যেভাবে ঘুরে এলাম মাতামুহুরীর উৎপত্তিস্থল ও পোয়ামুহুরী ঝরনা

[su_dropcap size=”5″]আ[/su_dropcap]জ আপনাদের নিয়ে যাব মেঘ, পাহাড়, নদী আর সবুজের রাজ্যে, যেখানে মোবাইলের নেটওয়ার্ক নেই, মানুষের কোলাহল নেই, যানজট নেই, গাড়ির বিরক্তিকর শব্দ নেই, ধূলাবালি নেই, শুধু ট্রলারের ইঞ্জিনের গর্জন আছে; আর আছে চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্য। বলছিলাম মাতামুহুরী নদীর কথা। যে নদী বাংলাদেশের একমাত্র নদী, যার জন্ম বা উৎপত্তি বাংলাদেশে এবং শেষও বাংলাদেশে। আলীকদম, লামা, চকরিয়া ও পেকুয়া এই চার উপজেলায় জালের মত ছড়িয়ে আছে মাতামুহুরী। দুই পাড়ে সবুজ পাহাড়ের সারি, মাঝখানে বয়ে চলা আঁকাবাঁকা নদী।

জল-মেঘের লুকোচুরি। ছবি : আশরাফুল আরেফিন আসিফ

আলীকদমে গিয়ে মাতামুহুরীর রূপ দেখতে চাইলে বাংলাদেশের যে কোন জায়গা থেকে প্রথমে আপনাকে চকরিয়া বাস স্টেশনে এসে আলীকদমগামী চাঁদের গাড়ী বা লোকাল বাসে চড়তে হবে। ১০-১২ জন হলে চাদেঁর গাড়ি বা লোকাল ভাষায় জীপ গাড়ী বা সর্ট বড়ি ভাড়ায় নিতে পারেন, জন প্রতি ৬০-৭০ টাকা। চকরিয়া হয়ে আলীকদম যাওয়ার পিচঢালা রাস্তাটাও অসাধারণ, উঁচুনিচু রাস্তা, দু-পাশে নানা প্রকার উঁচু গাছে ভরা সবুজ পাহাড়, মাঝেমধ্যে জুমক্ষেত ও পাহাড়ী পল্লী, চকরিয়া থেকে ১৫ কি.মি. দূরত্বে মিরিন্জা পর্যটন কেন্দ্র। সরকারি ব্যবস্থাপনায় অসাধারণ সুন্দর পরিছন্ন একটি বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে স্থানীয়ভাবে দিন দিন খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠছে মিরিন্জা পর্যটন কেন্দ্র। আলিকদম যাওয়ার পথে ৩০ মিনিট সময় নিয়ে আপনিও দেখে নিতে পারেন সুন্দর এই জায়গাটা। চকরিয়া থেকে লামা উপজেলা পেরিয়ে আলীকদম পৌঁছতে আপনার সময় লাগবে ৪৫ মিনিট।

ছবির মতো সুন্দর চকরিয়া টু আলীকদম সড়ক। ছবি : আশরাফুল আরেফিন আসিফ

আলীকদম পৌঁছে আধা ঘণ্টায় আলিকদম শহরটা দেখে নিতে পারেন, সেক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে যদি আপনি মাতামুহুরীর উৎপত্তি স্থল বা পোয়ামুহুরী বাজারে রাতে অবস্থান না করেন, তাহলে আপনাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রওয়ানা দিয়ে বিকেলেই ফিরতে হবে। মাতামুহুরীতে ভ্রমণের জন্য আলীকদম জেসিও (আর্মি ক্যাম্প) থেকে অনুমতি নিতে হয়। সবার নাম, স্থায়ী ঠিকানা, মোবাইল নাম্বার একটা কাগজে লিখে সাথে সবার ন্যাশনাল আইডির ফটোকপি ক্যাম্পে জমা দিতে হয়।

সেনানিবাসের পাশের এই ব্রীজঘাট থেকে যাত্রা শুরু। ছবি : আশরাফুল আরেফিন আসিফ

অনুমতি নেওয়ার পর সেনানিবাস এলাকার পাশের ব্রীজ ঘাট থেকে ইঞ্জিন চালিত নৌকা ভাড়া করতে হয়, ব্রীজের নিচের ঘাটটাও খুব চমৎকার, নদীর পাড়ে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে সিমেন্ট-বালির ব্লক বসানোয় দেখতে খুবই সুন্দর দেখায়।

