিবরণ: প্রতিদিন অসংখ্য দর্শনার্থী ও পর্যটকও আসেন ধর্মসাগরপাড়ে। এখানের সবুজ গাছপালা এবং দীঘির ঠাণ্ডাপানি-ছোঁয়া শীতল বাতাস মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দেবে। ছুটির দিনগুলোতে এবং বিশেষ-বিশেষ দিনে এখানে প্রচুর জনসমাগম হয়, থাকে উপচেপড়া ভিড়। শুধু যে সাধারণ মানুষ আসেন তা নয়, প্রচুর জ্ঞানী-গুণী শিল্পী এবং সাহিত্যিকরা বিভিন্ন সময়ে এখানে এসেছেন।

ধর্মসাগরপাড়ে অবস্থিত বর্তমান নজরুল ইন্সটিটিউট-এ একসময় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম দীর্ঘদিন অবস্থান করেছেন। এবং নজরুল ইন্সটিটিউট সংলগ্ন দীঘিরপাড়ের ঘাটে বসে অনেক বিখ্যাত কবিতা এবং গান লিখেছেন। হয়েছে বিভিন্ন নাটক ও ডকুমেন্টারির শুটিং। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯২১ সালের স্বদেশী আন্দোলনের প্রাক্কালে মহাত্মা গান্ধী সহ গোয়ালন্দঘাট হয়ে কুমিল্লায় এসেছিলেন, তখন তারাও এসেছেন ধর্মসাগরপাড়ে। বাংলা সাহিত্যের সবচে’ বড় কবিদের মধ্যে একজন আল-মাহমুদও ১৯৮৪ সালে এসেছিলেন ধর্মসাগর পাড়ে। এবং এখানকার সৌন্দর্য্যে মুগ্ধ হয়ে এখানে বসেই লিখেছেন,

“এখানে সবুজ দিয়েছে বুক পেতে
গুল্মলতা আকাশে ওঠে মেতে,
ছায়ার নাচে তোমার কথা ভাবি,
তুমিই বুঝি এই বাগানের চাবি।”

ইতিহাস, ঐতিহ্যের শহর কুমিল্লার জনগণের জন্য ধর্মসাগরপাড় যেন এক প্রশান্তির স্থান। শীতকালে এখানে আসে অতিথি পাখির দল। এছাড়াও প্রতিবছর এখানে মাছধরা উৎসব হয়। রয়েছে নৌকা ও ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ঘোরার ব্যবস্থাও। তখনকার আনন্দঘন পরিবেশ দেখার মত। কুমিল্লা নগরীর বর্তমান মেয়র জনাব মনিরুল হক সাক্কুর তত্ত্বাবধানে ধর্মসাগরপাড়ের যথেচ্ছ আধুনিকায়ন ও সৌন্দর্যবর্ধনও হয়েছে। যার ফলে আগের তুলনায় ধর্মসাগরপাড়ের প্রচুর পরিবর্তন হয়েছে।

সংকট: উন্নতি যেমন হয়েছে, তেমনি দখলও হয়েছে। একসময় ধর্মসাগরপাড়ে ‘ক্ষণিকালয় এবং শেষ বেলা স্ন্যাকসবার’ এই দু’টি দোকান ও সামাণ্য কিছু অস্থায়ী দোকান থাকলেও বর্তমানে প্রচুর পরিমাণ স্থায়ী-অস্থায়ী চটপটি-ফুচকা দোকানসহ নানান ধরণের দোকান। যার ফলে, দীঘি এবং পার্কটির স্বাভাবিক সৌন্দর্য অনেকাংশই বিনষ্ট হয়েছে। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, অধিকাংশই দোকানের মালিকরাই সরকারদলীয় নেতাকর্মী। এছাড়াও বিভিন্ন অপরিকল্পিত এবং ত্রুটিযুক্ত রাইডের কারণে ঘটেছে মৃত্যুর মত ঘটনা। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কিছুদিন বন্ধছিল পৌরপার্কও। কিন্তু, পরবর্তীতে আবারো প্রশাসনের উদাসীনতায় ত্রুটিযুক্ত রাইডগুলো চালু হয়। এখানেই শেষ নয়, প্রতিদিন ধর্মসাগরের ঘুরতে আসা দর্শনার্থীদের ফেলা চিপসের প্যাকেট ও প্লাস্টিকের পানির বোতলসহ বিভিন্ন বর্জ্য পানিতে ফেলার কারণে দীঘির পানি দূষিত হচ্ছে।

বিভিন্ন সংকট ও সমন্বয়ের মধ্যেও প্রতিদিনই ধর্মসাগরপাড় থাকে মুখরিত। ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই দীঘি এবং পার্কের পরিবেশ রক্ষায় প্রশাসন ও দর্শনার্থীরা আরেকটু যত্নশীল হলেই দূষনের হাত থেকে রক্ষা পাবে দীঘিটি, এমনটিই প্রত্যাশা এখানকার বাসিন্দাদের।