শৈশবে বঙ্গবন্ধু!

টুঙ্গিপাড়া গ্রামটি অবস্থিত মধুমতি ও ঘাগোর নদীর তীরে। গ্রামবাংলার চিরায়ত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যময় পরিবেশের এক প্রতীক টুঙ্গিপাড়া গ্রামটি। মধ্যযুগের কবি বিজয় গুপ্ত তার ‘পদ্মপুরাণ’ কাব্যগ্রন্থে ঘাগোর নদীর বর্ণনা দিয়েছেন এইভাবে, “টুঙ্গিপাড়া গ্রামের গাছগুলো ছবির মতো সারি সারি সাজানো ছিল। নদীতে তখন পালতোলা নৌকা, লঞ্চ, স্টিমার চলতো। বর্ষায় গ্রামটিকে মনে হতো যেন শিল্পীর আঁকা জলে ডোবা একখণ্ড ছবি।”

এমন এক গ্রামে ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ অভিজাত এক বংশে শেখ লুৎফর রহমান ও শেখ সায়েরা খাতুনের ঘরে জন্ম নেয় এক ফুটফুটে শিশু। বাবা-মা আদর করে নাম রাখলেন ‘খোকা’। এই খোকাই পরবর্তীতে হয়ে ওঠেন সংগ্রামী বাঙালীর প্রিয় নেতা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যাঁর নেতৃত্বে আমরা পেয়েছি স্বাধীন বাংলাদেশ।

বঙ্গবন্ধুর শৈশব কেটেছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি টুঙ্গিপাড়া গ্রামে। তিনি আবহমান বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে দেখতে বড় হয়েছেন। মানুষের প্রতি তাঁর ছিল অকৃত্রিম ভালোবাসা। গ্রামীন জীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না তিনি গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করেছেন। জমিদার, তালুকদার ও মহাজনের শোষণ তিনি ছোটোবেলা থেকে দেখেছেন। সেগুলো তাঁকে প্রচুর ভাবিয়েছে। 

শোষিত মানুষদের দুঃখকষ্ট তাঁকে তাদের প্রতি ভালোবাসায় সিক্ত করেছে। শৈশবে তিনি কোনো অন্যায় সহ্য করেননি। কোনো অন্যায় দেখলেই সঙ্গে সঙ্গে সেটার প্রতিবাদ করেছেন। শৈশবের এই মানসিকতা পরবর্তীতে অন্যায়ের কাছে মাথানত না করার জন্য উৎসাহিত করেছে।

শিশু মুজিবের পড়ালেখার হাতেখড়ি ঘটেছিল  মাস্টার, পণ্ডিত ও মৌলভী সাহেবদের কাছে। পরবর্তীতে তিনি মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, ইসলামিয়া কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেছেন। সংগ্রামী চেতনার মুজিব নিজের অধিকার আদায় করে নিতে জানতেন। 

অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা একে ফজলুল হক একবার তাঁদের স্কুল পরিদর্শনে এসেছিলেন। তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব আর সাহসিকতায় মুগ্ধ হয়ে প্রধানমন্ত্রী তাঁদের স্কুল মেরামতের জন্য অর্থবরাদ্দ করেন।

ছোট্ট মুজিব পশুপাখিদের খুব ভালোবাসতেন। তিনি দোয়েল ও বাবুই পাখিদের খুব ভালোবাসতেন। বাড়িতে শালিক ও ময়না পুষতেন। তাঁর প্রিয় খেলা ছিল ফুটবল।

প্রতিবাদী চেতনার মুজিব প্রতিবাদের এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন মাত্র তের বছর বয়সে। ঐ সময় গোপালগঞ্জে চলছিলো স্বদেশী আন্দোলন। সেই আন্দোলনে পুলিশের লাঠিচার্জ তাঁকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। তিনিও বন্ধুদের নিয়ে তিনি যোগ দেন সেই বিক্ষোভে। 