ব্রীজঘাটের দিনের সৌন্দর্য। ছবি : আশরাফুল আরেফিন আসিফ
ব্রীজঘাটের রাতের সৌন্দর্য। ছবি : আশরাফুল আরেফিন আসিফ

সকালের স্নিগ্ধ আলোয় দূরের পাহাড়গুলোকে আরো সুন্দর দেখাচ্ছিলো। ট্রলার রিজার্ভ করে যাত্রা শুরু হল। যতই সামনে যেতে থাকি ততই অবাক হতে থাকলাম। এঁকেবেঁকে চলা পাহাড়ি নদীতে ট্রলারের গলুইতে চেপে দু-পাশও সামনের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে গন্তব্যের দিতে এগিয়ে চলছি।

নীল আর সবুজের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে এগিয়ে চলা। ছবি : আশরাফুল আরেফিন আসিফ

এই সৌন্দর্য ক্যামেরায় তোলা ছবির চেয়েও অনেক বেশি সুন্দর। সবাই ব্যস্ত নিজেদের ক্যামেরা বা মুটোফোনে স্মৃতি ধরে রাখতে। পাহাড়ি আদিবাসী বাচ্ছাগুলোর নদীতে সাঁতারকাটা, নদীর চরে ফুটবল খেলা, জুমক্ষেতে কাজ করতে থাকা পাহাড়ি নারী পুরুষ, কিছুক্ষণ পরপর এসব দৃশ্য দেখতে দেখতে প্রায় ঘণ্টাখানেক পর পৌঁছলাম প্রথম আর্মি চেকপোস্ট জানালিপাড়া আর্মি ক্যাম্প। সেখান থেকে আলীকদম জেসিওতে ওরা কথা বলে আমাদের অনুমতির ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে নেয়। অনুমতি ছাড়া এই জানালিপাড়া পর্যন্ত যাওয়া যায়।

যেতে যেতে এইরকম বাঁশের ভেলা চোখে পড়বে। ছবি : আশরাফুল আরেফিন আসিফ

আমরা দুটো নৌকায় মোট ১৮ জন, সবাই আর্মিক্যাম্প এ নেমে নাম এন্ট্রি করে আবার রওয়ানা দিলাম। তবে এই এক ঘণ্টায় যা দেখছি সেটা সিকিভাগও ছিলো না সেটা বুঝলাম আরো কিছুদূর গিয়ে। একেকটা বাঁক নেয়ার পর সৌন্দর্যের সংজ্ঞাটাই যেন বদলে যাচ্ছিলো। যতই সামনে এগিয়ে চলছি পাহাড় ততই ঘন সন্নিবেশিত হতে থাকল। কিছুকিছু জায়গায় একেবারে নদীর পাড় দিয়েই কয়েকশ ফুট উঁচু পাহাড়। সবুজের চাঁদরে মোড়ানো সবকিছু। মাঝে কিছু পাথুরে পাহাড়ও চোখে পড়ল।

নদীর দুইপাশে এইরকম পাথর চোখে পড়ে। ছবি : আশরাফুল আরেফিন আসিফ

জানালিপাড়া আর্মিক্যাম্প থেকে রওনা দেয়ার ঘণ্টাখানেক পর পৌঁছলাম কুরুকপাতা আর্মি ক্যাম্পে। সেখানে না নামলেও হয়। শুধু চেকইন দিয়ে এগোতে থাকলাম অপার সৌন্দর্যের পানে। আমাদের ট্রলার এগোয় আর মনের মধ্যে বাজছে “এই পথ যদি না শেষ হয় তবে কেমন হত তুমি বলতো”

নদী আর পাহাড় মিলেমিশে একাকার। ছবি : আশরাফুল আরেফিন আসিফ

মাঝেমধ্যে নদী ও পাহাড় যেন একসাথে মিশে যায়, নদী সরু হতে থাকে, মনে হয় দু-পাশের উঁচু পাহাড় এই বুঝি আমাদের মাথার উপর এসে পড়ল। ঘন সবুজ পাহাড়, সরু নদী, হীম শীতল পানিতে পা নামিয়ে দিয়ে দু-চোখ ভরে স্রষ্টার অপার সৃষ্টি দেখতে দেখতে আরো ঘণ্টাখানেক পর আমরা পৌঁছে গেলাম আমাদের গন্তব্য পোয়ামুহুরী বাজার।

