যৌনদাসী থেকে নোবেল : নাদিয়া মুরাদের আইএস থেকে পালানোর চোখ ভেজানো গল্প

নাদিয়া মুরাদ ইরাকের উত্তরাঞ্চলে সিনযার-এর কৃষিনির্ভর শান্ত এক গ্রাম কোযোতে ১৯৯৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন। সেখানেই তার বেড়ে ওঠা, তার মেয়েবেলা। তার পরিবার ছিল কোযোর জাতিগত ধর্মীয় সংখ্যালঘু ইয়াজিদি। অন্যান্য ইয়াজিদি মেয়েদের মতো তিনিও পরিবারের সাথে থাকত। পড়াশুনা করত। যেহেতু সে কৃষক পরিবারের মেয়ে, তাকেও পরিবারের সাথে কৃষিকাজ করতে হতো। তাদের জীবন ছিল শান্তির এবং আনন্দের। ভবিষ্যতে তিনি ইতিহাসের শিক্ষিকা হতে চাইতেন। আবার চাইতেন মেকাপ আর্টিস্ট হতে,  যেখানে তার নিজস্ব একটা স্যালন থাকবে।

বন্দিজীবন

২০১৪ সালের আগস্ট মাসের ৩ তারিখ। এই দিনই নাদিয়ার জীবনে ঘটে ভয়াবহ সেই ঘটনা। নিমেষেই লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় গোছানো চারপাশ। অচেনা হয়ে যায় তার তাবৎ জীবন। ওই দিন ইসলামিক জঙ্গিগোষ্ঠী (আইএস) ঢুকে পড়ে তার গ্রামে। ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের মানুষের উপর চালায় নির্মম গণহত্যা। গ্রামের নারী এবং শিশুদের অস্ত্রের মুখে একটি স্কুলে ঢোকানো হয়। পুরুষদের বাইরে দাঁড় করানো হয়। এরপর নাদিয়ার ৯ ভাইয়ের মধ্যে ৬ জনসহ সবাইকে এক নিমেষে গুলি ক’রে হত্যা করা হয়। নাদিয়া এবং তার দুই বোন সহ গ্রামের হাজার হাজার নারী ও শিশুদের আইএস বন্দি করে। বন্দিদের একটা সুযোগ দেওয়া হয়—ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করো অথবা মরো। অনেককেই জোর করে ধর্মান্তর করানো হয়। আর কম বয়সীদের করা হয় বন্দি। তাদের উপর চলত অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন, গণধর্ষণ। যৌনদাসী হিসেবে বিক্রি করা হতো তাদের। করা হতো জোরপূর্বক বিয়েও। নাদিয়ার তখন বয়স ২১ বছর। তাকে এবং তার দুই বোনকে বন্দি করা হয়। তাদের মাকে তাদের চোখের সামনে মেরে ফেলা হয়; কারণ যৌনদাসী করার ক্ষেত্রে তাদের মায়ের বয়স বেশি ছিল।

Nadia Murad Nobel Laureate
নাদিয়া মুরাদ, ফটোগ্রাফার : Ronald Zak/AP, ছবিসূত্র : https://www.npr.org

বন্দি ক’রে তাকে মসুলে নিয়ে যাওয়া হয়, আইএসের স্বঘোষিত খিলফাতের রাজধানী। সেখানে তাকে জোরপূর্বক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে হয় এবং যৌনদাসী হিসেবে বারবার বিক্রি করা হয়। ইউরোপ, সৌদি আরব, তিউনিশিয়া থেকে জঙ্গিরা ধর্ষণ করতে আসত। ধর্ষণের আগে তাকেসহ সবাইকে ওজু করিয়ে নামাজ পড়ানো হতো। অথচ মসুলের কেউ বন্দি এই হাজার হাজার ইয়াজিদি নারীদের সাহায্যে এগিয়ে আসেনি। এক-প্রসঙ্গে নাদিয়া মুরাদ বলেন, [su_quote]মসুলে প্রায় ২০ লাখ মানুষ বাস করেন। তাদের মধ্যে দুই হাজার মেয়েকে অপহরণ করে আটকে রেখেছে জঙ্গিরা। মসুলে হাজারো পরিবার বাস করেন কিন্তু কেউই সাহায্য করতে এগিয়ে আসেননি। যারা সাহায্যের জন্য এগিয়ে এসেছিলেন, তারা হাজার হাজার ডলার দাবি করেছিলেন।[/su_quote]

