গরমে অতিষ্ঠ আপনার কী কী বিপদ ঘটতে পারে রাস্তার ঠান্ডা শরবতে!

গরমে অতিষ্ঠ হয়ে রাস্তায় ঠান্ডা শরবত কিনে খাচ্ছেন। আপনার কী কী বিপদ ঘটতে পারে জানেন? টাইফয়েড, হেপাটাইটিস এর কথা আজ বলব না। আজ যেটা কেউ বলে না সেটা নিয়ে বলি।

আপনি জানেন- আপনার শরীরে বিলিয়ন বিলিয়ন কোষ আছে। কোষের ফাঁকেফাঁকে কিছু তরল থাকে। এরা আসলে রক্ত। এই তরলের কাজ হল কোষগুলো খাবার দেওয়া।শরীরের বর্জ্য বের করে দেওয়া। শরীরকে শীতল রাখা। স্বাভাবিক রাখা।

এই তরল দুটো জিনিস দিয়ে তৈরি। পানি এবং লবণ (আরো অনেক জিনিস থাকে সেগুলো আলোচনার বিষয় নয়)। ধরা যাক, আপনি মীরপুর লিংক লিমিটেড বাসে বসে আছেন। গরমে জ্যামে বসে আপনার শরীরের তাপমাত্রা বাড়ছে। তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে একটা সময় অনেক বেড়ে যাবে। ফলে শরীরের ভেতর যে বিক্রিয়াগুলো হয়, সেগুলো থেমে যাবে। একটা সময় আপনি মারা যাবেন।

কিন্তু ঘেমে গেলেও মানুষ সহজে মারা যায় না কেন?

তাপমাত্রা কমানোর জন্য শরীরে কিছু স্পেশাল ঘটনা ঘটে। আপনি চাইলেও ঘটবে না চাইলেও ঘটবে। তাপমাত্রা কমানোর প্রাথমিক প্রক্রিয়া হিসেবে…আপনি ঘামতে শুরু করবেন। ঘেমে গেলে শরীর থেকে ঘাম বের হবে। ঘেমে যাওয়া খারাপ নয়। ঘেমে গেলে আপনার শরীরের তাপমাত্রা কমতে শুরু করবে। আপনি বেঁচে গেলেন। এটাকে বলে- থার্মো রেগুলেশন।

নতুন একটা ব্যাপার শুরু হবে এবার। ঘাম বের হলে শরীরে কিন্তু পানি কমে গেল। পানি কমে গেলে খবর চলে যায় মাথায়। মাথায় থাকে থার্স্ট সেন্টার (তৃষ্ণা সেন্টার)। তৃষ্ণা সেন্টার আপনাকে খবর পাঠাবে। তৃষ্ণা লেগেছে। পানি খাও।
কীভাবে খবর পাঠাবে? আপনার মুখ শুকিয়ে গেছে। জিহ্বা শুকিয়ে গেছে। শরীর দূর্বল হয়ে গেছে।

এবার, আপনি পানি খাবেন, তৃষ্ণা সেন্টার খুশি হবে। এবার সে চুপচাপ হয়ে যাবে। শারিরীকভাবে আপনার ভালো লাগবে।

শহরে ঘামে বিরক্ত হয়ে তৃষ্ণায় আমরা কী কিনে খাই?

হয় দোকান থেকে বোতল ভরা পানি কিংবা রাস্তায় দশ টাকা দিয়ে শরবত।

এগুলো খেলে কী হতে পারে?

আপনি যদি শুধু মামের ঠান্ডা পানি কিনে খান, ঠান্ডা জলের জন্য আপনার হয়তো সাময়িক ভালো লাগবে কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার তৃষ্ণা লাগবে। আবার খেতে ইচ্ছে করবে। কেন?

