সুশীল বিকাশ : প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হয়েও গেজেটভূক্ত না হওয়ার আক্ষেপ

মিনার কবির:: ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ কাল রাতে শুরু হয় যুদ্ধ। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। সেই যুদ্ধের সময়ে মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করতে দীর্ঘ ৩ মাস প্রশিক্ষণ শেষে শপথ নেন এক ঝাঁক তরুণ। ওই সময় ১ নং সেক্টরে মেজর রফিকুল ইসলামের অধীনে মাহবুবর রহমানের নেতৃত্বে যুদ্ধের মাটি গায়ে লাগান একদল মুক্তিযোদ্ধা। তাদের মধ্যে একজন সুশীল বিকাশ নাথ।

সুশীল বিকাশ নাথ মাহবুবুর রহমানের নেতৃত্বে প্রবেশ করেন চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে। ফটিকছড়ির ৫টি স্থানে তুমুল প্রতিরোধ-যুদ্ধে লিপ্ত হন জাতির সূর্য সন্তানরা।

আরও পড়ুন: ভারতে ফের নির্যাতনের শিকার মুসলমানেরা, ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি না দেয়ায় মারধর

সমগ্র দেশ তখন শত্রুর কবলে। মুক্ত করতে হবে তাদের হাত থেকে। আদেশ আসে সেক্টর কমান্ডারের। ফটিকছড়িতে ক্যাম্প গুছিয়ে যেতে হবে দক্ষিণ চট্টগ্রাম। ১০ দিন পাহাড়ি পথ বেয়ে পায়ে হেঁটে পৌঁছান দোহাজারী। দোহাজারীর জামিজুরির আবুল হোসেন মাস্টারের খামার বাড়িতে ক্যাম্প স্থাপন করেন। ৩টি গ্রুপের যৌথ ক্যাম্প এটি। সবাই ক্লান্ত। অবিশ্রান্ত শরীরে একটু বিশ্রাম পেতেই নেমে আসে ঘুম। হঠাৎ গোলাগুলির শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। আক্রমণ করেছে শত্রু পক্ষ। প্রতিরোধ করতে হবে তাদের। মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধে নিহত হয় ৫ পাকসেনা। শহীদ হন ২ মুক্তিযোদ্ধা। দুই সহযোদ্ধাকে হারিয়ে শোক নেমে আসে ক্যাম্পে।

১লা ডিসেম্বর, ১৯৭১। ভারতীয় বাহিনীর সাথে যুক্ত হয়ে দোহাজারী পাকবাহিনীর ক্যাম্প আক্রমণ করেন ওই দলটি। গুড়িয়ে দেন ক্যাম্প। পালিয়ে যায় পাকসেনারা। দোহাজারী শত্রু মুক্ত হয়। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে ক্যাম্পের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে যাত্রা করেন নতুন গন্তব্যে।

কক্সবাজার জেলার চকরিয়াতে ক্যাম্প স্থাপন করেন মুক্তিবাহিনীর এই গ্রুপ। প্রতিরোধ যুদ্ধের আগেই ঘোষণা আসে বিজয়ের। ১৬ ডিসেম্বর ভারতীয় বাহিনীর মেজর গুব্বাচান সিংহের নিকট অস্ত্র জমা দিয়ে লাল-সবুজের পতাকা হাতে বাড়ি ফিরেন মুক্তিযোদ্ধা সুশীল বিকাশ নাথ।

সুশীল বিকাশ দীর্ঘদিন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সকল সুযোগ-সুবিধা পেলেও ২০১০ সালে গেজেট থেকে বাদ পড়ে তাঁর নাম। অথচ তিনি ১৯৭৯ সালে মুক্তিযুদ্ধ কোটায় বাংলাদেশ ব্যাংকে চাকরিতে যোগদান করেন। ২০০৭ সালে সুশীল বিকাশ সে চাকরি থেকে অবসরও গ্রহণ করেন।