প্রাথমিকভাবে নাদিয়াকে একটা বিল্ডিংয়ে অসংখ্য পরিবারের সাথে বন্দি ক’রে রাখা হয়। তিনি দেখেছেন আইএস-এর সেনাদের হাতে উপহার হিসেবে শিশুদের তুলে দেওয়া হতো। অসংখ্য ইয়াজিদি নারী, তরুণী এমনকি নয় বছর বয়সী কন্যাশিশুকেও তিনি ধর্ষিত হতে দেখেছেন। অনেক ইয়াজিদি নারী আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন, তার চোখের সামনে। প্রথম যে লোকটা নাদিয়াকে ধর্ষণ করে সে বয়সে অনেক প্রবীণ ছিল। নাদিয়া বাধা দিলে তাকে পাশবিকভাবে অত্যাচার করা হয়। নাদিয়াকে প্রতিদিন ধর্ষণ করা হতো। এতো নিয়মিত, যে এটা অভ্যাস হয়ে যায়। তবু নাদিয়া ভেঙে পড়েনি। তার মতো হাজারো নারী আইএসের হাতের বন্দি ছিল। এ ভাবনাই তাকে সাহস দিয়েছে। পালানোর চেষ্টা করে ধরা পড়ে গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। যখন তিনি পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, তখন জ্ঞান হারানোর আগ পর্যন্ত তাঁকে ছয় ব্যক্তি ধর্ষণ করে। অত্যাচারে বদলে গেছে শরীরের রঙ। তবু ভেঙে পড়েনি। পালাবার পথ খুঁজেছে প্রতিটা মুহূর্তে। পালানো প্রসঙ্গে স্মৃতিচারণ ক’রে মুরাদ বলেন, [su_quote]নরক থেকে পালানোর চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু ধরা পড়ে গিয়েছিলাম। ধরা পড়লেই চলতো গণধর্ষণ। ভেঙে পড়িনি। নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে বলতে থাকলাম এক দিন মুক্ত হবই![/su_quote] কেউ পালানোর চেষ্টা করলে তাকে সেলে বন্দি করে রাখার নিয়ম ছিল আইএসের এবং কম্পাউণ্ডের সমস্ত সেনাদের দিয়ে তাকে পালাক্রমে ধর্ষণ করা হতো। আইএস জঙ্গিরা এর নাম দিয়েছিল ‘যৌন জিহাদ’।

নাটকীয় পলায়ন

নাদিয়া এই অসহ্য অত্যাচারের পর পালানোর কথা আর চিন্তা করার সাহস পায়নি। তবে একদিন এক আইএস সদস্য দরজা বন্ধ না করেই নাদিয়াকে একা রেখে বেরিয়ে যায়। আর এই সুযোগে ঘর থেকে বেরিয়ে দেয়াল টপকে আইএসের এলাকা থেকে বেরিয়ে যান তিনি। কাপড়ে মুখ ঢেকে মসুলের অন্ধকার রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে খুঁজতে থাকেন আশ্রয়।

মাঝরাতে হঠাৎ করেই ওমর আবদিল জাবের দরজা ধাক্কানোর শব্দ শুনতে পান। সেই শব্দে জাবেরের পরিবার ভয়ে কাঠ হয়ে যায়। এটা ছিল ২০১৪ সালের গ্রীষ্মের শেষভাগ। আইএসআইএস তিন মাস আগে শহররের দখল নিয়েছে। মাঝরাতে বাড়িতে কারও আসার কথা নয়। তারা ভয় পাচ্ছিলেন, হয়তো জঙ্গি। এরপর আবার দরজা ধাক্কানোর শব্দ ভেসে আসে। গ্রীষ্মের ওই রাতে জাবের এবং তার আব্বা ধীরে ধীরে দরজা খোলেন। দেখেন পা থেকে মাথা অব্দি নেকাবে ঢাকা রোগা একটা মেয়ে। ‘আমাকে সাহায্য করুন’, মেয়েটা আর্তি জানায়। ‘ওরা আমাকে ধর্ষণ করেছে’। জাবের মেয়েটিকে ভিতরে টেনে নেয়, যাতে বাইরে থেকে কেউ তাকে দেখতে না পারে।