কারণ আপনার ঘাম হয়েছে। ঘামের সাথে পানিও যেমন বের হয়েছে, লবণও বের হয়েছে। আপনি পানি খেয়েছেন কিন্তু লবণ খাননি। তাই আবার একই ঘটনা ঘটবে।

আপনি যদি শরবত কিনে খান, শীতল জলের জন্য আপনার শরীরে ভালো লাগবে। যেহেতু শরবতে লবণ আছে তাই আপনার পানি এবং লবণ দুটোর ঘাটতিই পুরণ হবে।

এবার আসি, কেন শরবত কিনে খাওয়া রিস্কি?

আপনার স্যামসাং J 7 মোবাইল থেকে ব্যাটারি খুলে নেওয়া হল। আপনাকে দেওয়া হল দামী আইফোনের ব্যাটারি। সেই ব্যাটারিতে স্যামসাং মোবাইল চলবে? খাপে খাপে বসাতে পারবেন?

পারবেন না। আপনাকে একই মোবাইলেই ব্যাটারি ছাড়া চলবে না। ব্যাটারিহীন আপনার মোবাইল নষ্ট, ব্যবহারের অযোগ্য।

শরীরের ভেতর থেকে যে পানিটা বের হয়ে যায়, সেই পানিতে লবণের একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ আছে। আধ লিটার পানিতে যদি একটা ওরস্যালাইন দেওয়া হয়, পানিটা যেমন লবণাক্ত হবে (ঘনত্ব), আমাদের শরীরের ভেতরের পানিগুলো (রক্ত) তেমনই লবণাক্ত (ঘনত্ব)।

যদি আধ লিটার পানিতে অর্ধেক স্যালাইন দেওয়া হয় কিংবা আধ লিটার পানিতে দুটো স্যালাইন গোলানো হয়, সেটা আমাদের শরীরের তরলের (রক্ত) সাথে ম্যাচ করবে না।

যদি শরবত বা স্যালাইনে বেশি লবণ হয়ে যায় তাহলে কী ঘটবে?

কোষের ভেতরেও পানি থাকে, কোষের বাইরেও পানি থাকে। যদি বেশি লবণের পানি খেয়ে ফেলি তাহলে কোষের বাইরে লবণ বেশি হবে। তখন কোষের ভেতর থেকে পানিগুলো চুয়েচুয়ে কোষের বাইরে চলে আসবে। এটা বিপদজনক। কারণ কোষের ভেতর নির্দিষ্ট পরিমান পানি না থাকলে বিক্রিয়াগুলো ঠিকঠাক হয় না। কোষের ভেতর অতি ক্ষুদ্র অঙ্গানুগুলো কাজ বন্ধ করে দিয়ে মারা যায়। ফলে একটা সময় আপনি দূর্বল হতে শুরু করবেন। এমনকী মারাও যেতে পারেন। শরীরে পানি না থাকলে কিন্তু কিডনি বিকল হয়ে যায়।মানুষ মারা যায়।

যদি আধ লিটার পানিতে কম স্যালাইন দিয়ে খান (কিংবা এক লিটার পানিতে একটা স্যালাইন দিয়ে খান তাহলেও কিন্তু তুলনামূলক লবণের ঘনত্ব কম) তাহলে কী ঘটবে?

কোষের ভেতরে লবণ বেশি থাকবে। কোষের বাইরে লবণর চেয়ে পানি বেশি থাকবে। তখন কোষের বাইরের পানিগুলো চুয়েচুয়ে আমাদের কোষের ভেতর প্রবেশ করবে। কোষে অতিরিক্ত পানি জমতে জমতে সে ফুলে যাবে। একটা সময় ভেতরের সব বিক্রিয়া বন্ধ হবে। অঙ্গানুগুলো ফুলতে ফুলতে ফেটে যাবে। তখন আপনি মারা যেতে পারেন।

সঠিক উপায় কী? গরমে ঘাম হয়েছে?

ঘামের পরিবর্তে নির্দিষ্ট মাপে স্যালাইন খাবেন। স্যালাইন এক চুমুক খান আর পুরো আধ লিটার খান সেখানে যেন লবণের ঘনত্ব ঠিক থাকে।

ঘনত্ব কীভাবে মাপবেন?

