ঢাবির সেই গবেষকের বিরুদ্ধেে লিগ্যাল অ্যাকশনে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়

গবেষণা প্রটোকল না মানায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিকেল রিসার্চ সেন্টার ও ফার্মেসি অনুষদের অধ্যাপক আ ব ম ফারুকের বিরুদ্ধে লিগ্যাল অ্যাকশন নিতে যাচ্ছে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। বাজারের শীর্ষ পাঁচ দুধে অ্যান্টিবায়োটিক এবং ডিটারজেন্টের উপস্থিতি নিয়ে ভুল গবেষণায় তথ্য প্রকাশ করে ফেঁসে যাচ্ছেন তিনি।

 

মান নিয়ন্ত্রক সংস্থার তথ্য ভুলভাবে উপস্থান করা, গবেষণার যথাযথ প্রটোকল না মানা, গবেষণাটি ভাল কোন জার্নালে প্রকাশের আগেই সংবাদপত্রে প্রকাশ করার পাশাপাশি যথাযথভাবে স্যাম্পলিং না করার কারণে গবেষণাটি সঠিক হয়নি। এজন্য তার কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।

আগামী সাত দিনের মধ্যে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না দিলে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় অতিরিক্ত সচিব (প্রাণিসম্পদ-২) কাজী ওয়াছি উদ্দিন।

মঙ্গলবার রাজধানীতে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও জাতীয় ডেইরি উন্নয়ন ফোরামের আয়োজনে ‘নিরাপদ তরল দুধ উত্পাদন: দেশীয় দুগ্ধশিল্প রক্ষা ও বিকাশে করনীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) মহাপরিচালক ড. নাথু রাম সরকার, ডিএলএসের সাবেক মহাপরিচালক ডা. মো. আইনুল হক, বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ ইমরান হোসেন, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেইরি সাইন্স বিভাগের অধাপক হায়হান হাবিব, আকিজ ফুড এ্যান্ড বেভারেজের সহকারী মহাব্যবস্থাপক এম এম ইকবাল হাসান, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক উজমা চৌধুরী এবং জাতীয় ডেইরি উন্নয়ন ফোরামের সাধারণ সম্পাদক ড. আনিসুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ্য, বাজারের শীর্ষ পাঁচ কোম্পানির সাত ধরনের পাস্তুরিত দুধের নমুনায় অ্যান্টিবায়োটিক এবং তিন ধরনের দুধে ডিটারজেন্টের উপস্থিতি পাওয়া গেছে এমন গবেষণা করেন আ ব ম ফারুক। এই গবেষণা ফল প্রকাশের পরপরই দেশজুড়ে এ নিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। গবেষকদের সংবাদ সম্মেলনের তিন দিন পর ঢাবির ফার্মেসি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সিতেশ চন্দ্র বাছার জানান, ওই গবেষণার সঙ্গে ফার্মেসি বিভাগের কোনও সংশ্লিষ্টতা নেই। এমনকি গবেষণাটি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

যে গবেষণাটি আ ব ম ফারুক প্রকাশ করেছেন সেটা কোনো পিয়ার রিভিউ জার্নালে প্রকাশ হয়েছে কি না সেটা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়েছে বলে জানান কাজী ওয়াসি উদ্দিন। তিনি বলেন, পিয়ার রিভিউস জার্নালে প্রকাশ হওয়ার আগেই ওই গবেষক তার তথ্য সাংবাদিকদের জানিয়ে নিয়ম ভঙ্গ করেছেন। তার গবেষণার স্যাম্পল সঠিক ছিল না। গবেষণাতেও ত্রুটি ছিল। এজন্য আজকের সংলাপে গবেষকদের ডাকা হয়েছে কিন্তু তারা আসেননি। আজকের আলোচনা গত ৩ তারিখ হওয়ার কথা ছিল। সেদিনও তিনি আসতে পারবেন না জানালে তাদের সম্মতিতেই আজকের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি আজও আসেননি।

তিনি বলেন, তার এ ধরনের আচরণ আমাদের মনে সন্দেহের উদ্বেগ তৈরি করছে। দেশের উদীয়মান দুগ্ধ শিল্পের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অংশ হিসাবে পাস্তুরিত দুধে দূষণের তথ্য দিয়ে গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে বলে মনে করছি। সেজন্য দেশীয় ডেইরি শিল্পের অব্যাহত গতি থামিয়ে দেওয়ার জন্য দেশী-বিদেশী চক্রান্ত চলছে। কজন গবেষক দুগ্ধ শিল্প নিয়ে একটা গবেষণা করে ছেড়ে দিলেন। ওনাদের কী এজেন্ডা আছে এর পেছনে সেটা আমরা বের করার চেষ্টা করছি। ড. শাহনীলা ফেরদৌস এবং প্রফেসর এ বি এম ফারুককে আগামী ৭ দিনের মধ্যে আমাদের প্রশ্নের জবাব দেবেন। যদি না করেন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আপনাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান কাজী ওয়াছি।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (ডিএলএল) মহাপরিচালক ডা. হীরেশ রঞ্জন ভৌমিক বলেন, কী উদেশ্যে এ গবেষণা করা হয়েছে, কেন করা হয়েছে সেটি আমরা জানতে চাই। ঢাবির ওই গবেষক আরো অনেক গবেষণা করেছেন কিন্তু তিনি কী এভাবে সংবাদ সম্মেলন করে প্রচার করেছেন? তা নাহলে এটি স্পষ্ট একটি কুচক্রী মহলের প্ররোচণায় তিনি যেন-তেন একটি গবেষণা করে দেশের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ডিন ড. মো. নুরুল ইসলাম বলেন, পাস্তুরিত দুধে ফ্যাট নিয়ে একটা ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে গবেষণায়। বিএসটিআই বলছে কমপক্ষে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ ফ্যাট থাকতে হবে। গবেষণার ফলাফলে পাওয়া গেছে ৩ দশমিক ২ থেকে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। মন্তব্যে বলা হয়েছে ৩ দশমিক ৫ শতাংশের কম হলে খাওয়া যাবে না। কিন্তু ব্যাপারটি তা নয়, ফ্যাট কম হলেও দুধ খাওয়ার অযোগ্য হয় না। একইভাবে অ্যাসিডিটির পরিমাণ নিয়ে ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে গবেষণায়। পাস্তুরিত দুধে কলিফর্ম থাকতে পারবে ১০ এমএল এর বেশি। গবেষণায় পাওয়া গেছে, প্রতি ২৩-২৪ সিএফইউ/এমএল। এটি দুধের মান খারাপ হওয়ার ইঙ্গিত না দিলেও তারা বোঝাতে চেয়েছেন খারাপ কিছু।

বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ ইমরান হোসেন বলেন, গ্রামাঞ্চলে পর্যাপ্ত ভ্যাটেনারি ডাক্তার পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে ফার্মেসিগুলোর পরামর্শ নিয়েই গরুকে প্রয়োজনীয় ওষুধ খাওয়াতে হয়। কিছু অসাধু কোম্পানি মানহীন ওষুধ বিপণন করে থাকে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, দুধ নিয়ে ভুল গবেষণা রিপোর্ট প্রকাশের কারণে উৎপাদিত দুধের অর্ধেকই তাদের অবিক্রিত থেকে যাচ্ছে। খামারিরা বিপর্যয়ের মুখে রয়েছেন। তিনি বিভিন্ন কোম্পানিকে খামারিদের কাছ থেকে দুধ কিনে নেয়ার আবেদন জানান। তা না হলে খামারিদের দুধ ফেলে দিতে হবে।