মাশরাফি: বাংলাদেশ ক্রিকেটের জীবনানন্দ

আমার দুর্ভাগ্য, আমি মাশরাফির সাথে এক টিমে খেলতে পারিনি— ব্রায়ান লারা (সাবেক অধিনায়ক, ওয়েস্ট ইন্ডিজ)। এই কথাটা মাশরাফি সম্পর্কে আপনাকে কিছুটা ধারণা দেবে। কিন্তু এই কথাটাই মাশরাফি, এমন ভাবার অবকাশ নেই। মাশরাফি বাংলাদেশ ক্রিকেটের জীবনানন্দ। তিনি যখন বল হাতে দৌড়ে যান, বুকের মধ্যে একটা ব্যথাকে সবিস্ময়ে দেখি অহংকারে বদলে যেতে। কোন ব্যক্তিগত অর্জন, দলীয় ব্যর্থতা— এই মানুষটাকে ভালবাসার জায়গা থেকে সরাতে পারবে না।

এই যুগের ক্রিকেটপ্রেমী তরুণ অর্থাৎ আমাদের শৈশব জুড়ে মাশরাফি। অভিষেক ম্যাচে তাঁর ইনসুইঙ্গারে গ্র্যান্ট ফ্লাওয়ারের মিডল স্ট্যাম্পের সাথে অনেকটা উড়ে গেছি আমরাও। ইনজুরির কারণে ২০১১ সালের বিশ্বকাপ খেলতে পারেননি মাশরাফি। সে’বার-ই প্রথমবার ওয়ানডে বিশ্বকাপের যৌথ আয়োজক হয় বাংলাদেশ। এখনও মনে আছে খেলতে না পারার আক্ষেপে মাশরাফির কান্না। সে’দিন বুঝেছিলাম আমার গহীন তাঁর কী অবাধ বসবাস! আমার মধ্যেও কোথাও যেন মাশরাফি কাঁদছেন। এই ইনজুরির কারণেই ক্রিকেট ক্যারিয়ারের প্রায় ৫ বছর তাকে টিমের বাইরে থাকতে হয়েছে। অস্ট্রেলীয় শল্যবিদ ডেভিড ইয়াংয়ের ছুরির নিচে সাতবার তার হাঁটু রেখেও বল হাতে দৌড়ে যান, কী বিমুগ্ধ বিস্ময়!

অস্ট্রেলিয়া সাবেক ফাস্ট বোলার গ্লেন মেগ্রা বলেন— [su_quote]পৃথিবীতে দুই ধরনের বোলার আছে। এক মাশরাফি আর অন্যটি বাকি সব। [/su_quote]যদি ১৮ বছরের ক্যারিয়ারে ৫ বছর তাকে দলের বাইরে না থাকতে হতো, যদি সাত সাতবার ওই হাঁটু জোড়াকে ছুরির নিতে না নিতে হতো, যদি প্রতিদিন সকালে হাঁটু থেকে সিরিঞ্জ দিয়ে পুঁজ বের না করতে হতো, তাহলে এই মাশরাফিই হয়তো সর্বকালের অন্যতম সেরা ফার্স্ট বলার হতেন। অথচ এই সমস্ত সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ ক’রে মাত্র ৩৬ ম্যাচেই থেমে গেছে তার টেস্ট ক্যারিয়ার। উইকেট পেয়েছে মাত্র ৭৮ টি। যদিও এইসব সংখ্যা মাশরাফিকে ধারণ করতে পারে না। মাশরাফি নিজেই একটা পরিসংখ্যান। ডাক্তার স্পষ্ট বলেছেন, ‘যেভাবে আপনি খেলা চালিয়ে যাচ্ছেন, ভবিষ্যতে পঙ্গু হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।’ কিন্তু ক্র্যাচে ভর দিয়ে বারবার ক্রিকেটের কাছে ফিরে আসেন শান্ত পাখির ডানা ফুঁড়ে উড়ে যাওয়া ভোরবেলার মতো।

আমাদের ক্রিকেটের জীবনানন্দ। ছবিসূত্র : ইন্টারনেট

ওপার বাংলার আনন্দবাজার পত্রিকার ক্রীড়া সম্পাদক পরিবর্তন ডটকমকে বলেছিলেন, ‘দেখুন, মাশরাফি একজন সিংহ-হৃদয় ক্রিকেটার। সবসময় উজ্জীবিত। কলকাতায় বোরোলিনের বিজ্ঞাপন দেয়া হতো একসময়, যেখানে লেখা থাকতো: ‘জীবনের ওঠা পড়া কিছুই লাগে না গায়’। মাশরাফি সেই ধরনের। সেই জন্য আমার মনে হয় সৌরভের পর দুই বাংলা মিলিয়ে ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণামূলক চরিত্র হলেন মাশরাফি বিন মুর্তজা।’

[su_pullquote align=”right”] ‘দেখুন, মাশরাফি একজন সিংহ-হৃদয় ক্রিকেটার। সবসময় উজ্জীবিত। কলকাতায় বোরোলিনের বিজ্ঞাপন দেয়া হতো একসময়, যেখানে লেখা থাকতো: ‘জীবনের ওঠা পড়া কিছুই লাগে না গায়’। মাশরাফি সেই ধরনের। সেই জন্য আমার মনে হয় সৌরভের পর দুই বাংলা মিলিয়ে ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণামূলক চরিত্র হলেন মাশরাফি বিন মুর্তজা।’[/su_pullquote]