শতশত ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে পুলিশ সদস্যদের নাজেহাল করে তোলেন। ছোট্ট মুজিবের সাহস দেখে বিস্মিত হয় সবাই। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময়, মাত্র পনেরো বছর বয়সে তিনি রাজনৈতিক রোষানলে পড়ে কারাবরণ করেন। সংগ্রামী জীবনে এটিই ছিল তার প্রথম কারাবরণের ঘটনা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আজীবন দুখী, শোষিত ও অসহায়-নিরন্ন মানুষদের ভালো চেয়ে এসেছেন। আমৃত্যু এদের জন্য কাজ করে গেছেন। কালক্রমে পরিণত হয়েছেন, বাঙালী জাতির প্রিয় নেতা হিসেবে। অন্যায়ের কাছে তিনি মাথানত করেননি। অন্যায়ের কাছে আপোষহীন বঙ্গবন্ধু নিজের জীবন বাজি রাখতেও দ্বিধাবোধ করেননি। 

বঙ্গবন্ধুর দৃঢ়চেতা মনোভাব ও সাহসিকতায় মুগ্ধ হয়ে সংগ্রামী আরেক বীর ফিদেল কাস্ত্রোর মুখ থেকে বের হয়েছে কালজয়ী এক উক্তি, “আমি হিমালয় দেখিনি, কিন্তু আমি শেখ মুজিবকে দেখেছি।” 

আজ ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস। স্বাধীনতার স্থপতি, মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৪তম শাহাদতবার্ষিকী।

এ দিনটি আসলে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যিনি এই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা এবং প্রতিষ্ঠাতা তাকে এরকম নি`র্মমভাবে ঘা`তকের বু`লেটে নিহ`ত হতে হয়েছে। 

বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্থপতি। এই বাংলাকে, বাংলার মানুষকে তিনি এতটাই বেশি ভালোবেসেছিলেন যে, তাদের কেউ তার সঙ্গে বিশ্বাঘাতকতা করতে পারে, এটা তিনি কল্পনাও করতে পারেননি। 

যদিও ওই রাতের হ`ত্যাযজ্ঞ, বিভ`ৎসতা, কয়েক জন বিপথগামী আর্মি অফিসারের দ্বারা সংঘটিত হ`ত্যাকাণ্ড বঙ্গবন্ধুকে মুছে দিতে পারেনি। বাংলার মানুষ তাকে আগে যেমন ভালোবেসেছে আজও তাকে হৃদয় দিয়ে ভালোবাসে। 

জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির কাছে চিরস্মরণীয় এক নাম। বাঙালির প্রেরণার নাম। যিনি না থেকেও বাংলার মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছেন।

১৯৭৫ সালের এই দিনে সেনাবাহিনীর কিছুসংখ্যক বিপথগামী সদস্য ধানমন্ডির বাসভবনে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হ`ত্যা করে। ঘাতকরা শুধু বঙ্গবন্ধুকেই হ`ত্যা করেনি, তাদের হাতে একে একে প্রাণ হারিয়েছেন বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, বঙ্গবন্ধুর সন্তান শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শিশু শেখ রাসেলসহ পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজি জামাল। 

পৃথিবীর এই জঘন্যতম হ`ত্যাকাণ্ড থেকে বাঁচতে পারেননি বঙ্গবন্ধুর অনুজ শেখ নাসের, ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তার ছেলে আরিফ, মেয়ে বেবি ও সুকান্ত, বঙ্গবন্ধুর ভাগনে যুবনেতা ও সাংবাদিক, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক শেখ ফজলুল হক মনি, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনি এবং আবদুল নাঈম খান রিন্টু ও কর্নেল জামিলসহ পরিবারের ১৬ জন সদস্য ও ঘনিষ্ঠজন। 

এ সময় বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা বিদেশে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান।

মুহাম্মাদ শরিফুজ্জামান