মেয়েটা কথা বলছিল শান্তভাবে, তবে তার কণ্ঠস্বরে ছিল স্পষ্ট ভয়। সে জানায় তার নাম নাদিয়া। জঙ্গিরা তাকে বন্দি ক’রে রেখেছিল। তারপর মসুলে নিয়ে আসে। তার গ্রামের অধিকাংশ নারী ও শিশুদের সাথে যৌনদাসী হিসেবে তাকে বিক্রি ক’রে দেয়। তাকে যেখানে আটকে রাখা হয়েছিল, সেখান থেকে পালানোর আগে এক সপ্তাহের মধ্যে জঙ্গিরা তাকে অগুনিতবার ধর্ষণ করেছে, নির্যাতন করেছে এবং বহুবার বিক্রি করেছে।

Omar Abdel Jabar
জাবের, যার হাত ধরে আইএস থেকে পালিয়েছিল নাদিয়া মুরাদ। ফটোগ্রাফার : Mustafah Abdulaziz ছবিসূত্র : http://time.com

পরদিন সকালে জাবের খুব সকালে ঘুম থেকে ওঠে। তার চোখেমুখে ছিল ভয়। কারণ তার অধিকাংশ প্রতিবেশিরাই ছিল জিহাদিদের পক্ষে। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষকে কাজে লাগিয়ে জিহাদিরা স্থানীয় মানুষদের ইয়াজিদিদের প্রতি বিষিয়ে তুলেছিল। এছাড়া ক্যাম্প থেকে কেউ পালালে, জিহাদিরা ধরিয়ে দে’য়ার জন্য ৫০০০ ডলার পুরষ্কার ঘোষণা করত। তাই নাদিয়া যদিও চাইছিল মুরাদের ওখান থেকে বেরিয়ে আসতে, মুরাদ জানতো নাদিয়াকে বাড়ির ভিতর রাখা বিপদজনক। তবে তাকে বাইরে বের হতে দেওয়া আরো বেশি বিপদজনক। জাবের ৮০ মাইল দূরে কোন এক রিফিউজি ক্যাম্পে থাকা নাদিয়া’র এক ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ ক’রে তাকে পাচার করার পরিকল্পনা করেন। জাবেরের চাচতো ভাই নাদিয়ার একটা পরিচয়পত্র তৈরি করে, সুন্নি আরব নামে।

[su_pullquote align=”right”]জঙ্গিরা জাবেরকে কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে জানতে চায়। যেখানে তাদের গাড়ি দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছিল সে জায়গা থেকে কিছুটা দূরে দু’জন ইয়াজিদি মেয়ের সাথে নাদিয়া’র ছবিও দেওয়ালে টাঙানো ছিল। নাদিয়া বুঝতে পারে, তাকে খোঁজা হচ্ছে। [/su_pullquote]

সেখানে উল্লেখ করা হয়, নাদিয়া কিরকুর থেকে এসেছেন যেটা মসুল থেকে প্রায় ১০০ মাইল দূরে। মসুল থেকে বের হবার প্রতিটা পথেই আইএসের ঘাঁটি আছে। তাই তারা সিদ্ধান্ত নেয় নাদিয়াকে জাবেরের স্ত্রী সাজানো হবে এবং বলা হবে তারা কিরকুরে নাদিয়ার বাবা মায়ের সাথে দেখা করতে যাচ্ছে।