১৯৯৯ সালে প্রকাশিত মুক্তিবার্তার ১৬ তম সংখ্যায় উল্লেখ আছে সুশীল বিকাশের নাম। ২০০৯ সালেও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সাময়িক সনদ ইস্যু করে সুশীল বিকাশ নাথের নামে। ২০১০ সালে তিনি মুক্তিযোদ্ধা সংসদ নির্বাচন এর পেকুয়া উপজেলা হতে সহকারি কমান্ডার হিসেবে নির্বাচিত হন। এছাড়া বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্র, চট্টগ্রাম এর পরিচালক ডাঃ মাহফুজুর রহমান কতৃক ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের ছবিসহ সংকলিত প্রকাশনার ২৪৪ নং পৃষ্ঠায় সুশীল বিকাশ নাথের নাম রয়েছে।

সুশীল বিকাশ

বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা পুণর্বাসন সোসাইটি, মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আজীবন সদস্য সুশীল বিকাশ নাথ নিজের মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতির ফিরে পেতে বিভিন্ন জায়গায় আবেদন করলেও এখনো তিনি সে স্বীকৃতি ফিরে পাননি।

যুদ্ধকালীন গ্রুপ কমান্ডার এবং কক্সবাজার জেলা ইউনিট কমান্ডার মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘সুশীল বিকাশ নাথ একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। তিনি আমার সাথে ১৯৭১ সালে জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে ভারতের মিজোরাম রাজ্যের দেমাগ্রী মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রিক্রুট হন। এবং দেমাগ্রী প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৩১ ব্যাচ রেজিমেন্টের কর্নেল নন্দ লাল সিং এর অধীনে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত হয়ে আমার গ্রুপের কমান্ডার টুইসি (ডেপুটি কমান্ডার) হিসেবে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সফল ভাবে অপারেশন করেন।’

মামা বাহিনীর প্রধান শহিদুল ইসলাম মামার সাথে সুশীল বিকাশ নাথ।

মুক্তিযোদ্ধা সুশীল বিকাশ নাথ এ-প্রসঙ্গে সন্দেশ২৪ ডট কমকে বলেন, ‘আমি ১নং সেক্টরের হরিণা ক্যাম্পের ১৫৫ নং গ্রুপের ডেপুটি কমান্ডার হওয়া সত্ত্বেও যুদ্ধকালীন গ্রুপ কমান্ডার জনাব মাহাবুবুর রহমানসহ অন্যান্য সহযোদ্ধাদের নামে গেজেট ও লাল বার্তায় নাম থাকলেও আমার নাম কোনো এক অদৃশ্য কারণে গেজেটভূক্ত হয়নি। কেনো গেজেটিভূক্ত হয়নি সেটা আমি জানি না। অথচ, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমার নাম ১৯৯৯ সালের মুক্তিবার্তা ১৬ তম সংখ্যায় ছিল। মন্ত্রণালয়ের ডাটাবেইজেও আমার নাম আছে। এবং অধ্যক্ষ আহাদ চৌধুরীর স্বাক্ষরিত কপিতেও আমার নাম লিপি আছে। তাহলে মন্ত্রণালয়ে রক্ষিত লাল বইয়ে কেন নাম উঠলো না?’

আরও পড়ুন: বাংলাদেশের মানুষের ভারতবিদ্বেষ কি শুধুই ক্রিকেট নাকি আঞ্চলিক রাজনীতি?

মুক্তিযোদ্ধা সুশীল বিকাশ নাথের মতো প্রকৃত অনেক মুক্তিযোদ্ধাই গেজেটভূক্ত হয়নি বলে সরেজমিনে জানা যায়। মুক্তিযোদ্ধা সুশীল বিকাশ নাথ নিজের স্বীকৃতি ফিরে পেতে চান। এই প্রসঙ্গে তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। তিনি আরও বলেন, ‘আমার পূর্ণ বিশ্বাস মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা আমার বিষয়টা, আমাদের মতো ভাগ্যহত মুক্তিযোদ্ধাদের বিষয়টা তদারকি করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেবেন।’