নদীর পাড়েই পোয়ামুহুরী বাজার। ছবি : আশরাফুল আরেফিন আসিফ

পোয়ামুহুরী বাজার থেকে ৫/১০ মিনিটের হাঁটাপথ পেরিয়ে পৌঁছালাম পোয়ামুহুরী ঝরনায়। পোয়ামুহুরীর রূপের শেষ নেই। কয়েকশ ফুট উঁচু থেকে তীব্রবেগে ধেয়ে আসছে পানি। নিচে বসে থাকা দায়। নিচে বসে ছোটবেলায় স্কুল জীবনের স্যারদের বেতের বাড়ির কথা মনে পড়তেছিলো। প্রচণ্ড বেগে ধেয়ে আসা পানি বেতের মতই গায়ে বিঁধছিলো। পানির পরিমাণ যদিও-বা কমে আসছে, তারপরও পোয়ামুহুরীর রূপ দেখে আমরা খুশি, স্থানীয়রা জানালেন ভরা বর্ষায় প্রচুর পানি থাকে। কিছুক্ষণ ঝরনায় অবগাহন করে আবার পোয়ামুহুরী বাজারে ফিরে এলাম। এইখানে একটা আর্মি ক্যাম্প আছে। এটাই সম্ভবত বাংলাদেশের শেষ আর্মি ক্যাম্প। এর পরেই মায়ানমার বর্ডার। এই বাজারের পরেই পাহাড়ি ঝরনার মত একটা জায়গায় মাতামুহুরীর উৎপত্তিস্থল।

আমাদের দল।

এবার ফেরার পালা।

আলিকদম থেকে পোয়ামুহুরী যাত্রাপথ ছিল স্রোতের প্রতিকূলে তাই আমাদের সময়ও বেশি লেগেছে, প্রায়  চার ঘণ্টা। পোয়ামুহুরী থেকে ফেরা স্রোতের অনুকূলে তাই সময় লাগবে এর অর্ধেক। মাতামুহুরীর রূপে এত মজে আছি যে ফিরতেই ইচ্ছে করছে না, একবার ভাবলাম রাতে থাকার প্লান নিয়ে আসলে ভাল হত। ৬ টার আগেই জানালীপাড়া আর্মি ক্যাম্প পার হতে হবে তাই এরপর শুধুই ফেরা। চারপাশে পাহাড়গুলোকে বিদায় জানাতে জানাতে আমরা ফিরে আসতে থাকলাম আলীকদমের দিকে। সন্ধ্যায় আলীকদম ফিরে আর্মি ক্যান্টিনে নাস্তা করে কিছুক্ষণ রাতের আলীকদম উপভোগ করলাম।

এবার বাড়ি ফেরার পালা…

x
খরচ:  জনপ্রতি ১২০০-১৫০০ টাকা। [চকরিয়া-আলীকদম-পোয়ামুহুরী-চকরিয়া]

x
বি.দ্র. যেখানে সেখানে পলিথিন, বিস্কুট, চিপস, চকলেটের প্যাকেট ফেলবেন না। পরিবেশ নোংরা করবেন না। পাহাড়িদের সাথে ভালো ব্যাবহার করুন।
x
সতর্কতা:

১। মাতামুহুরী নদীর যেখানে সেখানে নামবেন না। চোরাবালি আছে অনেক জায়গায়।
২। সম্ভব হলে সানস্কিন ক্রিম মেখে যাবেন বা ছাতা নিয়ে যাবেন। ট্রলারে থাকার সময় রোদে সানবার্ন হতে পারে।

1 COMMENT

  1. প্রিয় ভাই, প্রতিবেদন টি লেখার জন্য ধন্যবাদ।ভবিস্যতে কেউ যেতে চাইলে খুব সহজে যেতে পারবে।ভাই আপনাদের সাথে জার্নিটা অনেক উপভোগ করেছি….।

Comments are closed.