প্রাচীনতম রহস্যময় দশ সভ্যতা: প্রথম পর্ব

মানুষ বিবর্তনের দীর্ঘ ইতিহাসে নিজেদের প্রয়োজনে দলবদ্ধ হয়ে বাস করতে শেখে। ছোট দলগুলো আবার একসাথে হয়ে বড় দলে পরিণত হয়। এভাবেই সমাজ এবং সমাজ থেকে সভ্যতার জন্ম। আটলান্টিস, লেমুরিয়া এবং রামা এই তিনটা পৌরাণিক সভ্যতা বাদ দিলে বাকি যে সভ্যতা গুলো পাওয়া যায় তাদের বাস্তব ভিত্তি রয়েছে। তাদের মধ্য থেকে প্রথম দশটিকে আলাদা করলে নিচের গুলোকে আমরা সহজেই আলাদা করতে পারি।

ইনকা সভ্যতা: দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্য ইনকা ১৪৩৮ থেকে ১৫৩২ সময়কাল, বর্তমান ইকুয়েদর,পেরু ও চিলি ছিল এর বিস্তৃতি। এই সভ্যতার প্রশাসনিক, সামরিক এবং রাজনৈতিক কেন্দ্র ছিল কাস্কো যা বর্তমানে পেরু। ইনকা একটি উন্নত এবং বিকশিত সভ্যতা ছিল। তারা সূর্য এর উপাসনা করতো। ইনতি ছিল তাদের দেবতা। রাজাদের বলা হতো সাফা ইনকা বা সূর্য এর সন্তান।

প্রথম ইনকা রাজা একটা আদর্শ গ্রামকে পূর্ণ একটা শহরে রুপান্তর করে তাকে রাজধানীতে পরিণত করেন। তিনি শহরটিকে পুমার আকৃতিতে তৈরি করেন। তিনি পূর্বপুরুষ আরাধনার চর্চা করেন। এতে তার মৃত্যুর পর তার সন্তান উত্তরাধিকার হিসেবে সিংহাসনে বসবে এবং তার সম্পদ তার আত্মীয় স্বজনের মধ্যে বন্টন করা হবে। পরিবর্তে তারা তার মমি সংরক্ষণ করবে এবং শাসন ক্ষমতা রক্ষা করবে। এভাবে ইনকা সভ্যতায় গুরুত্বপূর্ন শাসন ব্যবস্থা গড়ে উঠে। তৈরি হয় বড় বড় দালান ও শহর যার নিদর্শন এখনও টিকে আছে।

এজটেক সভ্যতা: ১৩৪৫-১৫২১ খ্রীষ্টাব্দে মেক্সিকোতে এজটেক সভ্যতা বিকশিত হয়। ইনকা এবং এজটেক সভ্যতা মোটামুটি একই সময়ে বিস্তার লাভ করে। ইনকা দক্ষিণ আমেরিকায় এবং এজটেক মেক্সিকো কলাম্বিয়া এলাকায় বিকশিত হয়।

১২০০ থেকে ১৩০০ শতকে বর্তমানের মেক্সিকো মোটামুটি তিনটি বৃহৎ শহরে মানুষ বাস করতো। শহর গুলো ছিল টেনোচটিটলাম, টেক্সকোকো এবং লাকোপান। ১৩২৫ সালের দিকে এই পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী শহর গুলো একটি মৈত্রী গড়ে তোলে। তারা নতুন রাষ্ট্র মেক্সিকো উপত্যকা নামে শাসন শুরু করে। তখন থেকেই মেক্সিকো নামটা ব্যবহার হয়ে আসছে। এজটেক সভ্যতা বিকাশের একশ বছরের মধ্যেই এর পতন হয়। মায়া সভ্যতার প্রভাবে এই সভ্যতার বিলুপ্তি ঘটে। 