প্রথম চেকপোস্টে তাদের থামিয়ে আইএসের সেনারা গাড়ি চেক করে। জাবেরের হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসে। যদি তারা ধরা পড়ে, নাদিয়াকে আবার বন্দি করা হবে। কিন্তু তাকে! নাদিয়াকে সাহায্য করার অভিযোগে তার পরিণতি হবে আরো ভয়াবহ! পেছনের সিটে শান্তভাবে বসে ছিলেন নাদিয়া। তার সমস্ত শরীর ছিল নেকাবে ঢাকা। শুধু চোখ দেখা যাচ্ছিল। জঙ্গিরা জাবেরকে কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে জানতে চায়। যেখানে তাদের গাড়ি দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছিল সে জায়গা থেকে কিছুটা দূরে দু’জন ইয়াজিদি মেয়ের সাথে নাদিয়া’র ছবিও দেওয়ালে টাঙানো ছিল। নাদিয়া বুঝতে পারে, তাকে খোঁজা হচ্ছে। তবে জঙ্গিরা তাদের রক্ষণশীলতার কারণেই নাদিয়ার নেকাব সরাতে নিষেধ করে এবং জাবেরদের গাড়ি যাবার অনুমতি দেয়। আরো কয়েকটা চেকপোস্ট তাদের পার হতে হয়। প্রত্যেকবার তাদের প্রশ্ন করা হয়। জাবের উত্তর করে। জাবের জানে না কিরকুর এলাকার বাসিন্দারা কীভাবে কথা বলে, তাদের ভাষা কেমন। সম্পূর্ণ অপরিচিতা একজন ভিন ধর্মের মেয়ের জন্য সে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তার একটা জীবনকে বহুবার মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ‘আমি জানি না, সে কেন এতো ভালো। যেখানে মসুলের অধিকাংশ লোকই অমানুষ’ জাবেরের প্রসঙ্গে নাদিয়া বলেন।

এরপরদিন এ্যরবিলের একটা হোটেলে তারা একে অন্যকে বিদায় জানায়। সেটা ছিল তাদের শেষ দেখা। জাবের মসুলে ফিরে যাবার পরদিন, মাঝরাতে আবার তাদের দরজা ধাক্কানোর শব্দ শোনা যায়। এবার সত্যি দরজার বাইরে ছিল আইএস।

এদিকে, জার্মানির একটি শরণার্থী প্রকল্পের আওতায় ২০১৫ সালে আরও এক হাজার নারী ও শিশুর সঙ্গে জার্মানি পাড়ি জমান নাদিয়া। বর্তমানে সেখানেই তিনি বসবাস করছেন। একই বছর ডিসেম্বরে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে আইএসের হাতে নিপীড়নের ভয়াবহ সেই অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন নাদিয়া। তারপর থেকেই তিনি ইয়াজিদি জনগোষ্ঠীর অধিকার আন্দোলন নিয়ে কাজ শুরু করেন। তিনি মানবাধিকার এবং যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ধর্ষণের ব্যবহারের বিরুদ্ধেও কাজ শুরু করেন। যেসমস্ত ইয়াজিদি নারীরা এখনও আইএসের হাতে বন্দি তাদের জন্য নাদিয়া নিরলস পরিশ্রম করছেন। মুরাদ তাদের প্রসঙ্গে বলেন, ‘জানি কী দুর্বিষহ দিন কাটাচ্ছেন তারা। নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই আজ সেই সব মেয়েদের কাহিনি তুলে ধরছি।’ তাদের সাহায্যের লক্ষ্যে তিনি ‘নাদিয়াস ইনিশিয়েটিভ’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। ইয়াজিদি জনতার মুক্তি আন্দোলনের প্রতীকে পরিণত হয়েছেন তিনি।

নোবেলে নাদিয়া

১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬ সালে নাদিয়া মুরাদকে জাতিসংঘের শুভেচ্ছাদূত করা হয়। এক্ষেত্রে তাকে মানবপাচার বন্ধ এবং পাচারের ভুক্তভোগীদের সীমাহীন দুর্দশার ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টিতে কাজ করতে হয়। নাদিয়া ২০১৬ সালে পেয়েছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) শীর্ষ মানবাধিকারবিষয়ক শাখারভ পুরস্কার। আর এখন ২০১৮ সালের ৫ অক্টোবর পেলেন বিশ্বের সর্বাপেক্ষা সম্মানজনক শান্তিতে নোবেল পুরস্কার।

 

ফিচারড ছবিসূত্র : https://www.glamour.com/