ভয়াবহ অ্যান্টিবায়োটিকের কবলে বিশ্বের নদীগুলো

মানুষের পাশাপাশি নদীগুলোও মাত্রাহীন অ্যান্টিবায়োটিকে আক্রান্ত। ভোলগা থেকে গঙ্গা বা টেমস থেকে টাইগ্রিস—বিশ্বের শত শত নদীর পানিতে বিরাজ করছে বিপজ্জনক মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক। একটি বৃহত্তম আন্তর্জাতিক সমীক্ষায় এসব তথ্য পাওয়া গেছে। এমনটাই জানাচ্ছে ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান।

ব্যাকটেরিয়া যে মানুষের জীবন রক্ষাকারী ওষুধকে প্রতিরোধ করতে শুরু করেছে, তার অন্যতম কারণ অ্যান্টিবায়োটিক দূষণ। এ প্রতিরোধক্ষমতা অ্যান্টিবায়োটিকগুলোকে মানবদেহে ব্যবহারে অকার্যকর করে তোলে। ইউনিভার্সিটি অব এক্সেটারের মাইক্রোবিয়াল (অণুজীববিষয়ক) ইকোলজিস্ট অধ্যাপক উইলিয়াম গেজ জানান, মানুষের প্যাথোজেনে প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন বহু জিন পরিবেশে থাকা ব্যাকটেরিয়া থেকে উদ্ভূত।

গত মাসেই জাতিসংঘ অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার উত্থানকে ‘গ্লোবাল হেলথ ইমার্জেন্সি’ ঘোষণা করেছে। ২০৫০ সাল নাগাদ এক কোটি মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া।

সাধারণত মানব ও পশু বর্জ্যের মাধ্যমে নদী ও মাটিতে অ্যান্টিবায়োটিক পৌঁছে যাচ্ছে। এছাড়া বর্জ্য পানি শোধনাগার এবং ওষুধ উৎপাদন কারখানাগুলো থেকেও অ্যান্টিবায়োটিক মাটি ও নদীতে মেশে। পুরো বিষয়টিকেই ভীতিকর ও হতাশাজনক বলে উল্লেখ করেছেন ইউনিভার্সিটি অব ইয়র্কের পরিবেশবিজ্ঞানী ও গবেষণার সহলেখক অ্যালিস্টার বোক্সাল। তিনি বলেন, পরিবেশের বৃহত্তর অংশে এমন উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক থাকতে পারে, যা প্রতিরোধক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলার জন্য যথেষ্ট।

ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিংকিতে এক সম্মেলনে গবেষণাটি উপস্থাপন করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, টেমসের মতো বিশ্বে বহুল পরিচিত নদীগুলো জটিল সংক্রমণ চিকিৎসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে শ্রেণীভুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক দ্বারা দূষিত। বহু ক্ষেত্রেই নদীগুলোতে বিপজ্জনক মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক শনাক্ত করা হয়েছে। যার অর্থ ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে আরো দ্রুত প্রতিরোধ গড়ে উঠতে এবং তা ছড়িয়ে পড়তে পারে।

অস্ট্রিয়া অংশে দানিয়ুব থেকে সংগৃহীত নমুনাগুলোতে ক্ল্যারিথ্রোমাইসিনসহ সাতটি অ্যান্টিবায়োটিক নিরাপদ মাত্রার চেয়ে প্রায় চার গুণ বেশি পাওয়া গেছে। নিউমোনিয়া ও ব্রঙ্কাইটিসের মতো শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ চিকিৎসায় ক্ল্যারিথ্রোমাইসিন ব্যবহার করা হয়। ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহৎ নদী দানিয়ুব মহাদেশটির সবচেয়ে দূষিত নদী। ইউরোপে দানিয়ুবের পরীক্ষিত ৮ শতাংশ অংশে অ্যান্টিবায়োটিক নিরাপদ মাত্রার উপরে রয়েছে।

ইউরোপের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন নদী হিসেবে পরিচিত টেমসও দূষণের শিকার। টেমস ও এর কয়েকটি উপনদীতে পাঁচ ধরনের অ্যান্টিবায়োটিকের দেখা মিলেছে। নদীটির একটি অংশ ও উপনদীগুলোর তিনটি অংশে দূষণ নিরাপদ মাত্রার উপরে রয়েছে। ত্বক ও মূত্রনালির সংক্রমণের জন্য ব্যবহূত সিপ্রোফ্লক্সাসিন উপস্থিতি নিরাপদ মাত্রার চেয়ে তিন গুণের বেশি পাওয়া গেছে।

উইলিয়াম গেজের মতে, নদীগুলো যদি স্বল্পমাত্রায়ও অ্যান্টিবায়োটিক দ্বারা দূষিত হয়, তাহলেও একে হুমকি হিসেবে ধরতে হবে। ইউরোপে অল্প মাত্রার দূষণও প্রতিরোধের বিবর্তন ঘটাতে এবং মানব প্যাথোজেনে প্রতিরোধী জিনের স্থানান্তর বাড়িয়ে তুলতে পারে।

গবেষকরা বিশ্বের ৭২ দেশের নদীগুলোর ৭১১টি অংশ পরীক্ষা করে দেখেছেন এবং এগুলোর ৬৫ শতাংশে অ্যান্টিবায়োটিক দূষণ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১১১টি অংশে অ্যান্টিবায়োটিকের পরিমাণ নিরাপদ মাত্রা অতিক্রম করেছে। সবচেয়ে দূষিত অংশগুলোতে অ্যান্টিবায়োটিকের মাত্রা নিরাপদ সীমার ৩০০ গুণের বেশি থাকতে দেখা গেছে।

নিম্ন আয়ের দেশগুলোর নদীতে উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক দূষণ ঘটেছে। এর মধ্যে আফ্রিকা ও এশিয়ার অংশগুলোর অবস্থা সবচেয়ে বাজে। গবেষকরা বাংলাদেশের নদীর নমুনায় মেট্রোনিডাজলের পরিমাণ নিরাপদ মাত্রার চেয়ে ৩০০ গুণ বেশি পেয়েছেন। একটি বর্জ্য পানি শোধনাগারের পাশের নদীর অংশের নমুনায় এ দূষণ শনাক্ত করা গেছে।

ময়লা অব্যবস্থাপনা ও সরাসরি নদীতে বর্জ্য ফেলা নদীতে উচ্চমাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক থাকার একটি কারণ। দাতব্য সংস্থা ওয়াটার এইডের স্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যবিধি বিশ্লেষক হেলেন হ্যামিলটন বলেন, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে স্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যবিধি সেবাসংক্রান্ত নিরাপদ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি।

গবেষক দল এ মুহূর্তে মাছ, অমেরুদণ্ডী প্রাণী, শৈবালসহ বন্যপ্রাণীর ওপর অ্যান্টিবায়োটিক দূষণের পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নের পরিকল্পনা করছেন।