রোমান সভ্যতা: রোমান সভ্যতা খ্রীস্টপূর্ব ৫৫০ থেকে ৪৬৫ খ্রীস্টাব্দ সময়কালে ইউরোপে  লাতিনি নামের এক গ্রামে গড়ে উঠেছিল।যা এখন রোম নামে পরিচিত। প্রাচীন সভ্যতা গুলোর মধ্যে রোমান সভ্যতা ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী। এই সভ্যতার গোড়াপত্তনে রয়েছে কিংবদন্তী ও পৌরাণিক গল্প। উন্নতির চরম শিখরে রোমান সভ্যতা বিশাল এলাকায় আধিপত্ত করে। ভূমধ্য সাগরের আশেপাশের সমস্ত এলাকা ছিল এর অধীন।

প্রথম দিকে রোমান সভ্যতা রাজাদের দ্বারা শাসিত হতো। মাত্র সাতজন রাজা শাসন করতে পেরেছিলেন। এরপর জনগন তাদের ক্ষমতা বুঝে নেয়। তারা সিনেট নামে কাউন্সিল গঠন করে রাস্ট্র শাসন করে। এরপর থেকে রোম হয়ে যায় রোমান প্রজাতন্ত্র।  

জুলিয়াস সিজার, ট্রাজান, আগাস্টাসের মত বড় বড় সম্রাটরা রোমান সাম্রাজ্য শাসন করে। কালক্রমে সাম্রাজ্য এতো বিশাল হয়ে পরে যে একজন শাসকের অধীনে শাসন কার্য চালান কঠিন হয়ে পড়ে। শেষের দিকে রোমান সাম্রাজ্য হাজার হাজার বর্বর যারা উত্তর ও পুর্ব ইউরোপ থেকে এসেছিল তাদের দ্বারা শাসিত হয়।

পারস্য সভ্যতা: খ্রীস্টপূর্ব ৫৫০ থেকে খ্রীস্টপূর্ব ৩৩১ সময়কালে পারস্য সভ্যতা বিকাশ লাভ করে। বর্তমান অবস্থান ইরান যা প্রাচীন মিশরের উত্তর হতে তুরস্কের উত্তর হয়ে মেসোপটেমিয়া হয়ে পূর্বে ইন্দুশ নদী পর্যন্ত এই সভ্যতা ছড়ানো ছিল।যদিও মাত্র দুইশত বছরের কিছু অধিক কাল পারস্য সভ্যতা স্থায়ী হয় কিন্তু এতি ছিল খুব শক্তিশালী একটি সভ্যতা। এটি প্রায় বিশ লক্ষ বর্গমাইল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ছিল।

শক্তিশালী সামরিক বাহিনী এবং সফল ও বিচক্ষণ শাসকের জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মাত্র দুইশ বছর সময়কালে বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে উঠার পারস্য যা তখন পারসিস নামে পরিচিত ছিল বিভিন্ন নেতার অধীনে বিভক্ত ছিল। রাজা ২য় সাইরাস শাসন ক্ষমতায় এলে সমগ্র পারস্য সাম্রাজ্য একত্রিত করেন। পরবর্তিতে সাইরাস দ্যা গ্রেট বলা হতো। তিনি ব্যবিলনও দখল করেন। তাঁর অভিযান দ্রুত সুদূর ভারত পর্যন্ত পরিচালিত হয়। তাঁর পরবর্তি বংশধরেরা একই হিংস্ররতায় ও দ্রুততায় সাম্রাজ্য বিস্তার অব্যহত রাখে। স্পারটাদের সাথে ঐতিহাসিক যুদ্ধও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মিশর সহ মধ্য এশিয়ার বিশাল এলাকা পারস্য সাম্রাজ্যের অধীন ছিল। অবশেষে আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট এই সভ্যতার পতন ঘটান  খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩০ সালে। 

