মেঘ শান্তনুর গুচ্ছ কবিতা: একা এই ঝরে যাওয়া বিকেলে

পিতা

বাবা একটু একটু করে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে কুয়াশায়

আমি পাটিগণিতের শেষ চ্যাপ্টার কমপ্লিট করে অপেক্ষা করছি,
রাত বাড়ছে, ঘুমে বুজে আসছে চোখ

সন্তানের বড়ো হওয়া দেখতে দেখতে কাঁচা পাকা দাড়ি, বোতামহীন শার্ট এর বাবা
মিশে যাচ্ছে অন্ধকারে

আকাশ কালো করে ঝড় উঠেছে
মুষলধারে বৃষ্টি নেমেছে ঘুমন্ত রাতের বুকে

আমি টর্চ হাতে নিয়ে খুঁজতে বেড়িয়েছি, আমার
কুড়ি বছর আগের হারিয়ে যাওয়া বাবাকে


নামাজ

আল্লাহ কে কেমন দেখতে রহমত জানেনা
শুধু জানে তিনি আছেন

নামাজের শেষে আকাশে উড়ে যায় সাদা কবুতর,
রহমত চেয়ে থাকে
দেখে-
বাড়িতে শুয়ে আছে পঙ্গু শিশু !
মেয়েটি বড়ো হয়ে উঠছে
রোগা বৌটি কাশছে
কাশতে কাশতে বের করে দিচ্ছে রক্ত

রহমত সারাদিন আল্লাহ কে ডাকে
তিনি সাড়া দেন না
তিনি দেখা দেন না

শুধু,

আরো আরো বেশি স্নেহ আর ভালোবাসা
ভরে দেন রহমতের চোখে…


যুদ্ধ

যেদিকে তাকাই দেখি দাউ দাউ আগুন

কারো হাতে তির-ধনুক
কেউ বা তুলে নিয়েছে রাইফেল
কেউ বা পেতে রাখছে ডিনামাইট

আমাকে যুদ্ধক্ষেত্রে নামিয়ে দিয়ে তাকিয়ে আছেন ঈশ্বর !

হাতে কোনো অস্ত্র দেননি !


ছায়া

বাবা নেই
বাবার লাগানো নিম গাছ একাকী দাঁড়িয়ে আছে উঠোনে

মেয়েটি গাছ কে বলেছে,
‘গাছ তুমি আমায় স্নেহ দাও’
‘গাছ তুমি আমায় আদর দাও..

গাছ কিছু বলেনি
শুধু দুলে দুলে উঠেছে হাওয়ায়

আর ছায়া ছড়িয়ে দিয়েছে তীব্র অপরাহ্নে

বাবার মতো ছায়া


দৃশ্য

ঋণগ্ৰস্থ হয়ে থাকি,
দেখি বৃষ্টির পর শেষ বিকেলে পেলব রোদ
যেন অভিমানী আলো ছড়িয়ে রয়েছে মাঠের উপর,
মৌন পথের উপর,
আকাশের দুঃখপ্রিয় মুখ চেয়ে আছে কৃষ্ণচূড়ায়, পিউদের বারান্দায়

এইসব দৃশ্যের ভেতর দিয়ে একটা পিচ রাস্তা চলে গেছে বহুদূর , প্যাঁ পুঁ শব্দে একটা রিকশা ছুটে যাচ্ছে গন্তব্যের দিকে…

সামনের বাড়ির কুমড়ো গাছে ফুটেছে অপাপবিদ্ধ হলুদ ফুল,
তার ঠিক নিচে দুটো বিড়াল-ছানা বিকেল জড়ো করে রাখছে ছাই এর উপর

সুখ কিংবা স্বাচ্ছন্দ্য নয়
মুঠোয় তুলে নিই চুপচাপ বসে থাকাটুকু, হিরন্ময় !

একা এই ঝরে যাওয়া বিকেলে-

কাউকে ভালোবেসে আঘাত পেতে ইচ্ছে হয় !


অনতিক্রম্য

ডানা মেলে দেওয়া নিষিদ্ধ হয়েছে বহুদিন,
সারাদিন ধরে আকাশ দেখছে পাখি !
ভাবছে, একবার সুযোগ পেলেই
ফিরে যাবে গাছ, পাহাড়, আকাশ, নদী
কিংবা পরিজনদের কাছে !

ভাবতে ভাবতে এগিয়ে যাচ্ছে নীরবতার দিকে

আত্মজীবনী লিখতে বসে আমি শুধু এটুকুই লিখেছি ৷