আধ লিটার পানিতে একটা ওরস্যালাইন ঢেলে দিবেন। এরপর খাবেন। টেস্টি স্যালাইন কিংবা অন্য স্যালাইন না ব্যবহার করা ভালো। এগুলো মিস্টি। খেতে মজার কিন্তু নির্দিষ্ট অনুপাতে লবণ থাকে না। এগুলো বরং আরো রিস্কি।

স্যালাইন কতটুকু খাবেন?

নির্দিষ্ট হিসাব নাই। আপনার যতটুকু খেলে ভালো লাগবে। (ডায়রিয়া, কলেরার ক্ষেত্রে অন্য হিসাব)।

ঠান্ডা খাবেন নাকি গরম?

ঠান্ডা খেতে সমস্যা নাই। গরম না খাওয়াই ভালো। পানি বিশুদ্ধ হলেই (গরম করে শীতল করতে পারেন বাসায়) হল। কিংবা বাজার থেকে বোতলজাত পানি (ঠান্ডায় সমস্যা নাই) কিনে স্যালাইন বানাতে পারেন।

গরমে অফিস করার সময়, স্কুল কলেজ কোচিং এ যাবার সময় আপনার ব্যাগে বই, খাতা ডকুমেন্ট, মোবাইল, চার্জারের সাথে ওরস্যালাইন থাকা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। এই পাঁচ টাকার প্যাকেটটা আপনাকে এক মিনিটেই বাঁচিয়ে দিবে।

বিশ্বাস হচ্ছে না? হাসপাতালে যত ডায়রিয়ার রোগী মারা যায়, তার অধিকাংশই কিন্তু স্যালাইনের অভাবে নয়, বরং ভুলভাল স্যালাইন খাবার জন্য। প্রত্যেকের এই ব্যাপারটা জানা থাকা উচিৎ। আপনার সাথে আপনার স্ত্রীর ক্ষেত্রেও। কারণ সে আপনাদের সন্তানকে বড় করছে। সন্তানের ডায়রিয়া হবেই জীবনে কখনো না কখনো। সঠিকভাবে স্যালাইন খাওয়াবে, সন্তানের কিছুই হবে না। ভুলভাল খাওয়াবে তো…বুঝতেই পারছেন।

নোটঃ হাসপাতালে অধিকাংশ বাচ্চা ডায়রিয়ায় মারা যায় স্যালাইন না খাওয়ানোর জন্য না। ভুলভাল স্যালাইন খাওয়ানোর জন্য। অনেকের ধারণা পানি কম দিয়ে স্যালাইন বেশি দিলে ভাল ও বেশি কাজ হবে। কান ধরে তওবা করে নিন। স্যালাইন না খাওয়ার চেয়ে ভুলভাল খাওয়া বেশি রিস্কি। অনেক বাচ্চাদের হাতে নিয়ে স্যালাইন চেটে খেতে দেওয়া হয়। এটা জীবনে কখনো করবেন না। যা জীবন বাঁচায়, তা জীবন কেড়েও নেয়।

একটা সময় পৃথিবীতে লাখে লাখে মানুষ কলেরায় মারা যেত। যে এলাকায় কলেরা হত পাশের এলাকার মানুষজন ভয়ে পালিয়ে যেত। কবর দেওয়া তো দুরের কথা। কেউ আসত না। তাদের লাশ খেয়ে যেত শেয়ালে শকুনে।

আজ থেকে ত্রিশ চল্লিশ বছর আগেও এমন ঘটত বাংলাদেশে। এখন শুনতে পান? পান না কেন?
কারণ এই বাংলাদেশেই এক মুঠো গুড়, এক চিমটি লবণ আর আধসের পানির মিশ্রণের খাবার স্যালাইনের ফর্মুলা আবিষ্কার হয়েছে। এই একটা ফর্মুলা কোটিকোটি মানুষের পুর্বপুরুষদের বাঁচিয়েছে। এই গুড়-লবণ-আধসের পানির হিসেবটাই হল ওরস্যালানের পাঁচ টাকার প্যাকেট। যাদের প্যাকেট নাই তারা হাতে বানাবে।

রাস্তার স্যালাইন খাওয়া কেন বিপদজনক?