গ্রীক সভ্যতা: প্রাচীন সভ্যতা গুলোর মধ্যে গ্রীক সভ্যতা বেশ প্রভাবশালী একটি সভ্যতা যা খ্রিষ্টপূর্ব ২৭০০ থেকে খ্রিস্টপুর্ব ৪৭৯ পর্যন্ত রাজত্ব করে। এর আসল লোকেশন ছিল ইতালি, সিসিলি, উত্তর আফ্রিকা,ফ্রান্সের পশ্চিম এলাকা। এই সভ্যতার মূল বিষয় গুলোর মধ্যে গনতন্ত্রের চর্চা,সিনেট এবং অলিম্পিক উল্লেখযোগ্য।

এই সভ্যতা প্রাচীন সাইক্লেডিক ও মিনোয়ান সভ্যতা থেকে এসেছে। এর ইতিহাস এবং প্রভাব এতো বিশাল যে ঐতিহাসিকগণ গ্রীক সভ্যতাকে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করেছেন। এদের মধ্যে আর্কেইক, ক্লাসিকাল এবং হেলেনিস্টিক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই সময়কালে অনেক প্রাচীন গ্রীক ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছেন যারা পুরো পৃথিবীকে পাল্টে দিয়েছিলেন। তাদের অনেকের নাম এখন শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারিত হয়।

উল্লেখযোগ্য অনেককিছুর মধ্যে অলিম্পিকের ধারনা এবং গনতন্ত্রের ও সিনেটের ধারনা গ্রিকদের বিশেষ অবদান। এছাড়াও আধুনিক জ্যামিতি, জীববিজ্ঞান ও পদার্থ বিজ্ঞানের ধারনাও তাদের প্রবর্তিত। পিথাগরাস, আর্কেমিডিস, সক্রেটিস, ইউক্লিড, প্লাটো,আরিস্টেটল, আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট প্রভূত ব্যক্তিদের অবদান আজও বিশেষ ভাবে উল্লেকযোগ্য।

চীন সভ্যতা: চীন সভ্যতা খ্রিস্টপুর্ব ১৬০০ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ১০৪৬ পর্যন্ত ইয়ালো নদী ও ইয়াংঝি এলাকায় গড়ে উঠে। এই সভ্যতার বড় অবদান হলো কাগজ ও রেশম কাপড় উদ্ভাবন। প্রাচীন চীন যা হ্যান চীন নামে পরিচিত অবশ্যই প্রাচীন সভ্যতার ইতিহাসে এক বহুধা সভ্যতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত এতো গুলো সাম্রাজ্য চীন শাসন করেছে যে পুরো শাসনামল লিখতে অনেক কিছু লিখতে হবে।

ইয়ালো নদীর তীরে যে সভ্যতা গড়ে উঠেছিল তা দিয়েই শুরু হয়েছিল চীন সভ্যতা। খ্রীস্টপূর্ব ২৭০০ তে এই সাম্রাজ্যের শুরু হয়েছিল যা পরবর্তিতে অনেক নতুন সাম্রাজ্য তৈরি করে এবং ধীরে ধীরে মূল ভূখন্ড দখল করে বিশাল সভ্যতার জন্ম দেয়। খ্রিস্টপূর্ব ২০৭০ তে ঝিয়া রাজবংশ প্রথম পুরো চীন শাসন শুরু করে। তখন থেকে শুরু করে ১৯১২ সাল পর্যন্ত অসংখ্য সাম্রাজ্য চীন শাসন করে। ১৯১২ সালে কিংগ রাজবংশ পতনের মধ্য দিয়ে প্রাচীন চীন সভ্যতার অবসান হয়। এইসময়ের মধ্যে চীন সভ্যতা পৃথিবীকে দেয় অমুল্য সব উদ্ভাবন। গান পাউডার, কাগজ, ছাপাখানা, কম্পাস, এলকোহল, কামান আরো অনেককিছু চীন সভ্যতার উল্লেখযোগ্য অবদান।