ক্রিকেট মাঠের মতো ব্যক্তিগত জীবনেও একেবারেই সাদামাটা মাশরাফি। দামি পোশাক, ব্র্যান্ড কখনোই প্রলুব্ধ করে না তাকে। ট্রাউজার, টি-শার্ট আর পায়ে স্লিপার- এই হলেন মাঠের বাইরের মাশরাফি। ঘরে প্রতিটি বাঙালির মতো প্রথম পছন্দ লুঙ্গি। খাবার দাবারেও আট-দশজনের ছায়া। ডাইনিং টেবিলে মাছ, ডাল, ডিমভর্তা ও আলুভর্তা হলে আর কিছুরই প্রয়োজন হয় না। মাঝে মধ্যে গুনগুনিয়ে গেয়ে উঠেন মাশরাফি। পছন্দের তালিকায় জেমস, আইয়ুব বাচ্চু আর হাসান। সময় পেলে রবীন্দ্র সঙ্গীতেও ডুবে থাকেন। মাশরাফির গ্রামের বাড়িটা এখন ভক্তদের আড্ডাস্থল। যেখানে কারোরই প্রবেশাধিকারে বাধা নেই। এমনকি পুরো বাড়ির কোথাও নেই কোনো তালা! যে কেউ যাক, সাদরে আপ্যায়ন করেন মাশরাফির মা।

[ছোটবেলা থেকেই ওর কোনো চাওয়া-পাওয়া ছিলো না। ঈদের সময় আমার মামার ছেলে এসে বলছে, ‘আপু কৌশিক মামাকে কি কিনে দিছো’। আমি বললাম, ‘একটা প্যান্ট, স্যান্ডেল আর একটা গেঞ্জি কিনে দিছি’। ও বললো, ‘কত টাকা দিয়ে’? ‘এই হাজার খানেক’। তখন ও বলে, ‘আল্লাহ, আমি একাই দুই হাজার টাকা দিয়ে জুতা কিনে পরছি, আর তুমি কৌশিককে এক হাজার টাকা দিয়ে সব কিনে দিছো’। এই জিনিসটা যে কৌশিকের ভেতরে কোনো অনুভূতি তৈরি করবে কোনোদিনও, এমনটা ওর মধ্যে ছিলো না। ও একটা জামা গায়ে দিলে দেখা যেতো জামার বোতাম নেই। দেখা যেতো, জামায় কলমের কালি লেগে আছে। চুল আঁচড়াতো না। দেখা যেতো, লুঙ্গি ছিঁড়ে গেছে, গিট দিয়ে পরছে। ওর লাইফটা এরকম ছিল।— মাশরাফির মা হামিদা মোর্তজা]

কিন্তু ক্যাপ্টেন মাশরাফি উদাসীন নয়, বিচক্ষণ। মাশরাফির মতো ক্রিকেট সেন্স বাংলাদেশের অন্য কোন প্লেয়ারের মধ্যে নেই। ২০০৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে প্রথমবার দলের অধিনায়ক হন মাশরাফি। যদিও এক ম্যাচ খেলেই ইনজুরির কারণে দলের বাইরে যেতে হয় তাকে । ৫ বছর পর ২০১৪ সালের অক্টোবর মাসে আবার নেতৃত্ব ফিরে পান। ফিরে জিম্বাবুইয়ের সাথে সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচেই ৩ উইকেট নিয়ে ম্যান অব দ্য ম্যাচ হয়েছিলেন। মাশরাফি বাংলাদেশ দলকে। ব্যক্তিগত নৈপুণ্য আসলে মাশরাফির মাপকাঠি না। গোটা ক্রিকেট বিশ্বেই বাংলাদেশ যে আজ এক চ্যালেঞ্জিং প্রতিপক্ষ, যারা যেকোন সময়ই খেলার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে, এর কারণ ওই মাশরাফিই। তাঁর নেতৃত্ব গুণেই বাংলাদেশ এখন আর শুধু ‘অভিজ্ঞতা অর্জনের’ জন্য মাঠে নামে না; প্রতিটি ম্যাচেই দলের লক্ষ্য থাকে ডমিনেট করা। বাংলাদেশ টিমে কোন দলাদলি নেই। একটাই দল— মাশরাফি। বড় ভাইয়ের মতো আগলে রাখেন সবাইকে। মাশরাফির ওই হাঁটুদু’টোকে আমার যুদ্ধের ময়দান মনে হয়। বিধ্বস্ত সেই হাঁটুতে ভর দিয়েই বাংলাদেশ ভারত, পাকিস্তান, সাউথ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ইংল্যান্ডকে হারাতে শিখেছে। আর এ ক্ষেত্রে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন মাশরাফি নিজেই।

এ জাতির আক্ষেপ তাই চিরদিনের, মাশরাফি যদি ২০০৯ থেকে দলের অধিনায়ক থাকতেন, বাংলাদেশ হয়তো সদ্য শেষ হওয়া এশিয়া কাপে সেই গ্র্যান্ট ফ্লাওয়ারের মিডল স্ট্যাম্পের মতো উড়িয়ে দিত ভারতকে। এরপরও আজকের বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমের যতোটা অর্জন, র‍্যাংকিংয়ে ৭ নাম্বারে উঠে আসা কিংবা বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা— এই সমস্ত রূপকথার নায়ক মাশরাফি।