এরা দেখবেন বোতল থেকে বীট লবণ ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে গ্লাসে দেয়। কিংবা চামুচ দিয়ে গ্লাসে দেয়। এরা জানেই না কতটুকু পানিতে কতটুকু দিলে মানুষ বেঁচে যাবে। বিপদ হবে না। আপনি সেটা খাবেন। কিছুক্ষণ ভাল লাগবে। এরপর? আবার একই ঘটনা ঘটবে। আরো ঘাম ঘাম হবে। আরো পানি বের হয়ে যাবে শরীর থেকে। আগের চেয়েও বেশি তৃষ্ণা লাগবে।

আগে ঘামের পর যতটুকু এনার্জি নিয়ে কাজ করতে পারতেন, তার চেয়েও বেশি দূর্বল হয়ে যাবেন।

আর কাজই করতে পারবেন না। শরীর দূর্বল লাগবে। কেন দূর্বল লাগছে আপনি ধরতেই পারবেন না। নিজেকে রিচার্জ করার জন্য টাকা দিয়ে কিনে খাবার পর যদি উল্টো আর এনার্জি ড্রেইন করে ফেলেন, সেটা কী টাইফয়েড-হেপাটাইটিস-আলসার-কিডনি রোগের চেয়ে আরো বেশি ক্ষতি করে ফেলছেন না?

আরো অনেক ভয়ংকর ব্যাপার আছে। আজ বলব না। শেষ করি। শুধু বলি, আর কী কী নিয়ে আলোচনা করা যেত।
১। পানিতে চিনি নয়, স্যাকারিন দেয়। চিনি তো মানুষের জন্য বিষ। স্যাকারিন আরো ভয়ংকর বিষ।
২। বরফ কল থেকে মাছে দেওয়া বরফ আনে। ভ্যানে দড়ি দিয়ে বেঁধে বরফ আনে, ধুলোবালি পড়ে। সেসব আপনার পেটে যায়।
৩। বাসায় আপনি যে পানিটা ফুটিয়ে খান, সেটা বরফকলে বরফ বানানোর আগে সেই সাপ্লাইয়ের পানিটাই ফোটানো হয় না। ভাবুনতো, সাপ্লাইয়ের পানি না ফুটিয়েই আপনাকে শরবত বানিয়ে খাওয়াচ্ছে, কেমন লাগে?
৪। ট্যাপের পানি মানেই টাইফয়েডের জীবানুর শরবত। খোলা জায়গায় শরবত খাওয়া মানেই হেপাটাইটিসের জীবানু খাওয়া।
৫। কিডনি রোগ, লিভারের রোগ, গ্যাস্ট্রিক, আলসার নিয়ে আপনার ভয় আছে, আপনি তো গ্রেট রিস্কে আছেন।

শরীর সবচেয়ে বড় ডাক্তার। খেলে যেমন রোগ হয়, খেলে তেমন রোগ নাও হতে পারে। কারণ আমাদের শরীরের মেকানিজম আমাদের রক্ষা করে। কিন্তু কতদিন?

রোগ প্রতিদিন না হলেও প্রতিদিন যে শারিরীক এনার্জি এভাবে নষ্ট হচ্ছে, উল্টো দূর্বল হয়ে গা এলিয়ে পড়ে থাকছি, এটা কি আমাদের একটু একটু করে কর্মক্ষেত্রে থেকে পিছিয়ে দিচ্ছে না?
শুধু স্যালাইন-পানি খেয়ে যে এনার্জিটা পেতেন, টাকা খরচ করে উল্টো সেই এনার্জিটা নষ্ট তো করলেনই। উল্টো নিজের শরীরের ক্ষতি করলেন।

একটু অন্যভাবে বলি- নিজের টাকা দিয়ে নিজের শরীর বিক্রি আর কত?